আল ইমরান শোভন
চাঁদপুর সদর উপজেলার অর্ধশতাধিক বেকারির মধ্যে অন্তত ২৫টির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন ও সনদ না থাকার অভিযোগ উঠেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোরই বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) লাইসেন্স নেই। ভ্যাট পরিশোধ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন। ফলে এসব বেকারিতে উৎপাদিত খাদ্যপণ্যের মান ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চাঁদপুর সদর উপজেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৫০টি বেকারি রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় অর্ধেক বেকারিই প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বিত যাচাই ও অভিযান না হওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে অনেক প্রতিষ্ঠানই নিয়মের বাইরে থেকে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় থাকা কয়েকটি বেকারিতে বিএসটিআইয়ের অনুমোদন, ভ্যাট নিবন্ধন কিংবা পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রয়োজনীয় সনদ নেই। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন বিভিন্ন ধরনের বিস্কুট, কেক, পাউরুটি, বনরুটি ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য তৈরি করে বাজারজাত করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বেকারিগুলোর উৎপাদন ও খাদ্যপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত তদারকি না থাকায় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে উৎপাদনস্থলের পরিচ্ছন্নতা, কাঁচামালের মান, খাদ্যে ব্যবহৃত উপকরণ, সংরক্ষণব্যবস্থা এবং কর্মীদের স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ১২টি বেকারির প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগের তালিকায় রয়েছে ঘোষেরহাট এলাকার সুনাম বেকারি ও আল্লাহর দান, চানখার দোকান এলাকার সৌদিয়া বেকারি ও আরবি বেকারি, রালদিয়া এলাকার রাহিম ফুড, মুন্সিরহাটের সাঈদ বেকারি, শিলন্দিয়া এলাকার দুটি বেকারি, টেকনিক্যাল এলাকার ইজি কেক বেকারি, কাজির বাজারের রনি বেকারি ও কাজি বেকারি, ছোটসুন্দর বাজার এলাকার আনন্দ বেকারি, মহামায়া এলাকার এস আলম বেকারি এবং আল মদিনা বেকারি।
এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কোনটির কোন সনদ নেই, কোনটির সনদ নবায়ন করা হয়নি কিংবা কোন প্রতিষ্ঠান কী ধরনের অনুমোদন ছাড়া চলছে- তা সরেজমিন যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সদর উপজেলায় নিয়ম মেনে পরিচালিত বেকারিগুলোর ক্ষেত্রেও অভিযোগ রয়েছে, অনেক প্রতিষ্ঠান খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত স্বাস্থ্যবিধি ও নিরাপত্তা মান যথাযথভাবে অনুসরণ করছে না। বিশেষ করে উৎপাদনস্থলের পরিবেশ, শ্রমিকদের সুরক্ষা, খাদ্যপণ্য সংরক্ষণ এবং প্যাকেটজাত পণ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী ও ভোক্তা বলেন, বেকারির তৈরি খাবার প্রতিদিনই শিশু থেকে শুরু করে সব বয়সী মানুষ খাচ্ছেন। ফলে এসব প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ও অনুমোদনের বিষয়টি শুধু ব্যবসায়িক বৈধতার নয়, জনস্বাস্থ্যের সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। নিয়মিত তদারকি ও পরীক্ষার মাধ্যমে মান নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি বেকারি পরিচালনার ক্ষেত্রে শুধু ব্যবসায়িক অনুমতিই যথেষ্ট নয়; খাদ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন সরকারি সংস্থার বিধিবিধানও মানতে হয়। বিএসটিআইয়ের অনুমোদন, ভ্যাটসংক্রান্ত নিবন্ধন এবং পরিবেশগত ছাড়পত্রের পাশাপাশি উৎপাদনস্থলের স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু সদর উপজেলার যেসব বেকারির বিরুদ্ধে কাগজপত্র না থাকার অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে উৎপাদন ও বাজারজাত কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি নিয়েও।
স্থানীয় ভোক্তারা বলছেন, অভিযোগের ভিত্তিতে শুধু জরিমানা করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। যেসব প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেই, তাদের কাগজপত্র যাচাই করতে হবে। নিয়মের মধ্যে আনার সুযোগ থাকলে তা দিতে হবে; আর গুরুতর অনিয়ম পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ বিষয়ে বিএসটিআই, পরিবেশ অধিদপ্তর, ভ্যাট বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত অভিযান চালিয়ে সদর উপজেলার সব বেকারির লাইসেন্স, অনুমোদন ও উৎপাদনব্যবস্থা যাচাই করার দাবি উঠেছে।
