পাঁচ বছরেও স্থায়ী রেজিস্ট্রার নিয়োগ দিতে পারেনি চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

  • শরীফুল ইসলাম
 
স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চলতি দায়িত্ব বা ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সরকারি সাধারণ বিধি থাকলেও সেই বিধি উপেক্ষা করার অভিযোগ উঠেছে চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. পেয়ার আহম্মেদের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, যোগ্য ও অভিজ্ঞ প্রার্থীদের আবেদন উপেক্ষা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের দশম গ্রেডের এক শিক্ষানবিশ কর্মকর্তাকে রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছেন তিনি।
সরকারি বিধি অনুযায়ী, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের প্রধানের চলতি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারীকে সংশ্লিষ্ট পদের পদবি ব্যবহার করে তার সঙ্গে ‘ভারপ্রাপ্ত’ শব্দ যুক্ত করতে হয়। আর প্রধান ব্যতীত অন্য কোনো উচ্চতর পদের দায়িত্ব পালন করলে সংশ্লিষ্ট পদের পদবির সঙ্গে ‘চলতি দায়িত্ব’ শব্দ যুক্ত করার বিধান রয়েছে। তবে এসব বিধির তোয়াক্কা না করেই চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
২০২১ সালের জানুয়ারিতে চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। প্রথম উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. নাছিম আখতার। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় এবং শিক্ষার্থী, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলনের মুখে গত বছরের ৫ আগস্টের পর সরকার তাকে উপাচার্য পদ থেকে সরিয়ে দেয়।
পরবর্তীতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. পেয়ার আহম্মেদ নতুন উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের দশম গ্রেডের কর্মকর্তা আল মামুনকে রেজিস্ট্রার হিসেবে বসান। দায়িত্ব পাওয়ার সময় ওই কর্মকর্তার শিক্ষানবিশকালও শেষ হয়নি। এমনকি তিনি পদের পাশে ‘চলতি দায়িত্ব’ না লিখে ‘ভারপ্রাপ্ত’ শব্দ ব্যবহার করছেন, যা বিধিবহির্ভূত বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
চলতি বছরের ২৫ মার্চ দ্বিতীয়বারের মতো রেজিস্ট্রারসহ একাধিক পরিচালক পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে ২০২২ সালে প্রকাশিত আগের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বাতিল না করলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি বলে বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানিয়েছে।
২০২২ সালের বিজ্ঞপ্তিতে রেজিস্ট্রার পদে আবেদন করেছিলেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের বর্তমান পরিচালক সৈয়দ আহমেদ। চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩২ বছরের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তাকে ভাইভায় ডাকা হয়নি।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, আমি আবেদন করেছিলাম কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের চাওয়া সকল শর্ত পূরণ করলেও তারা আমাকে ডাকেনি। বিশ্ববিদ্যালয় সেক্টরে আমার চাকরির বয়স ৩২। এখনও আমি পরিচালক পদে দায়িত্ব পালন করছি। তারা আমাকে কোনোভাবেই বাদ দিতে পারেন না। পেয়ার আহম্মেদ সাহেব কেন আমাকে ডাকলেন না তার কোনো কারণ আমি বুঝতে পারছি না।
তিনি আরও বলেন, নিয়ম অনুযায়ী সাধারণত একটি পদে উপরে কাউকে চলতি দায়িত্ব দেয়া যায়। যিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে চাকরি করছেন তাকে সর্বোচ্চ সেকশন অফিসার বা সমমানের পদে দায়িত্ব দেয়া যেতে পারে। তাকে কোনোভাবেই রেজিস্ট্রার পদের চলতি দায়িত্ব দেয়া যায় না। ভিসি কীভাবে একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে রেজিস্ট্রার পদের দায়িত্ব দিলেন সেটা আমার বোধগম্য হচ্ছে না।
একই বিজ্ঞপ্তিতে আবেদন করেছিলেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন রেজিস্ট্রার মো. মজিবুর রহমান মজুমদার। দীর্ঘদিন রেজিস্ট্রার পদে দায়িত্ব পালন করলেও তাকেও নিয়োগ পরীক্ষায় ডাকা হয়নি। তিনি বলেন, আমাকে না ডাকার কোনো কারণ জানানো হয়নি। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।
এদিকে উপাচার্যের বিরুদ্ধে নিজের ছেলেকে মেডিকেল অফিসার পদে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগও ওঠে। পরে সমালোচনার মুখে তাকে পদত্যাগ করানো হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক কর্মচারী জানান, নিয়োগ কার্যক্রম শেষে উপাচার্য বলেছেন, তার ছেলের বাইরে কাউকে যোগ্য মনে হয়নি। তাই কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। প্রশাসন নিয়ন্ত্রণে রাখতেই তিনি অনভিজ্ঞ একজনকে রেজিস্ট্রার করেছেন।
এ বিষয়ে উপাচার্য প্রফেসর ড. পেয়ার আহম্মেদ বলেন, আমরা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিলাম। বোর্ডও সম্পন্ন হয়েছে। তবে কোনো যোগ্য প্রার্থী না পাওয়ায় আমরা রেজিস্ট্রার নিয়োগ দেইনি।
দশম গ্রেডের শিক্ষানবিশ এক কর্মকর্তাকে রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব প্রদানের বিষয়ে তিনি বলেন, আমাদের এখানে লোক নেই। তাই আমরা তাকে দায়িত্ব দিয়েছি। যখন লোক নিয়োগ হবে তখন আমরা বিধি মানবো। আগামী এক মাসের মধ্যে নতুন বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে রেজিস্ট্রার নিয়োগ করা হবে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) সচিব ড. মো. ফখরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি বলেন, আমি এ বিষয়ে কথা বলব না। বিষয়টি নিয়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক কথা বলবেন। পরবর্তী ইউজিসির পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ম্যানেজমেন্ট বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ জামিনুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও কথা বলেননি। সবশেষ  বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি অতিরিক্ত পরিচালক মো. মহিবুল আহসানও।
শেয়ার করুন