Site icon Chandpur Probaha | চাঁদপুর প্রবাহ

জরাজীর্ণ ঘরে দম্পতির মৃত্যুর প্রহর গোনা!

সুজন পোদ্দার
সকাল গড়িয়ে দুপুর। ভাঙাচোরা টিনের ঘরের সামনে বসে আছেন মনোয়ারা বেগম। চোখেমুখে ক্লান্তির ছাপ, শরীরও আর সায় দেয় না। তবু বেঁচে থাকার তাগিদে মাঝে মধ্যেই বের হতে হয় মানুষের দ্বারে দ্বারে। কারও কাছে এক মুঠো চাল, কারও কাছে কয়েকটি টাকা—এভাবেই চলে তাঁর জীবনসংগ্রাম। কারণ, ঘরে অপেক্ষা করছেন অসুস্থ স্বামী হুমায়ন কবির। দুজনই প্যারালাইসিসে আক্রান্ত। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এই দম্পতির কাছে এখন প্রতিটি দিনই টিকে থাকার যুদ্ধ।
কচুয়া উপজেলার কড়ইয়া ইউনিয়নের উত্তর ডুমুরিয়া গ্রামের নতুন বাড়িতে তিন শতক জমির ওপর একটি জরাজীর্ণ ঘরে বসবাস করেন মনোয়ারা বেগম (৬০) ও তাঁর স্বামী হুমায়ন কবির (৭০)। সংসারে তিন মেয়ে থাকলেও তারা সবাই বিবাহিত। নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। ফলে জীবনের এই শেষ সময়ে অসুস্থ মা–বাবার পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ১৯৮৮ সালে বিয়ে হয় মনোয়ারা ও হুমায়নের। স্বামী হুমায়ন কবির চট্টগ্রামে শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। তাঁর উপার্জনে কোনো রকমে চলত সংসার। মেয়েদের বড় করেছেন, বিয়ে দিয়েছেন। তখনও ভাবেননি, একদিন জীবন এভাবে থমকে যাবে।
১৯৯৮ সালে হঠাৎ প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হন মনোয়ারা বেগম। সংসারের নানা কষ্টের মধ্যেও তিনি হাল ছাড়েননি। কিন্তু ২০০৬ সালে স্বামী হুমায়ন কবিরও প্যারালাইসিসে আক্রান্ত হয়ে কর্মক্ষমতা হারান। এরপর থেকেই পরিবারটির দুর্দশা চরম আকার ধারণ করে।
দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসার অভাব, আর্থিক সংকট ও শারীরিক অক্ষমতার কারণে এখন দুজনেরই চলাফেরা কষ্টকর হয়ে উঠেছে। একসময় সংসারের হাল ধরার চেষ্টা করলেও বয়স ও অসুস্থতার কারণে এখন আর তা সম্ভব হচ্ছে না মনোয়ারার পক্ষে।
বর্তমানে তাঁদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন ভিক্ষাবৃত্তি। প্রতিদিন মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে যা পান, তা দিয়েই চলে দুজনের খাবার। কিন্তু সব দিন সমান যায় না। অনেক দিনই খালি হাতে ফিরতে হয়।
কথা বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন মনোয়ারা বেগম। তিনি বলেন, স্বামীর যখন রুজি আছিল, তখন ভালো খাইছি। সংসারে কষ্ট থাকলেও না খাইয়া থাকতে হয় নাই। এখন স্বামী কাম করতে পারে না, আমিও অসুস্থ। মানুষের দুয়ারে দুয়ারে যাই সাহায্যের জন্য। কোনো দিন খাই, কোনো দিন না খাইয়া ঘুমাই। এখন শরীরও আর সায় দেয় না। আপনারা যদি একটু সাহায্য করেন, তাহলে হয়তো কিছুদিন ভালোভাবে বাঁচতে পারব।
মনোয়ারার কণ্ঠে হতাশা থাকলেও শেষ পর্যন্ত বেঁচে থাকার আকুতিটা স্পষ্ট। তিনি বলেন, আমরা তো বেশি কিছু চাই না। দুবেলা খাইতে পারলেই হইত। অসুখের জন্য একটু চিকিৎসা পাইলে হইত।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানান, দম্পতির অবস্থা অত্যন্ত করুণ। নিয়মিত চিকিৎসা তো দূরের কথা, অনেক সময় খাবারের ব্যবস্থাও থাকে না। তাঁরা বলেন, সরকারি সহায়তা এবং সমাজের বিত্তবান মানুষের সহযোগিতা ছাড়া এই দম্পতির জীবনমান উন্নয়ন সম্ভব নয়।
স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, বৃদ্ধ বয়সে তারা যে কষ্ট করছেন, সেটা খুবই মর্মান্তিক। অনেক সময় তাদের ঘরে খাবার থাকে না। আমরা সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্য করি। কিন্তু স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে কচুয়া উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. নাহিদ ইসলাম বলেন, মনোয়ারা বেগম ও হুমায়ন কবির দম্পতির করুণ পরিস্থিতির বিষয়টি জেনেছি। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। দ্রুত একজন সমাজকর্মী পাঠিয়ে তাঁদের বর্তমান অবস্থা যাচাই করা হবে। পরে সরকারি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির আওতায় আনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, যদি তারা উপযুক্ত হন, তাহলে বয়স্ক ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা কিংবা অন্যান্য সহায়তা কর্মসূচির আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
দেশে প্রবীণ ও অসহায় মানুষের জন্য বিভিন্ন সরকারি সহায়তা কর্মসূচি থাকলেও অনেকেই তথ্যের অভাব, যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা কিংবা প্রশাসনিক জটিলতার কারণে সেসব সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। মনোয়ারা ও হুমায়ন দম্পতির জীবনও যেন সেই বাস্তবতারই প্রতিচ্ছবি।
বয়সের শেষ প্রান্তে এসে তাঁদের চাওয়া খুব সামান্য—দুবেলা খাবার, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা আর একটু মানবিক সহায়তা। কিন্তু সেই সামান্য চাওয়াটুকুও এখন তাঁদের কাছে বড় স্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জীর্ণ ঘরের বারান্দায় বসে থাকা এই বৃদ্ধ দম্পতির চোখে এখনও ক্ষীণ এক আশার আলো। হয়তো কোনো সহৃদয় মানুষ এগিয়ে আসবেন, হয়তো মিলবে চিকিৎসার সুযোগ, হয়তো আর অভুক্ত থাকতে হবে না। সেই আশাতেই দিন গুনছেন মনোয়ারা ও হুমায়ন।

Exit mobile version