Site icon Chandpur Probaha | চাঁদপুর প্রবাহ

যাকাতের অর্থে স্বাবলম্বীর সর্বোত্তম মডেল ‘ড্যাফোডিল ফাউন্ডেশন’

“জীবিকা, শিক্ষাবৃত্তি ও ডিআইএসএস প্রকল্পের মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারে আশার আলো : ১৬ বছরে প্রতিষ্ঠিত শতাধিক তরুণ”

বিশেষ প্রতিবেদক :
যাকাতের অর্থে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের স্বাবলম্বী করার ক্ষেত্রে ড্যাফোডিল ফাউন্ডেশন একটি অনন্য ও অনুকরণীয় মডেল স্থাপন করেছে। অনেকেই এটিকে বাংলাদেশে এ যাবৎ কালের ‘সর্বোত্তম মডেল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এই ফাউন্ডেশন পরিচালিত জীবিকা, শিক্ষাবৃত্তি এবং ডেফোডিল ইন্সটিটিউট অব স্যোসাল সাইন্স (ডিআইএসএস) প্রকল্পের মাধ্যমে অনেক হতদরিদ্র ও অসহায় পরিবার নতুন আশার আলো খুঁজে পেয়েছে। এসব প্রকল্পে অর্থায়নের মূল ভিত্তি ড্যাফোডিল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান, চাঁদপুরের কৃতি সন্তান ড. মো. সবুর খানের ব্যক্তিগত যাকাত।

ড্যাফোডিল ফাউন্ডেশনের ‘জীবিকা প্রকল্প’ মূলত যাকাতের অর্থে পরিচালিত। এই প্রকল্পের আওতায় যাকাতের অর্থের সঠিক ও কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে ইতিমধ্যে শতাধিক পরিবারকে স্বাবলম্বী করে তোলা হয়েছে। ড্যাফোডিল ফাউন্ডেশনের এই মডেলের প্রধান বৈশিষ্ট্য ও মূল দর্শন হলো – ‌’যাকাত দান নয়, এটি অধিকার’। এই বিশ্বাসের ভিত্তিতেই তারা যাকাত ব্যবস্থাপনাকে পরিচালনা করে।

স্বাবলম্বীকরণ পদ্ধতি : যাকাতের অর্থ শুধু নগদ বা খাবার হিসেবে না দিয়ে, সুবিধাভোগীদের দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা এবং সুদমুক্ত অর্থায়নের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে স্বাবলম্বী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতা : এই প্রকল্পের অধীনে সেলাই মেশিন, ছাগল পালন, গাভী, ভ্যান, নৌকা, ক্ষুদ্র ব্যবসা বা টি স্টলের মতো উৎপাদনশীল সম্পদ দেওয়া হয়। ফলে সুবিধাভোগীরা দীর্ঘমেয়াদী আয়ের পথ পায়।

বিস্তার : চাঁদপুরে শতাধিক পরিবার এই উদ্যোগের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়েছে এবং তাদের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।মাস্তুল ফাউন্ডেশন এর মতো অন্যান্য প্রতিষ্ঠানও একইভাবে যাকাতের অর্থে টেকসই স্বাবলম্বীকরণ প্রকল্প (যেমন: সেলাই মেশিন, রিকশা প্রদান) পরিচালনা করছে, যা দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলে। সামগ্রিকভাবে, ড্যাফোডিল ফাউন্ডেশনের এই উদ্যোগ যাকাতকে দারিদ্র্য বিমোচনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

এই ফাউন্ডেশনের আরেকটি সফল প্রকল্প ‌‌’শিক্ষাবৃত্তি’। এর মাধ্যমে দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসায় অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়ে থাকে। যাতে শিক্ষার্থী নির্বিঘ্নে তার পড়াশোনা ও উচ্চশিক্ষা চালিয়ে যেতে পারে। এই প্রকল্পের আওতায় সুবিধাভোগী দরিদ্র পরিবারের অনেক সন্তান এখন কর্মক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত। বিসিএস ক্যাডার, বিচারক, সরকারি-বেসরকারি চাকুরিজীবী, উদ্যোক্তাসহ নানা ক্ষেত্রে সফলতা অর্জন করেছেন অনেকে। কর্মজীবনে প্রবেশের অপেক্ষায় আছেন অনেকে।

দারিদ্র্যের দুষ্টচক্রে এদেশের অনেক দরিদ্র পরিবার আরো দরিদ্র হচ্ছে। তাদের সন্তানদের পড়াশোনা থমকে যাচ্ছে। সেই বৃত্ত ভাঙার এক কার্যকর দিশারি হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘ড্যাফোডিল ফাউন্ডেশন’। ১৬ বছর ধরে ড্যাফোডিল ফাউন্ডেশন যে নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে চলেছে, তা এখন কেবল একটি দাতব্য উদ্যোগ নয় বরং জাতীয় পর্যায়ে অনুসরণের দাবি রাখে এমন এক সুচিন্তিত, সুশৃঙ্খল, সময়োপযোগী ও কার্যকর অর্থনৈতিক দর্শন।

বিগত ১৬ বছরে এই মডেলের আওতায় ২৭৯ জন শিক্ষার্থীকে নিবিড় সহায়তা দেওয়া হয়েছে। বিস্ময়কর তথ্য হলো, তাঁদের মধ্যে ১০২জন বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এমনকি সফল উদ্যোক্তা হিসেবে দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি অবদান রাখছেন। অর্থাৎ দেড় দশক আগে যে মেধার ওপর বিনিয়োগ করা হয়েছিল, তা আজ বহুগুণ হয়ে জাতীয় আয়ে যুক্ত হচ্ছে।

দারিদ্র্য যখন হার মানল মেধার কাছে : চরাঞ্চলের এক হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান রফিকুল ইসলাম (ছদ্মনাম)। মেধা ছিল প্রখর, কিন্তু মাধ্যমিকের পর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। বাবা সামান্য দিনমজুর, যাঁর আয়ে দুবেলা অন্নসংস্থানই যেখানে কঠিন, সেখানে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখা ছিল বিলাসিতা।

রফিকুলের এই অন্ধকার সময়ে আশার আলো হয়ে আসে ‘ড্যাফোডিল ফাউন্ডেশন’। মেধায় বিনিয়োগের মডেলের আওতায় তাঁকে কেবল টিউশন ফি নয়, বরং তাঁর আবাসন এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের সব সুযোগ দেওয়া হয়। ড্যাফোডিল মডেলে রফিকুল শিখলেন শুধু বইয়ের পড়া নয়, বরং আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মেলাতে দরকারি ‘সফট স্কিল’ এবং ‘প্রবলেম সলভিং’।

আজকের রফিকুল দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় সফটওয়্যার কোম্পানিতে সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার। রফিকুল বলেন, ‘ড্যাফোডিল যদি আমাকে কেবল কিছু টাকা “দান” করত, তবে হয়তো আমি বড়জোর একটি ডিগ্রি পেতাম। কিন্তু তারা আমার মেধার ওপর “বিনিয়োগ” করেছে এবং আমাকে একজন দক্ষ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছে।’

ডিগ্রি নয়, লক্ষ্য যেখানে কর্মসংস্থান : বাংলাদেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার বড় সংকট হলো ‘ডিগ্রি আছে কিন্তু দক্ষতা নেই’। ড্যাফোডিল মডেল এখানে এক ব্যতিক্রমী সেতুবন্ধ তৈরি করেছে। গত ১৬ বছরে ১৬টি ব্যাচে মোট ২৭৯জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে শিক্ষাবৃত্তি প্রদান করা হয়েছে। বর্তমানে ৯০জন শিক্ষার্থী এই সুবিধা নিচ্ছেন এবং ইতিমধ্যে ১৮৯জন তাঁদের শিক্ষাজীবন সফলভাবে শেষ করেছেন।

শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক মুক্তি—এই চতুর্মুখী চক্রটি নিশ্চিত করার মাধ্যমেই একজন অসচ্ছল শিক্ষার্থীকে দেশের সম্পদে রূপান্তর করা হচ্ছে।

সিএসআর (CSR)-এর নতুন সংজ্ঞা : সাধারণত অনেক প্রতিষ্ঠান লোকদেখানো করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) পালন করে থাকে। কিন্তু ড্যাফোডিল গ্রুপের ‘One-Third Social Commitment’ এক বিরল দৃষ্টান্ত। তাদের আয়ের একটি বড় অংশ সরাসরি সমাজ সংস্কারে ব্যয় হয়। বিশেষ করে ‘জীবিকা’ (Jeebika) প্রকল্পের মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ‘DISS’-এর মাধ্যমে গবেষণা ও সামাজিক পরিবর্তনের যে কাজ তারা করছে, তা করপোরেট জগতে এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেছে।

ফাউন্ডেশনের মূল কার্যক্রম :
· শিক্ষা সম্প্রসারণ : দরিদ্র ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি এবং বিনা মূল্যে শিক্ষার সুযোগ।
· ইসলামিক মাইক্রোফাইন্যান্স : ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সুদমুক্ত ঋণসুবিধা।
· স্বাস্থ্যসেবা : সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জন্য কমিউনিটি ভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা।
· দক্ষতা উন্নয়ন : আইটি প্রশিক্ষণ ও ভোকেশনাল ট্রেনিংয়ের মাধ্যমে বেকারত্ব দূরীকরণ।

প্রযুক্তি ও বিকাশমান মানসিকতা : ড্যাফোডিল ফাউন্ডেশনের এ কার্যক্রমটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল অটোমেশন সিস্টেমের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। অনলাইন আবেদন থেকে শুরু করে সাক্ষাৎকার এবং ডেটা ব্যবস্থাপনা—সবই স্বচ্ছতার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়। মেধাবী শিক্ষার্থীদের কেবল আর্থিক সহায়তা দিলেই চলে না, প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা। ড্যাফোডিল ফাউন্ডেশন শিক্ষার্থীদের মধ্যে ‘Growth Mindset’ বা বিকাশমান মানসিকতা তৈরি করছে। এখানে শিক্ষার্থীরা শেখে প্রতিকূলতাকে জয় করতে এবং শুধু চাকরি না খুঁজে উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখতে।

পেছনের গল্প : ২০১০ সাল। বাংলাদেশ তখনও মেধা ও দারিদ্র্যের অসম লড়াইয়ে হারিয়ে ফেলছিল অনেক সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ। ঠিক তখনই ড্যাফোডিল গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা ও সমাজচিন্তক মোঃ সবুর খান হাতে নেন এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ‘ড্যাফোডিল স্কলারশিপ’। লক্ষ্য ছিল স্পষ্ট ‘অর্থের কাছে যেন মেধা মাথা না নত করে।’ এই স্কলারশিপ কেবল একটি আর্থিক অনুদান নয়, এটি একটি জীবন বদলে দেওয়ার প্রকল্প। একটি পরিবারকে ঘুরে দাঁড়ানোর হাতিয়ার। একজন তরুণকে নিজেকে বিশ্বমঞ্চে প্রমাণ করার সুযোগ।

তিনি কেবল দাতা নন, পথপ্রদর্শকও : মোঃ সবুর খান শুধু যাকাতের টাকা দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেননি। বরং এই স্কলারদের জন্য নিজ হাতে গড়ে তুলেছেন আইকিউ টেস্ট, ভাইভা বোর্ড এবং নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থাপনা— যেন একজন শিক্ষার্থী কখনো পথভ্রষ্ট না হয়। তিনি চান, এই মেধাবীরা শুধু শিক্ষিত নয়, নৈতিকতা, মানবিকতা, প্রযুক্তি জ্ঞান ও দেশপ্রেমে গড়া এক নতুন প্রজন্ম হয়ে উঠুক।

যাঁর চোখে স্বপ্ন শুধু নিজের নয়, সবার- সেই সবুর খান ড্যাফোডিল স্কলারশিপ প্রকল্পের মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন একটি স্বপ্নবুননের প্ল্যাটফর্ম। যেখানে আছে- বাল্যবিবাহ থেকে উদ্ধার পাওয়া মেয়ের আশ্বাস, মাদ্রাসা ছাত্রের বিশ্ববিদ্যালয় যাত্রা, গ্রাম থেকে উঠে আসা ছেলেটির বিদেশযাত্রা, মেধার স্বীকৃতি, মর্যাদার প্রতিফলন।

একজন সবুর খান, এখন আলোর ফেরিওয়ালা : সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে নিজ হাতে গড়া এই স্কলারশিপ প্রকল্পটি আজ দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সফল একজন উদ্যোক্তা, শিক্ষানুরাগী, এবং মানবিক হৃদয়ের মানুষ হিসেবে মোঃ সবুর খান বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শ্রদ্ধা ও অনুপ্রেরণার প্রতীক।

ড্যাফোডিল গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ড. মো. সবুর খান বলেন, ‘দান নয়, মেধায় বিনিয়োগ’ এটাই হোক বাংলাদেশের উন্নয়নের নতুন দর্শন। ড্যাফোডিল যে পথ দেখিয়েছে, সেই পথে হাঁটলে আগামীর বাংলাদেশ হবে মেধা ও দক্ষতায় সমৃদ্ধ এক অনন্য জনপদ। আমাদের লক্ষ্য কেবল আর্থিক সহায়তা দেওয়া নয়, বরং একটি দক্ষ ও স্বনির্ভর প্রজন্ম গড়ে তোলা।’

Exit mobile version