আল ইমরান শোভন
ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই চাঁদপুরের মাছঘাটে শুরু হয় ব্যস্ততা। বরফে মোড়ানো ঝুড়িতে একের পর এক ওঠে রুপালি ইলিশ। নিলামের ডাক, জেলেদের হাঁকডাক আর ক্রেতাদের দর-কষাকষিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। সেই ব্যস্ততার মাঝেই হাতে মোবাইল ফোন নিয়ে একের পর এক কল রিসিভ করছেন এক তরুণ। কোথাও ঢাকার অর্ডার, কোথাও চট্টগ্রামের, আবার কোথাও দেশের অন্য প্রান্তের কোনো ক্রেতা অপেক্ষা করছেন চাঁদপুরের আসল ইলিশের জন্য।
এই তরুণের নাম মো. ফাহিম খান। বয়সে তরুণ হলেও ব্যবসায়িক চিন্তায় তিনি অনেক দূর এগিয়ে। মাত্র পাঁচ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করা তাঁর অনলাইন ইলিশ ব্যবসা এখন বছরে প্রায় ১৮ লাখ টাকার আয়ের পথ তৈরি করেছে।
চাঁদপুর সদর উপজেলার বাবুরহাট এলাকার বাসিন্দা ফাহিম বর্তমানে ঢাকার স্টার্ন ইউনিভার্সিটিতে স্নাতক পর্যায়ে পড়াশোনা করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, পরীক্ষা আর অ্যাসাইনমেন্টের ফাঁকেই সামলান ব্যবসার পুরো কার্যক্রম। তাঁর বিশ্বাস, ইচ্ছাশক্তি থাকলে পড়াশোনা ও উদ্যোক্তা জীবন একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
ফাহিমের বাবা মরহুম মো. শাহজাহান খান ছিলেন ব্যবসায়ী। মা রওশনআরা খানম গৃহিণী। পরিবার থেকেই ব্যবসার প্রতি আগ্রহ তৈরি হলেও নিজের পথটি তাঁকে নিজেকেই তৈরি করতে হয়েছে।
২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় যখন অনেক তরুণ অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছিলেন, তখন ফাহিম খুঁজছিলেন নতুন সম্ভাবনা। নিজের জেলার সবচেয়ে বড় পরিচয়—ইলিশকে কেন্দ্র করেই শুরু করেন অনলাইন ব্যবসা। মূলধন ছিল মাত্র পাঁচ হাজার টাকা।
শুরুর দিনগুলোর কথা মনে করে ফাহিম বলেন, অনলাইনে মাছ বিক্রি করব শুনে অনেকেই হাসতেন। কেউ কেউ বলতেন, মাছ আবার অনলাইনে বিক্রি হয় নাকি! কিন্তু আমি বিশ্বাস করতাম, যদি ভালো পণ্য আর সৎ সেবা দিতে পারি, তাহলে মানুষ একদিন বিশ্বাস করবে।
সেই বিশ্বাসই ধীরে ধীরে তাঁর ব্যবসার ভিত্তি হয়ে ওঠে। প্রথমে পরিচিত কয়েকজন, পরে তাঁদের মাধ্যমে নতুন ক্রেতা। একসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হয় নিয়মিত ক্রেতাদের একটি বড় নেটওয়ার্ক।
বর্তমানে শুধু চাঁদপুর নয়, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁর নিয়মিত ক্রেতা রয়েছেন। তিনি ক্যাশ অন ডেলিভারি পদ্ধতিতে ইলিশ বিক্রি করেন। অর্থাৎ ক্রেতা পণ্য হাতে পাওয়ার পর মূল্য পরিশোধ করেন। এতে নতুন ক্রেতাদের মধ্যেও আস্থা তৈরি হয়েছে।
ফাহিম বলেন, আমার কাছে লাভের চেয়ে বিশ্বাস বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন ক্রেতা সন্তুষ্ট হলে তিনি আরও কয়েকজন নতুন ক্রেতা নিয়ে আসেন। তাই আমি কখনো মানের সঙ্গে আপস করি না।
বর্তমানে প্রতি মাসে তাঁর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ১২ থেকে ১৩ লাখ টাকার ইলিশ বিক্রি হয়। মাস শেষে মুনাফা থাকে প্রায় এক লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা। সব মিলিয়ে বছরে তাঁর আয় প্রায় ১৮ লাখ টাকা।
তবে সংখ্যার এই হিসাবের চেয়েও বড় বিষয় হলো, তিনি চাঁদপুরের ইলিশকে একটি বিশ্বস্ত অনলাইন ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান।
ফাহিমের ভাষায়, চাঁদপুরের নাম শুনলেই মানুষের মনে ইলিশের কথা আসে। আমি চাই, মানুষ অনলাইনে ইলিশ কিনতে গেলেও প্রথমে চাঁদপুরের কথাই ভাবুক। আমাদের জেলার আসল ইলিশ দেশের প্রতিটি পরিবারের খাবার টেবিলে পৌঁছে দিতে চাই।
এই পথচলায় নানা প্রতিবন্ধকতাও এসেছে। অনলাইনে প্রতারণার কারণে অনেক ক্রেতা শুরুতে আস্থা রাখতে চাননি। আবার সময়মতো মাছ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও নিরাপদে পৌঁছে দেওয়াও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু প্রতিটি সমস্যাকেই শেখার সুযোগ হিসেবে নিয়েছেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে চাকরির পেছনে না ছুটে নিজের উদ্যোগকে আরও বড় করার পরিকল্পনা করছেন ফাহিম। তাঁর স্বপ্ন, ঢাকায় একটি আধুনিক ‘ইলিশ এক্সপেরিয়েন্স সেন্টার’ গড়ে তোলা। সেখানে ক্রেতারা বিভিন্ন ধরনের রান্না করা ইলিশের স্বাদ গ্রহণ করতে পারবেন। পছন্দ হলে সেখান থেকেই অর্ডার দেবেন।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমি শুধু মাছ বিক্রি করতে চাই না। মানুষ যেন ইলিশকে একটি অভিজ্ঞতা হিসেবে উপভোগ করে, সেই পরিবেশ তৈরি করতে চাই।
তরুণদের উদ্দেশে তাঁর বার্তা, ছোট পুঁজি কোনো বাধা নয়। প্রয়োজন সততা, ধৈর্য আর পরিশ্রম। শুরুটা ছোট হলেও স্বপ্নটা বড় হতে হবে।
চাঁদপুরের রুপালি ইলিশের খ্যাতি বহু দিনের। সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রযুক্তিকে যুক্ত করে নতুন সম্ভাবনার গল্প লিখছেন ফাহিম খান। তাঁর গল্প শুধু একজন উদ্যোক্তার সাফল্যের গল্প নয়; এটি দেখিয়ে দেয়, স্থানীয় সম্পদকে কাজে লাগিয়ে নতুন প্রজন্মও গড়ে তুলতে পারে টেকসই ব্যবসা।
হয়তো কয়েক বছর পর ঢাকার কোনো আধুনিক এক্সপেরিয়েন্স সেন্টারে বসে কেউ ইলিশের স্বাদ নিতে নিতে জানবেন- এই যাত্রার শুরু হয়েছিল চাঁদপুরের এক তরুণের মাত্র পাঁচ হাজার টাকার স্বপ্ন থেকে।
