আল ইমরান শোভন
গ্রামের শিক্ষাবঞ্চিত মানুষের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ১৯৫৫ সালে যাত্রা শুরু হয়েছিল দাসাদী ডিএসআইএস কামিল মাদ্রাসার। তখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল মাত্র ২৫০। সাত দশকের বেশি সময়ের পথচলায় সেই ছোট্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আজ পরিণত হয়েছে এলাকার অন্যতম সুনামধন্য বিদ্যাপীঠে। বর্তমানে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী এখানে দাখিল, আলিম, ফাজিল ও কামিল স্তরে পড়াশোনা করছে।
শুধু শিক্ষার্থীর সংখ্যাই বাড়েনি, বেড়েছে প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিকতা, মানবিক মূল্যবোধ ও আধুনিক জ্ঞানচর্চার সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলছে দক্ষ ও আদর্শবান নতুন প্রজন্ম।
এই প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন এলাকার শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক মরহুম মৌলভী ফজলুল হক ভূঁইয়া। তাঁর বিশ্বাস ছিল, শিক্ষা ছাড়া কোনো সমাজের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। সেই বিশ্বাস থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মাদ্রাসাটি। দীর্ঘ সময় ধরে তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করে যাচ্ছেন প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও পরিচালনা পর্ষদ।
বর্তমানে মাদ্রাসায় ৩৫ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং ২ জন গেস্ট টিচার দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের নিবেদিত প্রচেষ্টায় পাঠদান কার্যক্রমের পাশাপাশি সহশিক্ষা, নৈতিক শিক্ষা এবং শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিত্ব বিকাশেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিদিন শত শত শিক্ষার্থীর পদচারণায় মুখর থাকে মাদ্রাসা প্রাঙ্গণ। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞানসহ প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব দিয়ে পড়ানো হয়। ফলে এখানকার শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজেদের যোগ্যতার পরিচয় দিচ্ছেন।
দাসাদী ডিএসআইএস কামিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এম ওমর ফারুকী বলেন, শিক্ষা শুধু সনদ অর্জনের বিষয় নয়, এটি মানুষ গড়ার সবচেয়ে বড় মাধ্যম। আমাদের প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় জ্ঞানের পাশাপাশি নৈতিকতা, শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম ও মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তোলার চেষ্টা করা হয়। ১৯৫৫ সালে যে প্রতিষ্ঠানটি ২৫০ শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল, আজ সেখানে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। এটি আমাদের জন্য গর্বের, তবে একই সঙ্গে দায়িত্বও অনেক বেড়েছে। ভবিষ্যতে আরও আধুনিক ও যুগোপযোগী শিক্ষা নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
উপাধ্যক্ষ মো. আমজাদ হোসাইন বলেন, দীর্ঘ ৭০ বছরের বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি এলাকার মানুষের আস্থা অর্জন করেছে। এই আস্থা ধরে রাখাই আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় আমরা একটি সুন্দর শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করেছি। আমরা চাই, এখানকার শিক্ষার্থীরা শুধু ভালো ফল করবে না, তারা যেন সৎ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে দেশ ও সমাজের উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
স্থানীয় শিক্ষানুরাগীরা বলেন, দাসাদী ডিএসআইএস কামিল মাদ্রাসা শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি সামাজিক আন্দোলনেরও নাম। এখান থেকে শিক্ষা নিয়ে অসংখ্য শিক্ষার্থী দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন।
একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য শুধু ভবন কিংবা অবকাঠামো দিয়ে নয়, তার শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও সমাজে অবদানের মাধ্যমে মূল্যায়িত হয়। সেই বিবেচনায় দাসাদী ডিএসআইএস কামিল মাদ্রাসা আজ গ্রামীণ শিক্ষার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। প্রতিষ্ঠাতার স্বপ্ন, শিক্ষকদের নিষ্ঠা এবং শিক্ষার্থীদের নিরলস প্রচেষ্টায় সাত দশকের ঐতিহ্যকে ধারণ করে প্রতিষ্ঠানটি এগিয়ে চলেছে ভবিষ্যতের আরও সমৃদ্ধ গন্তব্যের দিকে।
