- মমিনুল ইসলাম
চাঁদপুরের মতলব উত্তর ও মুন্সিগঞ্জের গজারিয়াকে সংযুক্ত করতে মেঘনা নদীর ওপর দেশের প্রথম প্রকৃত ক্যাবল স্টেইড (ঝুলন্ত) সেতু নির্মাণের স্বপ্ন এখন বাস্তবায়নের পথে। দীর্ঘ প্রায় ২৭ বছর ধরে এ সেতুর দাবিতে আন্দোলন, সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির, জাতীয় সংসদে দাবি উত্থাপন, বিদেশি অর্থায়ন নিশ্চিতের প্রচেষ্টা এবং প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনে ধারাবাহিক ভূমিকা রেখে আসছেন চাঁদপুর-২ (মতলব উত্তর-দক্ষিণ) আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব ড. মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন।
সম্প্রতি মতলব উত্তর উপজেলার শরীফ উল্লাহ হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় ও নবগঠিত এডহক কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সেতু মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ভিখারউদ্দৌলা চৌধুরী ভুলু বলেছেন, মতলব-গজারিয়া সেতুর জমি অধিগ্রহণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফাইল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আটকে গেলে ড. জালাল উদ্দিন দ্রুত উদ্যোগ নেন। তাঁর তৎপরতায় ফাইলটি দ্রুত নিষ্পত্তি হয় এবং পরবর্তী সময়ে রেকর্ড সময়ে জমি অধিগ্রহণের কার্যক্রম সম্পন্ন করা সম্ভব হয়।
যুগ্ম সচিব জানান, ড. জালাল উদ্দিন তাকে বারবার অনুরোধ করেছিলেন যাতে সেতুর কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হয়। এমপির সেই আগ্রহ ও গতিশীলতায় তিনি নিজেও অনুপ্রাণিত হন। এরপর প্রকল্প পরিচালক, প্রকৌশলী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মাঠে নামিয়ে দ্রুত কাজ শুরু করা হয়। জেলা প্রশাসনও অল্প সময়ের মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণের মূল্য নির্ধারণ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সম্পন্ন করে। ইতোমধ্যে জমি অধিগ্রহণ বাবদ ১২ কোটি টাকা অনুমোদন হয়েছে এবং আইবাস (iBAS)-এ অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থনৈতিক সহযোগিতা তহবিল (EDCF)-এর অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পে শুরুতে ৬৭ শতাংশ নির্মাণসামগ্রী দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আনার শর্ত ছিল। তবে বাংলাদেশ সরকারের আলোচনার মাধ্যমে তা কমিয়ে ২৩ শতাংশে নামানো হয়েছে। ফলে রড, সিমেন্ট, বালুসহ অধিকাংশ নির্মাণসামগ্রী এবং শ্রমশক্তি দেশীয়ভাবে ব্যবহার করা হবে।
ড. জালাল উদ্দিন শুধু প্রশাসনিক পর্যায়েই নয়, রাজনৈতিকভাবেও সেতু বাস্তবায়নের দাবিকে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরেছেন। মহান জাতীয় সংসদে একাধিকবার তিনি মতলব-গজারিয়া সেতুর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন এবং দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানান।
গত ১৬ মে চাঁদপুরে অনুষ্ঠিত জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতেও তিনি বিষয়টি জোরালোভাবে উত্থাপন করেন। বক্তব্যে তিনি বলেন, মতলব ঢাকার অতি নিকটবর্তী। মতলব-গজারিয়া ব্রিজটি হলে আমরা মাত্র দেড় ঘণ্টায় ঢাকায় যেতে পারব। আমাদের এক নম্বর দাবি মতলব-গজারিয়া ব্রিজ।
তিনি আরও বলেন, এই সেতু বাস্তবায়িত হলে শুধু মতলববাসীর যোগাযোগ সহজ হবে না, বরং এটি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বিকল্প করিডোর হিসেবে দেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য ও জাতীয় নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
২০২৫ সালের নভেম্বরে দক্ষিণ কোরিয়ার অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদল প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে এলে ড. জালাল উদ্দিন তাদের সঙ্গে সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখান। তিনি প্রতিনিধিদলের কাছে তুলে ধরেন, এটি শুধু একটি সেতু নয়, বরং চাঁদপুর, মুন্সিগঞ্জ, লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালীসহ দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দুয়ার।
এদিকে, চাঁদপুর জেলা যুবদলের সহ-সভাপতি খায়রুল হাসান বেনু বলেন, মতলব-গজারিয়া সেতু বাস্তবায়নের জন্য ড. জালাল উদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। জাতীয় সংসদ থেকে শুরু করে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর, বিদেশি অর্থায়নকারী সংস্থা সব জায়গায় তিনি এ প্রকল্পের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তাঁর ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলেই আজ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।
সেতু বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ১ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই আধুনিক ক্যাবল স্টেইড সেতুতে ২৫ মিটার ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্স থাকবে, যাতে মেঘনা নদীর নাব্যতা ও স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকে। প্রকল্পের আওতায় ছয় লেনের সংযোগ সড়ক, আড়াই কিলোমিটার নদীশাসন এবং মেঘনা-ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের ৬২ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ উন্নয়নও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের আশা, অল্প সময়ের মধ্যে টেন্ডার আহ্বান করা হবে। এরপর নির্মাণকাজ শুরু হলে মতলব-গজারিয়া সেতু শুধু দুই জেলার মধ্যে সংযোগই নয়, বরং দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পায়ন ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে নতুন যুগের সূচনা করবে।