কিশোরগ্যাং নিয়ন্ত্রণ ও ক্লুলেস হত্যার রহস্য উদযাটনে বিশেষ সাফল্য
নিজস্ব প্রতিবেদক :
চাঁদপুরের পুলিশ সুপার হিসেবে দায়িত্ব পালনের এক বছর পূর্ণ করেছেন মুহম্মদ আব্দুর রকিব (পিপিএম)। গতবছরের ১৯ সেপ্টেম্বর দায়িত্ব গ্রহনের পর থেকেই সততা, নিষ্ঠা, দায়িত্বশীলতা ও আন্তরিকতার সাক্ষর রেখে চলেছেন তিনি। আচার-আচরণে অত্যন্ত আন্তরিক-সৌহার্দ্যপূর্ণ হলেও আইনের যথাযথ প্রয়োজনে অত্যন্ত কঠোর এই কর্মকর্তা।
তিনি চাঁদপুরে যোগদানের পর থেকেই প্রতিটি ক্ষেত্রে দক্ষতার প্রমাণ রাখছেন। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পুলিশে চাকুরি, অপরাধ দমন, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা, মাদকদ্রব্য উদ্ধার, কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম বেগবান, সাজাপ্রাপ্ত আসামি ও ডাকাত আটক, মাদক, সন্ত্রাস, বাল্যবিয়ে ও নারী-শিশু নির্যাতনের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স ঘোষণাসহ চাঞ্চল্যকর ও ক্লুলেস মামলার রহস্য উদঘাটনে রয়েছে তার অসামান্য অবদান।
পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিবের যুগোপযোগী দক্ষ নেতৃত্বে জেলার অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটেছে। কিশোরগ্যাং প্রত্যাশার চেয়েও বেশি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট প্রার্থীদের দ্রুত সেবা প্রদানের লক্ষ্যে এবং সার্টিফিকেট প্রাপ্তি সহজীকরণ ও দীর্ঘসূত্রিতা অবসানের লক্ষ্যে তার কার্যালয়ে হটলাইন প্রতিষ্ঠাপূর্বক আবেদন প্রাপ্তির দ্রুততম সময়ের মধ্যে সার্টিফিকেট প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। অনলাইন জিডি চালু হয়েছে।
তিনি যোগদানের পর চাঁদপুরে সড়ক দুর্ঘটনা পরিহারের লক্ষ্যে ট্রাফিক আইন মেনে চলতে ও অন্যকে উৎসাহিত করতে তিনি সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার লক্ষ্যে তিনি জনপ্রতিনিধি, সুধীজন, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, মিডিয়া প্রতিনিধি, সর্বস্তরের জনগণ এবং সকল অফিসার ফোর্সদের সাথে বিভিন্ন সময় মতবিনিময় করেন। এর মাধ্যমে তিনি জেলা পুলিশের মূল মেসেজ সকলের নিকট পৌঁছে দিতে সক্ষম হন।
পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব জেলা পুলিশকে ঢেলে সাজিয়েছেন। গভীর রাত পর্যন্ত জেগে মাঠ পর্যায়ের সকল বিষয়ে খোঁজ খবর রাখছেন। ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি বুঝতে পেরেছেন, যে মাদক ভয়াবহ রুপ ধারণ করে বর্তমান সমাজের প্রতিটা রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পরেছে। তাই শুধুমাত্র শাস্তি দিয়ে কিছুতেই মাদক সমূলে নির্মূল করা সম্ভব নয়। আর এজন্য তিনি চাঁদপুর জেলাকে মাদকমুক্ত করতে কিছু ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেছেন। তিনি সুশীল সমাজের সহযোগিতায় বিভিন্ন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিয়ে জেলার জনবহুল এলাকা, হাট বাজারগুলোতে মাদকবিরোধী প্রচারণা অব্যাহত রেখেছেন। পাশাপশি তিনি ‘মাদক বিক্রেতা ও মাদক সেবনকারীদের এ পথ থেকে সরে না আসলে কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হবে’ বলে হুঁশিয়ার করে দিচ্ছেন।
চাঁদপুর জেলা পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত এক বছরে মতলব উত্তর উপজেলার আলোচিত হাবিব উল্লাহ হত্যা, কচুয়ায় ব্যাটারী চালিত অটোরিকশা চালক ফারুক হোসেন হত্যা, মতলব দক্ষিণে আলোচিত ফাতেমা বেগম রুপালী হত্যা, মতলব দক্ষিণে ইজি বাইক চালক মহিন মিয়াজী হত্যা, শাহরাস্তিতে আলমগীর হোসেন হত্যা ও হাজীগঞ্জে বৈষম বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আজাদ সরকার হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন।
চাঁদপুর জেলা পুলিশ ২১৯৪টি মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও রহস্য উদঘাটন শেষে ৫ হাজার ৫৩জন আসামিকে গ্রেপ্তার, ২৮টি ধারালো অস্ত্র, ১২টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৮ রাউন্ড গুলি এবং ২১ রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার করেছে। এই সময়ে ৩০ হাজার ৮২৮ পিস ইয়াবা, ২৬৯ কেজি গাঁজা, ১.২৫ লিটার দেশী, ২০১ বোতল বিদেশী মদ এবং ১৪০ বোতল ফেনসিডিল চাঁদপুর জেলা পুলিশ উদ্ধার করে মাদকের সাথে আটককৃতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে।
চাঁদপুর জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, জেলায় অন্তর্গত ৮টি থানায় সাইবার ক্রাইম মনিটরিং সেলের ও এলআইসি সফল প্রচেষ্টায় বিভিন্ন কারণে মোবাইল ফোন হারিয়ে যাওয়ার ঘটনায় মোবাইল ফোন মালিকদের সাধারণ ডায়েরির (জিডি) প্রেক্ষিতে তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় গেল এক বছরে ৩ হাজার ৬৬৪ টি জিডির প্রেক্ষিতে হারানো অথবা চুরি যাওয়া মোট ১ হাজার ১৪১টি মোবাইল ফোন উদ্ধার পূর্বক প্রকৃত মালিকের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে।
চাঁদপুর জেলা পুলিশের সংশ্লিষ্ট তথ্যসূত্রে আরও জানা গেছে, বিভিন্ন মামলায় পলাতক ও পরোয়ানাভূক্ত ৭ হাজার ৭৭১জন আসামিকে গ্রেপ্তারপূর্বক আদালতে সোপর্দ করা হয়েছে। এছাড়া জিডির প্রেক্ষিতে ৬৫৪ জন নিখোঁজ ব্যক্তি (ভিকটিম) উদ্ধার করে তাদের পরিবারের নিকট হস্তান্তর করেছে জেলা পুলিশ। নারী ও শিশু সহায়তা হেল্প ডেক্স থেকে ২৮৩ জন সেবা গ্রহণ করেছে এবং ২০১ জনের অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে।
প্রবাসীদের তাৎক্ষণিক ও সার্বক্ষণিক সেবা নিশ্চিত করতে হট লাইন নাম্বার চালু করা হয়েছে। প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে ১২৮জন সেবা গ্রহণ করেছে এবং ৯৬টি অভিযোগ নিষ্পত্তি করা হয়েছে।
চাঁদপুর জেলা পুলিশ আরো জানায়, গেল এক বছরে পুলিশ সুপারের সাথে ১২১০জন দর্শনার্থী স্ব শরীরে এসে সেবা গ্রহণ করেছেন এরমধ্যে ৮৬০জন পুরুষ এবং ৩৫০জন নারী।
বিগত বছরে চাঁদপুরবাসীর নিরাপত্তা রক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে জেলার ৮টি থানায় নিয়মিত পুলিশ টহল, চেক পোস্ট পরিচালনা, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অভিযান, বিভিন্ন থানায় ওপেন হাউজ ডে, কমিউনিটি পুলিশিং সভা, জেলা পুলিশের ফেসবুক পেইজে সতর্কতামূলক পোষ্ট, বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর ঘটনায় প্রেস ব্রিফিংসহ নিয়মিত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
চাঁদপুরবাসীকে ধন্যবাদ জানিয়ে পুলিশ সুপার মুহম্মদ আব্দুর রকিব পিপিএম বলেন, দেখতে দেখতে দায়িত্বের এক বছর অতিবাহিত হয়েছে। অনেক বড় জেলা হিসেবে এ জেলায় অপরাধ প্রবনতা তুলনামূলক কম, মানুষজনও শিক্ষিত ও সচেতন। তাই সবকিছুই বিশেষ ভাবে পর্যবেক্ষণে রেখে কাজ করে যাচ্ছি। পুলিশের নিয়মিত কাজের পাশাপাশি জেলা পুলিশকে নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। এ কাজে কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। নেই কোনো অসুবিধা। বরং রয়েছে দেশের জন্য, মানুষের জন্য কিছু করতে পারার এক অপরিসীম পরিতৃপ্তি। যতদিন এ জেলায় থাকছি, প্রতি মুহুর্তই আমি আমার দায়িত্ব সর্বোচ্চ নিষ্ঠার সাথে পালন করে যাব।
পুলিশ সুপার বলেন, মাদক আমাদের সমাজকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। বাংলাদেশ পুলিশ মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। মাদকের সাথে কোন আপোষ নেই, মাদককে কোনভাবেই ছাড় ছাড় দেয়া যাবেনা। চাকুরী জীবনে আমি কখনো মাদকের সাথে আপোষ করিনি ভবিষ্যতেও করবোনা। যুব সমাজকে রক্ষায় জেলায় মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান অব্যহত থাকবে।
পুলিশ সুপার আরো বলেন, সমাজের অসহায়, নির্যাতিত মানুষের পুলিশ বাহিনীর নিকট ন্যায় বিচারের প্রত্যাশা অনেক বেশী। চাঁদপুর জেলা পুলিশ মানুষের আশা—ভরসার ধারক ও বাহক হয়ে উঠতে চায়। ইতিমধ্যেই পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ পদ্ধতির স্বচ্ছতায় পুলিশ সুপারের সভাপতিত্বে সম্পূর্ণ মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে কনস্টেবল পদে ১৫৫ জন তরুণ-তরুণীর স্বপ্ন পূরণ হয়।
