রাসায়নিক সারে উর্বরতা কমছে চাঁদপুরের মাটির 

  • তালহা জুবায়ের

চাঁদপুরের বিভিন্ন এলাকার মাটিতে কমছে পিএইচের মান ও জৈব পদার্থের পরিমাণ। দীর্ঘদিন ধরে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারের কারণে মাটির গুণাগুণের এমন পরিবর্তন হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা কমার পাশাপাশি ফসল উৎপাদনে কৃষকদের বেশি সার ব্যবহার করতে হচ্ছে। ফলে বাড়ছে উৎপাদন খরচ, কমছে কৃষকের লাভ।

চাঁদপুর জেলা মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন সময়ের গবেষণার তথ্যেও মাটির গুণাগুণের পরিবর্তনের চিত্র পাওয়া গেছে। জেলার পাঁচটি উপজেলার মাটির নমুনা বিশ্লেষণে দেখা যায়, চাঁদপুর সদর, ফরিদগঞ্জ, হাইমচর ও মতলব দক্ষিণে পিএইচের মান কমেছে। এর মধ্যে মতলব দক্ষিণে ১৯৯২ সালের ৫ দশমিক ৬৮ থেকে ২০২৪ সালে পিএইচের মান কমে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক শূন্যতে। চাঁদপুর সদরে ১৯৯৩ সালের ৫ দশমিক ৯৯ থেকে ২০১৬ সালে তা কমে হয়েছে ৫ দশমিক ৬০। হাইমচরে ২০০০ সালের ৭ দশমিক ৩৪ থেকে ২০২২ সালে পিএইচের মান হয়েছে ৬ দশমিক ৯৮।

জৈব পদার্থের ক্ষেত্রেও কয়েকটি উপজেলায় অবনতি হয়েছে। চাঁদপুর সদরে ১৯৯৩ সালে মাটিতে জৈব পদার্থ ছিল ২ দশমিক ৩৬ শতাংশ, যা ২০১৬ সালে কমে হয়েছে ১ দশমিক ৮১ শতাংশ। হাইমচরে ২০০০ সালের ১ দশমিক ৯৯ শতাংশ থেকে ২০২২ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ২৭ শতাংশ। তবে ফরিদগঞ্জ ও মতলব দক্ষিণে জৈব পদার্থের পরিমাণ আগের তুলনায় বেড়েছে। শাহরাস্তিতে পিএইচ ও জৈব পদার্থ—দুটিই বেড়েছে।

চাঁদপুর জেলা মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা রাহাতুল ইসলাম বলেন, জেলার অধিকাংশ উপজেলায় মাটির পিএইচ মান কমে গেছে। বিশেষ করে মতলব দক্ষিণ উপজেলায় নৌ মান মারাত্মক ভাবে কমেছে। এর ফলে কৃষকরা মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কৃষক জমিতে অনেক বেশি সার প্রয়োগ করছে। কিন্তু ভালো ফলাফল পাচ্ছে না। ফলে চাষাবাদ করে লোকসানে পড়ছে কৃষক। মাটির গুণাগুণের পরিবর্তন ও পুষ্টি পরিস্থিতি জানতে আরও নিবিড় গবেষণা প্রয়োজন বলে জানান তিনি।

কৃষকেরাও বলছেন, আগের তুলনায় জমিতে বেশি সার ব্যবহার করেও কাঙ্ক্ষিত ফলন পাওয়া কঠিন হচ্ছে। চাঁদপুর সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের কৃষক আ. হান্নান প্রায় ৪০ বছর ধরে চাষাবাদ করছেন। তিনি বলেন ২০ বছর আগে যে পরিমাণ সার দিয়ে জমিতে চাষ করতাম, এখন তার প্রায় দ্বিগুণ সার ব্যবহার করতে হচ্ছে। তবুও আগের মত ফলন পাওয়া যায় না। দাম দিয়ে সার কিনে ফসল বিক্রি করে লাভ কম হয়।

জেলা কৃষি বিভাগের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, চাঁদপুরে আবাদি জমির পরিমাণ প্রায় ৯৪ হাজার হেক্টর। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জেলায় ভর্তুকি মূল্যে প্রায় ৪৭ হাজার ২২৫ মেট্রিক টন বিভিন্ন ধরনের সার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ইউরিয়া ২৪ হাজার ১৩৩, টিএসপি ৫ হাজার ৮৬৪, ডিএপি ৯ হাজার ৭৩১ এবং এমওপি ৭ হাজার ৪৯৭ মেট্রিক টন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মোহাম্মদ আবু তাহের বলেন, বেশি সার ব্যবহার করলেই ফলন বাড়বে—এমন ধারণা ঠিক নয়। বরং মাটির ধরন ও ফসলের প্রয়োজন অনুযায়ী সুষম সার ব্যবহার করতে হবে। একই সঙ্গে মাটির গুণাগুণ ধরে রাখতে জৈব সারের ব্যবহার বাড়াতে হবে। আমরা বিভিন্ন সভা সেমিনারে কৃষকদের কে জৈব সার ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে কাজ করছি।

চাঁদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ নুর আলম দীন বলেন, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ব্যবহারে খাদ্যে পুষ্টিগুণ থাকে না। যার ফলে খাবার খেলেও পর্যাপ্ত পুষ্টি পাওয়ার বদলে কিছু রাসায়নিক কেমিক্যাল দেহে প্রবেশ করে। এতে করে বিভিন্ন ধরনের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। এ কারণে মানুষ ক্যান্সার, স্ট্রোক, হার্ট অ্যাটাকের মত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। সুস্থ থাকতে হলে জৈব সার ব্যবহার করে ফসল উৎপাদন করতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাটির উর্বরতা ধরে রাখতে এখনই রাসায়নিক সারের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কমিয়ে সুষম সার ব্যবহারের পাশাপাশি জৈব সারের ব্যবহার বাড়াতে হবে। তা না হলে দীর্ঘমেয়াদে মাটির গুণাগুণের পাশাপাশি কৃষি উৎপাদনও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে

পারে।

 

 

শেয়ার করুন