Site icon Chandpur Probaha | চাঁদপুর প্রবাহ

হারাধনের গল্পে জীবনের প্রতিচ্ছবি :  আল ইমরান শোভন

জীবন কখনো সরলরেখার মতো নয়। কখনো তা বক্র, কখনো ভাঙাচোরা, আবার কখনো যেন এক অদৃশ্য গল্পের পুনরাবৃত্তি।

অনেক সময় মনে হয়, আমরা যেন পূর্বলিখিত কোনো গল্পের চরিত্র-যেখানে ঘটনাগুলো একে একে মিলে যায়, সাহিত্য আর বাস্তবতার মাঝে খুঁজে পাওয়া যায় অদ্ভুত সাদৃশ্য।
ঠিক যেন সেই পরিচিত ছড়ার মতো-
“হারাধনের দশটি ছেলে,
ঘুরতে গেল মেলায়,
একটি কোথায় হারিয়ে গেল,
রইল বাকি নয়…”
এভাবেই একে একে কমতে থাকে সংখ্যা, হারিয়ে যেতে থাকে আপনজন। শেষ পর্যন্ত থাকে শুধু শূন্যতা আর স্মৃতি।
মানুষের জীবনে প্রতিটি দিনই গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি সময়- সবই গাণিতিকভাবে হিসাবযোগ্য। কিন্তু এই হিসাবের ভেতরেও কিছু দিন থাকে, যেগুলো কেবল সংখ্যা হয়ে থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে অনুভূতির গভীরতম অংশ। কিছু তারিখ আমাদের মনে এমনভাবে গেঁথে যায়, যা সময়ের সাথে মুছে যায় না।
এমনই একটি তারিখ হতে পারে ‘২৩’ কিংবা ‘২৪’। ক্যালেন্ডারের পাতায় এগুলো কেবল সংখ্যা, কিন্তু বাস্তব জীবনে এগুলো হয়ে ওঠে স্মৃতির প্রতীক। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধান- একদিন হয়তো সবকিছু স্বাভাবিক, আর পরদিনই কেউ হারিয়ে যায় চিরতরে।
ঠিক যেমন হারাধনের গল্পে- একজন করে হারিয়ে যায়, আর বাকিরা দাঁড়িয়ে থাকে এক অদ্ভুত শূন্যতার সামনে।
নিকটাত্মীয়ের জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে মানুষ এক অদ্ভুত মানসিক অবস্থার মধ্যে দিয়ে যায়। একদিকে আশা, অন্যদিকে অজানা ভয়। মনে হয়, যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি আমাদের প্রস্তুত করছে- একটি অনিবার্য বিদায়ের জন্য। কিন্তু যখন সেই মুহূর্ত আসে, তখন সব প্রস্তুতি ভেঙে পড়ে।
এই বিদায়ের মুহূর্তগুলো শুধু কাঁদায় না, বরং মানুষকে নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। জীবন কতটা ক্ষণস্থায়ী, সম্পর্ক কতটা মূল্যবান-এই উপলব্ধি তখন গভীর হয়ে ওঠে। একজন মানুষ হারিয়ে গেলে, তার শূন্যতা ঠিক সেই ছড়ার মতোই ধরা পড়ে-
একজন নেই, কিন্তু তার অভাব পুরো সংখ্যাটাকেই বদলে দেয়।
জীবনের কঠিন সময়গুলোতে আমরা অনেক মানুষের সান্নিধ্য পাই। কিন্তু যখন বিদায়ের ঘণ্টা বাজে, তখন সম্পর্কের গভীরতা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়।
একজন প্রিয় মানুষের মৃত্যু মানে শুধু তার চলে যাওয়া নয়; বরং তার সাথে জড়িয়ে থাকা একটি পুরো পৃথিবীর বদলে যাওয়া।
বিশেষ করে যখন কেউ দীর্ঘদিন রোগে ভোগে, তখন তার প্রতিটি নিঃশ্বাস যেন একটি যুদ্ধ। সেই যুদ্ধের সাক্ষী হওয়া- একজন আপন মানুষের জন্য সবচেয়ে কষ্টকর অভিজ্ঞতা। তখন মনে হয়, হারাধনের গল্পের সেই হারিয়ে যাওয়া সংখ্যাগুলো যেন বাস্তব হয়ে উঠছে।
এই সময়গুলোতে মানুষ সবচেয়ে বেশি নির্ভর করে সৃষ্টিকর্তার ওপর। বিশ্বাস আর প্রার্থনাই হয়ে ওঠে একমাত্র আশ্রয়। আমরা মেনে নিতে শিখি- সব হারানোই শেষ নয়, কিছু হারানো আমাদের ভেতরেই থেকে যায়।
কারণ, স্মৃতি কখনো মরে না।
মানুষ চলে যায়, কিন্তু তার উপস্থিতি থেকে যায় আমাদের ভেতরে।
হারাধনের গল্পে যেমন সংখ্যা কমতে থাকে, কিন্তু গল্প শেষ হয় না- তেমনি জীবনের গল্পও থেমে থাকে না। বরং প্রতিটি হারানো আমাদের আরও গভীর করে, আরও মানবিক করে।
জন্মভূমিতে হোক বা দূরদেশে- প্রিয় মানুষের অনুপস্থিতি সর্বত্রই অনুভূত হয়। হঠাৎ কোনো স্মৃতি এসে দাঁড়ায় সামনে, মনে হয়- সে যেন এখানেই আছে, শুধু দেখা যায় না।
এই বাস্তবতা থেকে কেউ পালাতে পারে না। কিন্তু এই বেদনার মধ্য দিয়েই মানুষ পরিণত হয়। সহমর্মিতা জন্ম নেয়, ভালোবাসার গভীরতা বোঝা যায়।
“হারাধনের গল্প” তাই শুধু একটি ছড়া নয়; এটি জীবনের প্রতিচ্ছবি।
যেখানে একে একে হারিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়েই আমরা বুঝি- কারা সত্যিই আমাদের ছিল।
শেষ পর্যন্ত, জীবন এগিয়ে চলে।
সময় থেমে থাকে না।
কিন্তু কিছু মানুষ, কিছু মুহূর্ত, কিছু তারিখ- চিরকাল আমাদের ভেতরে বেঁচে থাকে।
আর সেই বেঁচে থাকাই প্রমাণ করে- হারিয়ে গেলেও, ভালোবাসা কখনো হারায় না।
নিকটাত্মীয়ের বিদায় আমাদের ভেতরে এক ধরনের আত্মসমালোচনার জন্ম দেয়। আমরা ভাবতে শুরু করি- জীবন আসলে কতটা ক্ষণস্থায়ী, আর আমরা কীভাবে তা ব্যবহার করছি। এই ভাবনা থেকে জন্ম নেয় নতুন এক দৃষ্টিভঙ্গি, যেখানে সম্পর্ক, মানবিকতা ও সময়ের মূল্য অনেক বেশি গুরুত্ব পায়।
প্রকৃতির নিয়মই যেন এমন- যে চলে যায়, সে কেবল শূন্যতা রেখে যায় না; রেখে যায় শিক্ষা, স্মৃতি এবং নতুন করে বেঁচে থাকার প্রেরণা। প্রতিটি বিদায় মানুষকে একটু করে পরিণত করে, একটু বেশি সংবেদনশীল করে তোলে। অন্যের কষ্ট বোঝার ক্ষমতা বাড়ে, সহমর্মিতা গভীর হয়।
এইভাবে, নিকটাত্মীয় বা কোনো বন্ধুর বিদায় কেবল বেদনার গল্প নয়; এটি আত্মবোধেরও গল্প। এটি আমাদের শেখায় কীভাবে হারানোর মাঝেও পাওয়া যায় জীবনের নতুন অর্থ। আর এই শিক্ষাই মানুষকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়।
লেখক : আল ইমরান শোভন
সাবেক সাধারণ সম্পাদক, চাঁদপুর প্রেসক্লাব। জেলা প্রতিনিধি : চ্যানেল ২৪, বিডিনিউজ ২৪ ডটকম, দৈনিক যায়যায়দিন। প্রধান বার্তা সম্পাদক : দৈনিক চাঁদপুর প্রবাহ
Exit mobile version