অনৈতিহাসিক———————————- করোনা কোনো রোগ নয় ।। প্রাণ সংহারি হানাদার দানব

মুহম্মদ শফিকুর রহমান :

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন। এমনি এমনি নয়, স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায়ও নয়, কতগুলো শর্ত সাপেক্ষে। যাকে আমাদের রাজনীতির পরিভাষায় বলা হয় ‘নাকে খত দিয়ে’। যেমন তাকে ৬ মাসের জন্য মুক্তি দেয়া হয়েছে এবং এই ৬ মাস তিনি নিজ বাড়িতে থাকবেন, বাইরে বেরোবেন না, কোন রকম রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেবেন না। একজন রাজনৈতিক নেতার জন্য এটি ‘নাকে খত দেবার’ চেয়েও বেশি। কারণ খালেদা জিয়ার করার আর কিছুই নেই। সব মেনে নিতে হচ্ছে।

তবুও তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এবং তিন দশকের দলীয় প্রধান (বিএনপি) দীর্ঘ দুই বছর এতিমের টাকা চুরির দায় বিচারে কারাভোগ করলেন, কিছু আলোচনারতো দাবি রাখে। কেন জেল হল, কত টাকা চুরি করেছিলেন, কত বছর জেল হয়েছিল এসব। যে অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আনা হয় তার যৌক্তিকতা আদালতেই সুরাহা হয়ে গেছে। খালেদা জিয়ার কিছু করার নেই। দলও নিভু নিভু।

তাছাড়া বাংলাদেশে বর্তমান সংকট হল ‘করোনা ভাইরাস’। এটি কোন রোগ নয় “প্রাণ সংহারি এক ভয়ংকর দানব”। নিরবে মানুষের মধ্যে হানা দেয় এবং হার্ট, লাং, লিভার প্রভৃতি শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অরগান গুলো ড্যামেজ করে প্রাণ সংহার করে। এমনি দানব এটি যাকে দেখা যায় না, যে অস্ত্র নিয়ে লড়াই করব বা যুদ্ধ ঘোষণা করে সশস্ত্রবাহিনী নামিয়ে দেয়া হবে। এক্ষেত্রে সবকিছু করতে হবে স্নায়ুযুদ্ধের মত। কারণ একে প্রতিরোধ করার কোন ভ্যাকসিন অস্ত্র যেমন আবিষ্কার হয়নি তেমনি প্রতিশোধক ঔষধ অস্ত্রও না। দেশের প্রখ্যাত চিকিৎসাবিদ প্রফেসর ড. আব্দুল্লাহসহ আমাদের চিকিৎসকগণ প্রতিনিয়ত জনগণকে এডভাইস দিয়ে চলেছেন:
• প্রয়োজন না হলে ঘর থেকে বেরোনো যাবেনা
• কারো সাথে হাত মেলানো যাবে না
• সব সময় হাত ধুতে হবে সাবান দিয়ে
• গোসল করতে হবে সাবান দিয়ে
• কতক্ষণ পর পর হাতে স্যানিটাইজার মাখতে হবে
• স্যানিটাইজার মেখে গ্লাবস পরতে হবে
• মুখে ডাক্তারী মাস্ক পরতে হবে
• গায়ে গা লাগানো যাবেনা
• একজন আরেকজনের দূরত্ব হবে তিন ফুট
• যথাসম্ভব পাবলিক ট্রান্সপোর্ট এড়িয়ে চলতে হবে

এ সবই মূলত প্রটেকটিভ এডভাইস। কিউরেটিভ হিসেবে ডাক্তারগণ এখন যে ব্যবস্থা দিচ্ছেন তা হল জ্বর এবং নিউমোনিয়ার ট্রিটমেন্ট। শুনেছি করোনা ভাইরাসের উৎপত্তিস্থল চীন এর প্রতিরোধক প্রতিশেধক আবিষ্কারের আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কেবল চীন নয়, বিশ্বের বড় বড় জ্ঞান-বিজ্ঞান সমৃদ্ধ দেশ যেমন আমেরিকা, ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্স, রাশিয়া, ভারত এই দানবের পথ রোধ এবং নিধনের যাবতীয় এপারেটাস আবিষ্কারে গবেষণা করে চলেছে। কারণ এই করোনা ভাইরাস আজ বাংলাদেশ বা ভারত বা চীন নয়, গোটা বিশ্বের ৭৫০ কোটি মানুষেরই আতংক। কখন কাকে আক্রমণ করবে কেউ জানে না। সবচেয়ে বড় আতংক বয়স্ক মানুষের। এ পর্যায়ের কেউ আক্রান্ত হলে তাকে বাঁচানো অনিশ্চিত ব্যাপার। আজকের কাগজে দেখলাম বৃটেনের যুবরাজ চার্লস আক্রান্ত হয়েছেন। এর আগে এভারেস্ট বিজয়ী আমাদের ওয়াসফিয়া এর আগেও বেশ কয়েকজন সেলিব্রিটি আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের কেউ কেউ মারাও গেছেন। এককথায় মহামারি আকার ধারণ করেছে এবং সম্ভবত এই প্রথম বড় দেশ,ছোট দেশ কালো মানুষ-ধনী মানুষ সবাই একই ভাবে আতংকিত এবং একই ভাষায় কথা বলছে। মহামারী-তো মহামারীই।

এই হানাদার বিশ্বদানবের জন্ম বর্তমান বিশ্বের অন্যতম ইকোনোমিক জয়েন্ট চীনে। কেউ বলছেন চীনের একটি পরমানবিক অস্ত্র কারখানায় এর উৎপত্তি এবং বিস্তার জ্ঞাতসারে বা অজ্ঞাতসারে। চীনের শত্রুরা বলবে জ্ঞাতসারে মিত্ররা বলবে অজ্ঞাতসারে। যে যাই বলুক চীনও কম মূল্য দেয়নি। এতদিন সর্বোচ্চ ক্যাজুয়েলাটর দেশ ছিল চীন,ইরান এখন ইটালি। ইটালির কারণে বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। ইটালিতে আমাদের সর্বোচ্চ সংখ্যক লোক কাজ করে এবং তাদের অনেকেই এর মধ্যে দেশে ফিরে এসেছে। ক’দিন আগে ঝুঁকি নিয়ে আমার নির্বাচনী এলাকা ফরিদগঞ্জে গিয়েছিলাম কিছু অফিসিয়াল কাজে। ইউএনও শিউলি হরি জানালেন ফরিদগঞ্জে ইটালি থেকে ফিরেছে পাঁচ শতাধিক। হাজারের কাছাকাছিও হতে পারে। মাদারীপুরের শিবচর আমাদের জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুর-ই আলম চৌধুরীর নির্বাচনী এলাকা। তিনি বোধহয় ৫/৬ বারের এমপি এবং তার এলাকা এমনভাবে সাজিয়েছেন যে প্রতিটি বাড়িঘর দোকানপাট পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সবকিছু লাল-সবুজ-এ রাঙ্গানো জাতীয় পতাকা। শিবচর শহরটি কেবল আধুনিক প্রযুক্তির নৈপূণ্যে সাজানোই নয়, এখানে রবীন্দ্র সদম, নজরুল মঞ্চ, মাইকেল মঞ্চ, মুক্তিযুদ্ধের মুরাল, বঙ্গবন্ধুর মুরাল, কি নেই? কয়েকমাস আগে ঐ এলাকা ঘুরে এসে আমি একটি কলাম লিখেছিলাম যার শিরোনাম ছিল “পদ্মার ওপারে শিবচর, একখণ্ড সোনার বাংলা”। আমাদের ফরিদগঞ্জের মত শিবচরেরও অনেক লোক ইটালিতে থাকে এবং সম্প্রতি তাদের বিরাট সংখ্যক দেশে ফিরে এসেছে শিবচরে স্থানীয় প্রশাসন প্রটেক্টিভ হিসাবে লক-ডাউন করে দিয়েছে।

লক-ডাউন করার পেছনে যৌক্তিক কারণ হলো কিছু মানুষ এই করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতা অনুধাবন করতে পারেনা বা পাত্তাই দেয়না। এ থেকে মুক্তি পাবার একমাত্র উপায় হল সর্তকতা, এটা অনেকেই বাত-কে-বাত মনে করে। শুনেছি আমার নির্বাচনী এলাকায় ইটালি থেকে ফিরে এসে আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধবের সাথে কোলাকুলি শ্বশুরবাড়ি বোনের বাড়ি বেড়ানো কেউ কেউ নাকি বউ বাচ্চা নিয়ে কক্সবাজার বেড়াতে গেছে, কেউ সেন্টমার্টিনে এসে ফিরেও গেছে শুনেছি বা ফিরতে শুরু করেছে। এদের কে বোঝাবে? এরা বিদেশে যায়, বেশিরভাগ-ই ম্যানুয়েল কাজ করে, খুব কমই খবরের কাগজ পড়ে,পড়ার মতো শিক্ষাইবা ক’জনের আছে, আগ্রহও প্রয়োজন, সবচেয়ে বড় কথা ভাষারও একটা ব্যাপার আছে। যারা শ্রমজীবী তারা সারাদিন কাজ শেষে বাসায় ফিরে আর কিছু ভালো লাগার কথা নয়। তাছাড়া তারা যে বাসায় থাকে সেগুলোও পরিসরের দিক থেকে ছোট, খুব কমই মন ভরে ঘুমাতে পারে। তবুও যখন ডলার-পাউন্ড ইউরো রিয়াল ইয়েন হাতে পায় সব ভুলে যায়।

পৃথিবীর অনেক দেশ তাদের বড় বড় শহর, প্রদেশ লক-ডাউন করে কোয়ারেন্টাইন ডিকলায়ার করে করোনা ভাইরাস মোকাবেলা করার চেষ্টা করছে।কিন্তু আমাদের বিদেশ ফেরত বিশেষ করে ইটালি ফেরত কিছু শ্রমজীবী কর্মজীবী এই কোয়ারেন্টাইনকে মেনে নিতে পারছেন না। সরকার ঘোষণা করেছেন দেশে ফেরা সবাইকে প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর কোয়ারেন্টাইনে যেতে হবে।অন্তত ১৫ দিন। এই ১৫ দিনে তার শরীরে করোনা ভাইরাস না পাওয়া গেলে তাকে সুস্থ ঘোষণা দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হবে।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের খবর হলো বিদেশ ফেরত বিশেষ করে ইটালি ফেরত কেউ এটাকে মেনে নিতে চাচ্ছে না, তারা কোয়ারেন্টাইন ক্যাম্পের দায়ীত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর আক্রমণ করার চেষ্টা পর্যন্ত করেছে। একজন-তো দেশকে ‘রেপ’ করার মত গালি পর্যন্ত দিয়েছে। তার দম্ভ দেখে মনে হচ্ছে হয়েছে সে হয় স্বাভাবিক নয়, নয়তো দেশ রাষ্ট্র এবং স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার বা আলবদরের সন্তান। তার কিছু কথা:
• আমরা সরকারকে টাকা দেই
• আমাদের টাকা দিয়ে দেশ চলে
ইত্যাদি ইত্যাদি। প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে তাদের বিদেশে যাওয়া এবং জব তালাশের পেছনে যেমন সরকারের অবদান রয়েছে তেমনি তিনি যে টাকা পাঠাচ্ছেন তা সরকারি তহবিলে যাচ্ছেনা। সরকার বা ব্যাংকের দায়িত্ব হলো তার টাকা তার নির্ধারিত প্রতিনিধি বা আত্মীয়ের কাছে পৌঁছে দেওয়া। সে-কি সরকারি তহবিলে টাকা দিচ্ছে? দিচ্ছেনা। তবু এত মিথ্যা এবং দম্ভ কেন। যে লোক ইংরেজিতে দেশকে ‘রেপ’ করার কথা বলে তার ব্যাপারে খোঁজ খবর নেওয়া দরকার। একই সঙ্গে যারা আজহারীর দেশত্যাগের সমালোচনা করে, সাঈদীর মুক্তি দাবি করে তারাও যুদ্ধাপরাধী।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সময়ের সবচেয়ে সৎ সাহসী দক্ষ ও দূরদর্শী রাষ্ট্রনেতা শেখ হাসিনা এরই মধ্যে দেশব্যাপী আর্মি নামিয়ে দিয়েছেন। সেনাবাহিনী সবকিছু দেখছেন। আজ দেশের প্রতিটি নাগরিককে বুঝতে হবে ১০০ বছর অপেক্ষা করার পর জাতি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। সে লক্ষ্যে ২০২০ এর ১৭ মার্চ থেকে ২০২১-এর ১৭ মার্চ মুজিববর্ষ ঘোষণা করে বছরব্যাপী ব্যাপক কর্মসূচী ঘোষণা করা হয়েছিল। কর্মসূচি গুলোকে আমি চিহ্নিত করেছি। “আত্ম-আবিষ্কারের সহজপাঠ” হিসেবে। কর্মসূচির একটি ছিল ২২-২৩ মার্চ দুইদিনের বিশেষ সংসদ অধিবেশন। এসব উদযাপন করে ২০২১-এর ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি তথা ‘সুবর্ণজয়ন্তী’ উদযাপনেরও কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল। সব প্রস্তুতিও সম্পন্ন করা হয়েছিল।

কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে মুজিববর্ষ এবং সুবর্ণজয়ন্তীর সব কর্মসূচি স্থগিত এবং বাতিল করে দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বলেন আসুন এই ভয়াবহ মহামারী তথা হিংস্র দানব থেকে পরিত্রাণের জন্য মসজিদ মন্দির গির্জায় দোয়া করি প্রার্থনা করি। ঘরে বসেও করা যেতে পারে। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিপর্যয় থেকেও মুক্তির যুদ্ধে আমরা জয়লাভ করবো ইনশাআল্লাহ #

ঢাকা- ২৬ মার্চ ২০২০
লেখক- এমপি
সদস্য- মুজিববর্ষ উদযাপন জাতীয় কমিটি
সাবেক সভাপতি ও সাধারন সম্পাদক, জাতীয় প্রেসক্লাব
ই-মেইল- balisshafiq@gmail.com

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন