Site icon Chandpur Probaha | চাঁদপুর প্রবাহ

বাবলু ভাই, আপনি কি সত্যিই চলে গেলেন?

।। আল ইমরান শোভন।।

কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাদের চলে যাওয়াকে মেনে নেওয়া যায় না। কারণ, তারা কেবল একজন ব্যক্তি নন; তারা হয়ে ওঠেন একটি সময়, একটি অনুভূতি, একটি ভালোবাসা, একটি সম্পর্কের নাম। মাহবুব আনোয়ার বাবলু ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। তার মৃত্যুর সংবাদ যেন হঠাৎ করেই থমকে দিয়েছে পরিচিত একটি পৃথিবী। বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়- যে মানুষটির সঙ্গে গতকালও দেখা হওয়ার আশা ছিল, যার হাসিমাখা মুখ আর মিষ্টি কণ্ঠস্বর এতটাই পরিচিত ছিল, তিনি আজ আর নেই।

আজও চোখ বন্ধ করলে ভেসে ওঠে একটি পরিচিত দৃশ্য। কোথাও দেখা হলো। আমি সালাম দিলাম। তিনি সেই চিরচেনা মিষ্টি হাসিতে জবাব দিলেন। তারপর বললেন, “শোভন! কেমন আছো?” কথাটি খুব সাধারণ। কিন্তু সেই সম্বোধনের ভেতরে ছিল যে আন্তরিকতা, যে স্নেহ, যে আপন করে নেওয়ার ক্ষমতা- তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। মানুষের জীবনে এমন কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলো তখন খুব সাধারণ মনে হলেও পরে বুঝতে পারি, সেগুলোই ছিল সবচেয়ে মূল্যবান। বাবলু ভাইয়ের সেই ডাক ছিল তেমনই এক অমূল্য সম্পদ।

মাহবুব আনোয়ার বাবলুকে অনেকেই চিনতেন একজন রম্য লেখক হিসেবে। তার লেখার ভাষা ছিল সহজ, প্রাণবন্ত এবং মানুষের জীবনের খুব কাছাকাছি। তিনি হাসাতে জানতেন, কিন্তু সেই হাসির আড়ালেও থাকত সমাজকে দেখার এক নির্মোহ দৃষ্টি। পাঠক তার লেখা পড়ে শুধু আনন্দই পেতেন না, নিজেদেরও খুঁজে পেতেন। রম্যরসের আড়ালে তিনি জীবনের গভীর সত্যগুলোকে তুলে ধরতেন অত্যন্ত সাবলীলভাবে। তাই তিনি শুধু একজন লেখক ছিলেন না; তিনি ছিলেন মানুষের মন বোঝার এক নিপুণ শিল্পী।

রাজনীতির মাঠেও তার পরিচয় ছিল আলাদা। আজকের সময়ে যখন রাজনীতি নিয়ে মানুষের নানা প্রশ্ন, নানা সংশয়, তখন বাবলু ভাইয়ের মতো ভদ্র, মার্জিত এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির একজন মানুষ সত্যিই ব্যতিক্রম ছিলেন। তিনি কখনো উচ্চস্বরে নিজের অবস্থান জানান দেওয়ার মানুষ ছিলেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন আচরণই মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয়। মতের অমিল থাকতেই পারে, কিন্তু সম্পর্কের জায়গাটি যেন কখনো নষ্ট না হয়- এই মূল্যবোধ তিনি নিজের জীবন দিয়ে ধারণ করেছিলেন।

গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ছিল হৃদ্যতাপূর্ণ। সংবাদ, প্রেস বিজ্ঞপ্তি কিংবা কোনো অনুষ্ঠানের সূত্রে বহুবার তার সঙ্গে কথা হয়েছে। প্রতিবারই মনে হয়েছে, তিনি যেন কোনো আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের মানুষ নন; বরং পরিবারের বড় একজন সদস্য। সাংবাদিকদের তিনি সম্মান করতেন, সময় দিতেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য দিতে কখনো বিরক্তি প্রকাশ করতেন না। একজন সংবাদকর্মী হিসেবে এই আন্তরিকতা সবসময়ই আমাকে মুগ্ধ করেছে।

মানুষের প্রকৃত পরিচয় জানা যায় তার ব্যবহার দিয়ে। বাবলু ভাইয়ের ব্যবহার ছিল তার সবচেয়ে বড় পরিচয়। তিনি কখনো কারও সঙ্গে রূঢ় আচরণ করেছেন- এমন স্মৃতি অনেকের কাছেই নেই। বয়সে ছোটদের তিনি স্নেহ করতেন, বড়দের সম্মান দিতেন, আর সমবয়সীদের সঙ্গে মিশতেন বন্ধুর মতো। তিনি জানতেন, মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ার জন্য ক্ষমতা নয়, প্রয়োজন বিনয়।

প্রকৃতির কিছু দৃশ্য আছে, যেগুলো শব্দহীন হয়েও অনেক কথা বলে। ভোরের শিশির, নদীর শান্ত জল, কিংবা গাছের পাতা নিঃশব্দে ঝরে পড়া- এসবের মধ্যে এক ধরনের গভীর সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে। বাবলু ভাইয়ের ব্যক্তিত্বও ছিল ঠিক তেমনই। তিনি ছিলেন শান্ত, সংযত এবং স্নিগ্ধ। তার উপস্থিতি কখনো কোলাহল সৃষ্টি করত না, কিন্তু তার অনুপস্থিতি আজ গভীর শূন্যতা হয়ে অনুভূত হচ্ছে।

জীবনের ব্যস্ততার ভিড়ে আমরা অনেক সময় প্রিয় মানুষদের যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে উঠতে পারি না। মনে করি, আবার তো দেখা হবে। আবার কথা হবে। আবার সেই পরিচিত হাসি দেখা যাবে। কিন্তু জীবন সবসময় সেই সুযোগ দেয় না। বাবলু ভাইয়ের চলে যাওয়ার পর বারবার মনে হচ্ছে—আরেকবার যদি দেখা হতো! আরেকবার যদি সেই পরিচিত কণ্ঠে শুনতে পেতাম, “শোভন! কেমন আছো?” হয়তো আজ সেই ছোট্ট প্রশ্নটিই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি মনে হতো।

একজন মানুষ তার পদ-পদবি দিয়ে বড় হন না; বড় হন তার কর্ম, চরিত্র এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা দিয়ে। মাহবুব আনোয়ার বাবলু সেই অর্থেই ছিলেন একজন বড় মানুষ। তিনি মানুষের সম্মান অর্জন করেছিলেন কোনো প্রচারণার মাধ্যমে নয়, বরং নিজের আচরণ, সততা এবং আন্তরিকতার মাধ্যমে। তাই তার মৃত্যুতে শুধু একটি পরিবার নয়, শোকাহত হয়েছেন অসংখ্য মানুষ- যারা তাকে কাছ থেকে দেখেছেন, কথা বলেছেন কিংবা শুধু তার লেখা পড়ে তাকে ভালোবেসেছেন।

আজ আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন ভদ্রতা, সৌজন্য, মানবিকতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ দিন দিন যেন কমে যাচ্ছে। এই সময়ে বাবলু ভাইয়ের জীবন আমাদের জন্য একটি শিক্ষা। তিনি দেখিয়ে গেছেন, বিনয়ী হওয়া দুর্বলতা নয়; বরং সেটিই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি। মানুষকে সম্মান দিলে সম্মান ফিরে আসে- এই সহজ সত্যটি তিনি নিজের জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছেন।

তার মৃত্যুর পর অসংখ্য মানুষের স্মৃতিচারণে একটি বিষয় বারবার উঠে এসেছে- তিনি ছিলেন সহজ মানুষ। এই “সহজ” হয়ে ওঠাই সবচেয়ে কঠিন। কারণ পদ, পরিচিতি কিংবা জনপ্রিয়তা অনেক সময় মানুষকে বদলে দেয়। কিন্তু বাবলু ভাই নিজেকে বদলাতে দেননি। তিনি ছিলেন মাটির মানুষ। মানুষের ভালোবাসাই ছিল তার সবচেয়ে বড় সম্পদ।

আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু সত্যিই কি একজন মানুষ চলে গেলে সব শেষ হয়ে যায়? না। যারা ভালোবাসা দিয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন, তারা কখনো হারিয়ে যান না। তারা থেকে যান স্মৃতিতে, গল্পে, আচরণে, অনুপ্রেরণায়। বাবলু ভাইও সেভাবেই বেঁচে থাকবেন। তার লেখা পড়লে মানুষ তাকে মনে করবে, তার সৌজন্যের কথা স্মরণ করবে, তার হাসির কথা বলবে, তার মানবিকতার গল্প নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেবে।

বারবার মনে হয়, আমরা কি শুধু একজন মানুষকে হারিয়েছি? নাকি হারিয়েছি এমন একটি ব্যক্তিত্বকে, যার মতো মানুষ দিন দিন বিরল হয়ে যাচ্ছে? এই প্রশ্নের উত্তর হয়তো সময় দেবে। তবে একটি সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই-মাহবুব আনোয়ার বাবলুর শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।

আল্লাহ তাঁর জীবনের সকল ভালো কাজ কবুল করুন। তাঁর কবরকে নূরের বাগান বানিয়ে দিন। তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। আর আমাদের এমন মানুষদের স্মৃতি থেকে শিক্ষা নেওয়ার, তাদের মানবিকতা ধারণ করার এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা নিয়ে বেঁচে থাকার তাওফিক দিন।

শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা আর অফুরন্ত ভালোবাসায়- মাহবুব আনোয়ার বাবলু, আপনি হয়তো চোখের আড়ালে চলে গেছেন, কিন্তু হৃদয়ের ভেতর আপনার স্থান চিরকাল অমলিন থাকবে।

 

লেখক : আল ইমরান শোভন, প্রধান বার্তা সম্পাদক- দৈনিক চাঁদপুর প্রবাহ; সাবেক সাধারণ সম্পাদক- চাঁদপুর প্রেস ক্লাব; সাবেক সভাপতি- চাঁদপুর টেলিভিশন সাংবাদিক ফোরাম।

Exit mobile version