কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (Artificial Intelligence) বর্তমান বিশ্বের অন্যতম যুগান্তকারী প্রযুক্তি। চিকিৎসা, শিক্ষা, কৃষি, গবেষণা, ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে গণমাধ্যম প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই এআই মানুষের কাজকে সহজ, দ্রুত ও কার্যকর করে তুলছে। সম্ভাবনার দিক থেকে এ প্রযুক্তি মানবসভ্যতার সামনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। কিন্তু প্রযুক্তির এই বিস্ময়কর অগ্রগতির পাশাপাশি এর অপব্যবহারও দিন দিন উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। সঠিক নিয়ন্ত্রণ ও নৈতিকতার অভাবে এআই যেমন কল্যাণের হাতিয়ার হতে পারে, তেমনি তা পরিণত হতে পারে ভয়ংকর ক্ষতির উৎসে।
এআই-এর অপব্যবহারের সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলোর একটি হলো ভুয়া তথ্য, ছবি, অডিও ও ভিডিও তৈরি। ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তির মুখ, কণ্ঠ বা বক্তব্য কৃত্রিমভাবে তৈরি করে তা বাস্তব বলে প্রচার করা সম্ভব হচ্ছে। রাজনীতিক, জনপ্রিয় ব্যক্তি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষও এর শিকার হচ্ছেন। এর ফলে ব্যক্তির সম্মানহানি, সামাজিক বিভ্রান্তি এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাই-বাছাই ছাড়াই এসব কনটেন্ট ছড়িয়ে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
গণমাধ্যমের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ : এআই-এর অপব্যবহারের ফলে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি তৈরি হয়েছে গণমাধ্যমের সামনে। সাংবাদিকতার মূল ভিত্তি হলো সত্য, নির্ভুলতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা। কিন্তু এআই দিয়ে যখন সহজেই ভুয়া ছবি, ভিডিও, কণ্ঠস্বর কিংবা কথোপকথন তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে, তখন কোনো তথ্য বা কনটেন্ট সত্য কি না তা যাচাই করা আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
একটি ভুয়া ছবি বা ভিডিও যদি যাচাই না করে সংবাদে ব্যবহার করা হয়, তাহলে মুহূর্তের মধ্যে তা হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। এতে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ক্ষতি হয় না, বরং পুরো গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে। বিশেষ করে ব্রেকিং নিউজের প্রতিযোগিতায় দ্রুত সংবাদ প্রকাশ করতে গিয়ে যাচাই প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের ঘাটতি থাকলে এর ভয়াবহ প্রভাব পড়তে পারে।
এআই সাংবাদিকদের কাজকে সহজ করতে পারে তথ্য বিশ্লেষণ, প্রতিবেদন সম্পাদনা, অনুবাদ, ডেটা বিশ্লেষণসহ নানা কাজে এর ইতিবাচক ব্যবহার রয়েছে। কিন্তু এআই দিয়ে তৈরি তথ্যকে সরাসরি সত্য ধরে নেওয়া কিংবা মানুষের নিজস্ব যাচাই-বাছাই ও অনুসন্ধানের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা কোনোভাবেই নিরাপদ নয়। একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব শুধু তথ্য প্রকাশ করা নয়; তথ্যটি সত্য, নির্ভরযোগ্য ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট কি না, সেটিও নিশ্চিত করা।
তাই গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য এআই যুগে নতুন ধরনের দক্ষতা অর্জন জরুরি। ছবি ও ভিডিওর উৎস যাচাই, ভুয়া কনটেন্ট শনাক্তকরণ, তথ্যের একাধিক উৎস নিশ্চিত করা এবং এআই-নির্ভর বিভ্রান্তিকর কনটেন্ট সম্পর্কে সচেতনতা সাংবাদিকতার অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠছে। একই সঙ্গে সংবাদমাধ্যমগুলোকে এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিজস্ব নীতিমালা ও নৈতিক নির্দেশনা তৈরি করতে হবে।
সাইবার অপরাধেও এআই-এর ব্যবহার নতুন মাত্রা যোগ করেছে। প্রতারকরা এখন আগের তুলনায় আরও বিশ্বাসযোগ্য ফিশিং বার্তা, ভুয়া কণ্ঠস্বর ও প্রতারণামূলক যোগাযোগ তৈরি করতে পারছে। ফলে সাধারণ মানুষের পক্ষে সত্য-মিথ্যা যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়ছে। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সাইবার অপরাধীদের কৌশলও উন্নত হওয়ায় ব্যক্তিগত তথ্য, অর্থ ও অনলাইন নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
শিক্ষাক্ষেত্রেও এআই-এর অপব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। শিক্ষার্থীদের জন্য এআই জ্ঞান অর্জন ও সৃজনশীলতার সহায়ক হতে পারে। কিন্তু নিজে চিন্তা না করে অ্যাসাইনমেন্ট, প্রজেক্ট বা লেখালেখির পুরো কাজ এআই দিয়ে করিয়ে নেওয়ার প্রবণতা শিক্ষার্থীদের মেধা ও সৃজনশীলতার বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য যেখানে জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন, সেখানে প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা সেই উদ্দেশ্যকে দুর্বল করে দিতে পারে।
অন্যদিকে, কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এআই নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ায় কিছু কাজের ক্ষেত্রে মানুষের প্রয়োজন কমে আসছে। যদিও নতুন প্রযুক্তি একদিকে নতুন ধরনের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে প্রচলিত অনেক কাজের ধরন পরিবর্তন বা বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তাই এআই-এর বিকাশের সঙ্গে কর্মীদের নতুন দক্ষতায় প্রশিক্ষিত করার বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এআই ব্যবহারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হলো ব্যক্তিগত গোপনীয়তা। মানুষের চলাফেরা, আচরণ, পছন্দ ও অনলাইন কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ ও ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এসব তথ্য যথাযথ অনুমতি, নিরাপত্তা ও নৈতিকতার সঙ্গে ব্যবহার না হলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও নাগরিক অধিকার হুমকির মুখে পড়তে পারে।
তবে এ কথা মনে রাখা জরুরি এআই নিজে কোনো অপরাধ করে না; এর ব্যবহার কীভাবে হবে, তা নির্ভর করে মানুষের ওপর। একই প্রযুক্তি যেমন চিকিৎসায় জীবন বাঁচাতে পারে, তেমনি অপব্যবহারে কারও সম্মান, অর্থ বা নিরাপত্তা নষ্ট করতে পারে। তাই এআইকে ভয় পাওয়ার চেয়ে এর দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করাই বেশি জরুরি।
এ জন্য রাষ্ট্রকে কার্যকর আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে দায়িত্বশীলতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে এবং ব্যবহারকারীদের ডিজিটাল সচেতনতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও সাংবাদিকদের প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি সাংবাদিকতার মৌলিক নীতি সত্যতা, নিরপেক্ষতা, তথ্য যাচাই ও জনস্বার্থ আরও দৃঢ়ভাবে অনুসরণ করতে হবে।
এআই মানবসভ্যতার জন্য এক বিশাল সম্ভাবনার নাম। এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে প্রযুক্তির সঙ্গে নৈতিকতা, সচেতনতা ও জবাবদিহিতার সমন্বয় ঘটাতে হবে। বিশেষ করে গণমাধ্যমকে হতে হবে আরও সতর্ক ও দায়িত্বশীল, কারণ একটি ভুল তথ্য যেমন সমাজে বিভ্রান্তি ছড়াতে পারে, তেমনি একটি যাচাই করা সত্য মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে। এআই যেন মানুষের বিকল্প হয়ে মানুষের ক্ষতির কারণ না হয়, বরং মানুষের জীবন ও সমাজকে আরও নিরাপদ, সহজ ও উন্নত করে সেটিই হওয়া উচিত আমাদের সম্মিলিত লক্ষ্য।
লেখক পরিচিতি : শরীফুল ইসলাম, জেলা প্রতিনিধি, (এনটিভি, জাগো নিউজ ও আগামীর সময়), যুগ্ম বার্তা সম্পাদক চাঁদপুর প্রবাহ, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আমাদের অঙ্গীকার।
