।। নাসির উদ্দিন পাঠান।।
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ—এই দুটি শব্দ একসঙ্গে উচ্চারণ করাই একসময় ছিল প্রায় অসম্ভব কল্পনা। সেই কল্পনাকেই বাস্তবে রূপ দিল বাংলাদেশ। ডারউইনে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে শুধু একটি টেস্ট ম্যাচই জেতেনি বাংলাদেশ; ২৬ বছরের টেস্ট ইতিহাসে নিজেদের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি লিখেছে।
বাংলাদেশের ক্রিকেটে অনেক ঐতিহাসিক দিন এসেছে। ২০০৫ সালে প্রথম টেস্ট জয়, ২০০৯ সালে প্রথম বিদেশের মাটিতে টেস্ট জয়, ২০১৬ সালে ইংল্যান্ডকে হারানো, ২০১৭ সালে অস্ট্রেলিয়াকে ঘরের মাঠে পরাজিত করা, ২০২২ সালে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে জয়, ২০২৪ সালে পাকিস্তানকে তাদের মাটিতে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ হারানো—প্রতিটি জয়ই বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের বিবর্তনের আলাদা মাইলফলক। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারানোর মাহাত্ম্য যেন অন্যরকম।
কারণ প্রতিপক্ষ শুধু অস্ট্রেলিয়া নয়; প্রতিপক্ষ ছিল অস্ট্রেলিয়ার মাটি, পরিবেশ, বাউন্স, গতি, কন্ডিশন এবং একটি দীর্ঘ ক্রিকেট ঐতিহ্য। তার ওপর স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়া তখন বিশ্বের শীর্ষ টেস্ট দল। সেই দলকে চার দিনের মধ্যে ৯ উইকেটে হারানো নিছক জয় নয়—এটি বাংলাদেশের টেস্ট সামর্থ্যের একটি বড় ঘোষণা।
১৯৮ থেকে ৪২৬—জয়ের ভিত্তি সেখানেই
ডারউইন টেস্টের গল্পটি শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের বোলিং দিয়ে। অস্ট্রেলিয়া প্রথম ইনিংসে গুটিয়ে যায় মাত্র ১৯৮ রানে। হাসান মাহমুদ একাই নেন ৬ উইকেট। এরপর ব্যাট হাতে বাংলাদেশ করে ৪২৬ রান—অস্ট্রেলিয়ার চেয়ে ২২৮ রানের বিশাল লিড।
এই ইনিংসে তানজিদ হাসানের ১০১ রান ছিল ঐতিহাসিক। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট সেঞ্চুরি করা প্রথম বাংলাদেশি ব্যাটার তিনি। অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪ এবং মেহেদী হাসান মিরাজের ৬৫ রানও বাংলাদেশের বড় লিড তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
দ্বিতীয় ইনিংসে অস্ট্রেলিয়া লড়াই করার চেষ্টা করেছিল। ক্যামেরন গ্রিনের ১০৪ রানের সেঞ্চুরি তাদের ইনিংসকে ২৮৪ পর্যন্ত নিয়ে যায়। কিন্তু মেহেদী হাসান মিরাজের ৫ উইকেট এবং হাসান মাহমুদের ধারাবাহিক আক্রমণে অস্ট্রেলিয়া বড় লিড নিতে পারেনি। বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান। ১৪.২ ওভারে এক উইকেট হারিয়েই সেই লক্ষ্য পেরিয়ে যায় বাংলাদেশ।
ম্যাচে হাসান মাহমুদের শিকার ৯ উইকেট। ম্যাচসেরাও তিনি। অর্থাৎ জয়টি কোনো আকস্মিক ব্যাটিং ঝড়ের ফল নয়; বোলিং, ব্যাটিং, ফিল্ডিং—তিন বিভাগেই বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়াকে টেক্কা দিয়েছে।
২০০০ থেকে ২০২৬—বাংলাদেশ কোথা থেকে কোথায়?
বাংলাদেশ টেস্ট মর্যাদা পায় ২০০০ সালে। ভারতের বিপক্ষে ঢাকায় অভিষেক টেস্টে হার দিয়ে শুরু হয়েছিল যাত্রা। প্রথম কয়েক বছর ছিল হতাশায় ভরা। ২০০১ থেকে ২০০৪ সালের মধ্যে টানা ২১টি টেস্ট হারের রেকর্ডও তৈরি হয়েছিল।
২০০৫ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আসে প্রথম টেস্ট জয়। এরপর ২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বিদেশের মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়। ২০১৭ সালে শ্রীলঙ্কায় জয়, ২০২১ সালে জিম্বাবুয়ে এবং ২০২২ সালে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ঐতিহাসিক সাফল্য আসে। ২০২৪ সালে পাকিস্তানের মাটিতে ২-০ সিরিজ জয় বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটকে নতুন আত্মবিশ্বাস দেয়।
২০২৬ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাংলাদেশ খেলেছিল ১৫৯টি টেস্ট—জয় ২৭, হার ১১৩, ড্র ১৯। ডারউইনের জয় যোগ হওয়ার পর সংখ্যাটি দাঁড়াল ১৬০ টেস্টে ২৮ জয়, ১১৩ হার ও ১৯ ড্র। অর্থাৎ দীর্ঘ সময়ের পরাজয়ের ইতিহাসের মাঝেও বাংলাদেশ এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে বিশ্বের শক্তিশালী দলগুলোর মাটিতেও জয় ছিনিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
ভারত ও পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনা করলে কোথায় এই জয় এগিয়ে?
এখানেই সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রশ্ন।
প্রথমেই বলতে হয়—ভারতের টেস্ট অর্জনের সঙ্গে এই জয়কে সরাসরি তুলনা করে বাংলাদেশের জয়কে বড় বলা যাবে না। ভারত অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বহু দশকের অভিজ্ঞ দল। শুধু ২০০০ সালের পরই তারা অস্ট্রেলিয়ায় একাধিক টেস্ট জিতেছে এবং ২০১৮-১৯ ও ২০২০-২১ সালে পরপর দুইবার সিরিজ জিতেছে। ২০১৮-১৯ সালে ভারত ছিল অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জেতা প্রথম এশীয় দল; ২০২০-২১ সালে অ্যাডিলেডে ৩৬ রানে অলআউট হওয়ার ধাক্কা সামলে মেলবোর্ন ও ব্রিসবেনে জিতে আবার সিরিজ জেতে।
অর্থাৎ ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের অর্জন বড়—এ কথা পরিসংখ্যান সমর্থন করে না। বরং ভারতের অস্ট্রেলিয়া জয় এখনো অনেক বড় অধ্যায়।
কিন্তু বাংলাদেশের জয়টি অন্য জায়গায় এগিয়ে—অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশার বিচারে।
ভারত যখন অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জিতেছে, তখন তাদের ছিল বিশাল টেস্ট অবকাঠামো, দীর্ঘ বিদেশ সফরের অভিজ্ঞতা, বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী ক্রিকেট অর্থনীতি এবং একাধিক প্রজন্মের আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেটার। বাংলাদেশ সেখানে মাত্র দ্বিতীয়বার অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট সিরিজ খেলতে গিয়ে প্রথম জয়টি তুলে নিল। ২০০৩ সালের পর ২৩ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে বাংলাদেশের পরবর্তী অস্ট্রেলিয়া সফরের জন্য।
আর পাকিস্তানের সঙ্গে তুলনাটা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। ২০০০ সালের পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে পাকিস্তানের কোনো টেস্ট জয় নেই—অথচ পাকিস্তান বাংলাদেশের চেয়ে অনেক পুরোনো টেস্ট শক্তি এবং ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপজয়ী দল। অস্ট্রেলিয়ায় পাকিস্তানের শেষ দিককার টেস্ট সাফল্যের ইতিহাসও মূলত পুরোনো সময়ের।
সেই অর্থে বাংলাদেশের এই জয় পাকিস্তানের চেয়ে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় এগিয়ে—বাংলাদেশ টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পরের যুগে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টেস্ট জয় পেয়েছে, পাকিস্তান পারেনি।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় পরিবর্তন—বিদেশে জেতার মানসিকতা
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল বিদেশের মাটিতে টেস্ট। ২০০০ থেকে দীর্ঘ সময় বিদেশে জয় ছিল হাতে গোনা। ২০২৪ সালের পাকিস্তান সফরের আগে বাংলাদেশের বিদেশের মাটিতে জয় ছিল মাত্র কয়েকটি; পাকিস্তানকে হারিয়ে সেই তালিকায় নতুন মাত্রা যোগ হয়। এরপর অস্ট্রেলিয়ার মতো কঠিন পরিবেশে জয় প্রমাণ করল—বাংলাদেশের সাফল্য আর শুধু ঘরের মাঠের স্পিনবান্ধব কন্ডিশনে সীমাবদ্ধ নয়।
২০০৯ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজ, ২০১৩ সালে জিম্বাবুয়ে, ২০১৭ সালে শ্রীলঙ্কা, ২০২১ সালে জিম্বাবুয়ে, ২০২২ সালে নিউজিল্যান্ড এবং ২০২৪ সালে পাকিস্তান—এই ধারার সঙ্গে এবার যুক্ত হলো অস্ট্রেলিয়া।
এর মধ্যে নিউজিল্যান্ডের মাউন্ট মঙ্গানুই জয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ সেটি ছিল নিউজিল্যান্ডের মাটিতে তাদের ১৭ ম্যাচের অপরাজিত রেকর্ড ভাঙা। আর অস্ট্রেলিয়ার জয় সেই ধারাকেই আরও উঁচুতে নিয়ে গেল।
এই জয় কি বাংলাদেশের সেরা টেস্ট জয়?
আমার চোখে—হ্যাঁ, আপাতত এটিই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় টেস্ট জয়।
কারণ জয়টির পাশে একসঙ্গে কয়েকটি শব্দ বসে যাচ্ছে—অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রেলিয়ার মাটি, শীর্ষ দল, ৯ উইকেট, ২২৮ রানের প্রথম ইনিংস লিড এবং চার দিনের মধ্যে জয়।
২০১৭ সালে বাংলাদেশ ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়েছিল। সেটিও ঐতিহাসিক। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে একই কাজ করা মানে চ্যালেঞ্জের মাত্রা কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়া।
আর ২০২৪ সালে পাকিস্তানের মাটিতে ২-০ সিরিজ জয় ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বিদেশি সিরিজ সাফল্য। এবার অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম জয় সেই অর্জনের ওপর আরেকটি স্তর যোগ করল।
তবে একটি সতর্কবার্তাও আছে
একটি টেস্ট জয় মানেই বাংলাদেশ এখন অস্ট্রেলিয়া, ভারত বা পাকিস্তানের সমপর্যায়ের টেস্ট শক্তি—এমন দাবি করা ঠিক হবে না। বাংলাদেশের ১৬০ টেস্টে ২৮ জয় এবং ১১৩ পরাজয়ের পরিসংখ্যান এখনো বলে দেয় পথ অনেক বাকি।
কিন্তু ক্রিকেটে সব পরিবর্তনের শুরু হয় একটি বিশ্বাস থেকে।
একসময় বাংলাদেশ বিদেশে জিততে পারবে—এটি ছিল স্বপ্ন।
তারপর বাংলাদেশ বিদেশে জিততে শুরু করেছে।
পাকিস্তানকে তাদের মাটিতে ২-০ হারিয়েছে।
নিউজিল্যান্ডকে তাদের মাটিতে হারিয়েছে।
এবার অস্ট্রেলিয়াকেও তাদের মাটিতে হারাল।
তাই ডারউইনের এই জয় শুধু স্কোরবোর্ডের একটি ফলাফল নয়। এটি বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের মানসিক বিবর্তনের প্রতীক।
২০০০ সালে ভারত দিয়ে শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের টেস্টযাত্রা। ২৬ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে সেই যাত্রা যেন নতুন একটি বাঁকে পৌঁছাল।
ভারত অস্ট্রেলিয়ায় সিরিজ জিতেছে—দুবার। পাকিস্তানের সেই সৌভাগ্য হয়নি এই শতাব্দীতে। আর বাংলাদেশ? তারা এখনো সিরিজ জেতেনি অস্ট্রেলিয়ায়, কিন্তু প্রথম সুযোগেই দরজা খুলে দিয়েছে।
সামনে দ্বিতীয় টেস্ট। এরপর হয়তো আরও বড় প্রশ্ন—বাংলাদেশ কি অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে সিরিজও জিততে পারে?
সেটির উত্তর সময় দেবে।
কিন্তু আজকের সত্য একটাই—
অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাঘ গর্জেছে। আর সেই গর্জন শুধু ডারউইনে শোনা যায়নি; বাংলাদেশের ২৬ বছরের টেস্ট ইতিহাসেও তার প্রতিধ্বনি দীর্ঘদিন থাকবে।
লেখক : নাসির উদ্দিন পাঠান, গণমাধ্যম কর্মী, ঢাকা।
