আল ইমরান শোভন
চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার ১৯৫৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ভোলদিঘি কামিল মাদ্রাসায় অধ্যক্ষ মো. দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষকদের সঙ্গে অসদাচরণ, লাঞ্ছিত করা, হুমকি-ধমকি এবং প্রতিষ্ঠানে স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ করেছেন মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষক। এসব অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনিরা খাতুনের কাছে অভিযোগও করেছেন শিক্ষকরা।
প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থীর এই প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ৩৮ জন এবং কর্মচারী ১০ জন। শিক্ষকদের অভিযোগ, অধ্যক্ষের আচরণ ও সিদ্ধান্ত নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনার পর সেই অসন্তোষ প্রকাশ্য রূপ নেয়। এর প্রতিবাদে ২৩ আগস্ট মাদ্রাসার সব শিক্ষক ক্লাস বর্জন করেন।
শিক্ষকদের অভিযোগ, গত ১৩ আগস্ট আলিম বিজ্ঞান বিভাগের ব্যবহারিক পরীক্ষা চলাকালে বহিরাগত ও অভ্যন্তরীণ পরীক্ষকসহ আটজন শিক্ষক মাদ্রাসায় আসেন। এ সময় তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ ও পরীক্ষাসংক্রান্ত কার্যক্রম নিয়ে অধ্যক্ষের সঙ্গে শিক্ষকদের মতবিরোধ হয়।
শিক্ষকদের ভাষ্য, অধ্যক্ষ মাধ্যমিক শাখার কৃষি বিষয়ের সহকারী শিক্ষক রেজাউল করিমের সহায়তায় বহিরাগত ও অভ্যন্তরীণ পরীক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। অথচ আলিম বিজ্ঞান বিভাগের সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের সহযোগিতায় এ যোগাযোগ করার কথা ছিল বলে দাবি করেন তাঁরা।
এ নিয়ে পরীক্ষকেরা ও সংশ্লিষ্ট শিক্ষকেরা অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি তাঁদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ করেন এবং গালমন্দ ও লাঞ্ছিত করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
ঘটনার পর বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষকরা বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানান। ইউএনও মনিরা খাতুন তাঁদের বিষয়টি দেখার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানান অভিযোগকারী শিক্ষকরা।
শিক্ষকদের অভিযোগ, ১৯ আগস্ট মাদ্রাসার আরবি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কামাল উদ্দিন তপাদারের সঙ্গে অধ্যক্ষের বাকবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে অধ্যক্ষ তাঁকে লাঞ্ছিত করেন বলে অভিযোগ করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক।
এর পরদিন, ২০ আগস্ট আরবি বিভাগের প্রভাষক তাজুল ইসলামের সঙ্গেও অধ্যক্ষ বাজে আচরণ করেন বলে অভিযোগ ওঠে।
একজন শিক্ষক বলেন, একজন অধ্যক্ষের কাছ থেকে শিক্ষকরা সম্মানজনক আচরণ প্রত্যাশা করেন। কিন্তু একের পর এক ঘটনায় শিক্ষকদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতেই আমরা প্রশাসনের কাছে অভিযোগ জানিয়েছি।
শিক্ষকদের অভিযোগ, এসব ঘটনার প্রতিবাদে ২৩ আগস্ট মাদ্রাসার সব শিক্ষক ক্লাস বর্জন করেন। এতে প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়।
শিক্ষকদের ভাষ্য, ওই দিন বিকেলে অধ্যক্ষ তাঁদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তবে এরপরও বিভিন্নভাবে শিক্ষকদের ‘শায়েস্তা’ করার হুমকি-ধমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ তাঁদের।
আরেক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ক্ষমা চাওয়ার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে বলে আমরা আশা করেছিলাম। কিন্তু এখনো অনেক শিক্ষক চাপ ও আতঙ্কের মধ্যে আছেন। আমরা কোনো ব্যক্তিগত সুবিধা চাই না; প্রতিষ্ঠানে সুষ্ঠু পরিবেশ চাই।
অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো স্বজনপ্রীতি। শিক্ষকদের অভিযোগ, মাদ্রাসার বিভিন্ন পদে অধ্যক্ষের নিকটাত্মীয় ও স্বজনরা কর্মরত থাকায় প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রমে তাঁদের প্রভাব রয়েছে।
শিক্ষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অধ্যক্ষের মেয়ের জামাই হারুনুর রশিদ মাদ্রাসার মুহাদ্দিস, ভাতিজির জামাই রেজাউল করিম কৃষি বিভাগের শিক্ষক, ভাতিজা সাব্বির আহমেদ কম্পিউটার ল্যাব সহকারী, ছোট ভাই হুমায়ুন কবির নাইট গার্ড এবং শ্যালিকা আফরোজা বেগম আয়া হিসেবে কর্মরত।
এ কারণে কয়েকজন শিক্ষক প্রতিষ্ঠানটিকে ‘পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে’ পরিণত করার অভিযোগ তুলেছেন।
তবে আত্মীয়স্বজন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকলেই তা অনিয়ম বা স্বজনপ্রীতি প্রমাণ করে না। তাঁদের নিয়োগ কোন প্রক্রিয়ায় হয়েছে, নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না—এ বিষয়ে নথিপত্র যাচাই প্রয়োজন। এ বিষয়েও প্রশাসনিক তদন্তের দাবি জানিয়েছেন শিক্ষকরা।
শিক্ষকদের আরও অভিযোগ, মাদ্রাসার দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল—চার স্তরের পরীক্ষার বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনায় অধ্যক্ষের ভাতিজির জামাই এবং কৃষি বিভাগের শিক্ষক রেজাউল করিমকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়।
শিক্ষকদের প্রশ্ন, একই ব্যক্তিকে বিভিন্ন স্তরের পরীক্ষার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না এবং অন্য যোগ্য শিক্ষকদের কেন দায়িত্ব দেওয়া হয়নি- তা তদন্ত করে দেখা দরকার।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে অধ্যক্ষ মো. দেলোয়ার হোসেনের বক্তব্য জানতে সাংবাদিকেরা মাদ্রাসায় গেলে সাংবাদিক আসার খবর পেয়ে তিনি প্রতিষ্ঠান থেকে চলে যান বলে জানা গেছে।
তাঁর বক্তব্য নেওয়ার জন্য যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে শিক্ষকদের অভিযোগের বিষয়ে অধ্যক্ষের বক্তব্য প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
শিক্ষকদের অভিযোগ, ব্যক্তিগত বিরোধ থেকে নয়, বরং দীর্ঘদিনের অসন্তোষ ও সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর কারণে তাঁরা প্রশাসনের দ্বারস্থ হয়েছেন। তাঁদের দাবি, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে সত্যতা যাচাই করা হোক। পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাভাবিক ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা হোক।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরা খাতুনের কাছে অভিযোগ দেওয়ার বিষয়টি শিক্ষকেরা নিশ্চিত করেছেন। তিনি বিষয়টি দেখার আশ্বাস দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন অভিযোগকারী শিক্ষকরা।
ভোলদিঘি কামিল মাদ্রাসার মতো দীর্ঘদিনের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যক্ষ ও শিক্ষকদের বিরোধ প্রকাশ্যে চলে আসায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই, নিয়োগসংক্রান্ত নথি পরীক্ষা এবং সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর বিষয়ে প্রশাসনিক তদন্ত হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষকদের প্রত্যাশা, তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সেটিও স্পষ্ট করা হবে। এর মাধ্যমে প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষার্থীর শিক্ষা কার্যক্রমে তৈরি হওয়া অস্থিরতার অবসান হবে।
