চাঁদপুরে পাউবোর ৮ কোটি টাকার ফেরো সিমেন্ট স্ল্যাব নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ

উপ-সহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর হোসেন নিজে ঠিকাদারির সাথে জড়িত থাকার

অভিযোগ : খুলনায় বদলী করে ৫ দিনের মধ্যে অব্যাহতি প্রদানের নির্দেশ

বিশেষ প্রতিবেদক :
চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলায় ৬৬ কিলোমিটার বেড়ি বাঁধ সুরক্ষায় ফেরো সিমেন্টের স্ল্যাব নির্মাণ কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার ফরাজীকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে প্রায় ৮ কোটি টাকা ব্যয়ে এসব স্ল্যাব তৈরি করছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আমিন এন্ড কোং। তবে কাজের মান নিয়ে স্থানীয়দের মাঝে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রকল্প অনুযায়ী স্ল্যাব নির্মাণে ৪:১ অনুপাতে সিমেন্ট ও বালুর মিশ্রণ থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা ৮:১ অনুপাতে করা হচ্ছে, যা স্ল্যাবকে মারাত্মকভাবে দুর্বল করে দিচ্ছে। এছাড়া নির্মাণের সময় দুই স্তরে তারের জাল ব্যবহারের কথা থাকলেও তা নিয়ম মেনে বসানো হচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে, একসাথে জাল ব্যবহার করায় কাঠামোর স্থায়িত্ব কমে যাচ্ছে।

এলাকাবাসী জানান, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ও নিয়ম বহির্ভূত পদ্ধতিতে কাজ করায় ভবিষ্যতে বেড়ি বাঁধ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তারা দ্রুত এ বিষয়ে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

এদিকে আমিন এন্ড কোং প্রতিষ্ঠানটি কাজের ওয়ার্ক অর্ডার পেলেও বাস্তবে কাজ পরিচালনা করছেন আজিজ নামের এক ঠিকাদার- এমন অভিযোগও উঠেছে। ফলে কাজের স্বচ্ছতা নিয়ে আরও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

অন্যদিকে চাঁদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড এ কাজের দায় নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দাবি, তাদের অফিসের অনুমোদনের বাইরে এই কাজ কে বা কারা পরিচালনা করছে, সে বিষয়ে তারা অবগত নন।

এই কাজের ঠিকাদারের সাথে মেঘনা-ধনাগোদা পানি উন্নয়ন বিভাগের এখলাসপুর পানি উন্নয়ন শাখার উপ-সহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর হোসেন ব্যবসায়িক পার্টনার হিসেবে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। সে নিজে কাজের অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে সম্পৃক্ত বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। ওই ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিতে সে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেছে। ঠিকাদারের পক্ষে স্থানীয়ভাবে সে কাজ তদারকি করে। অনেকটা রক্ষক হয়ে ভক্ষকের ভূমিকায় আছে সে।

এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মচারী পরিদপ্তর গত ৮ এপ্রিল অভিযুক্ত উপ-সহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর হোসেনকে পাউবো’র খুলনার দাকোপ পানি উন্নয়ন শাখায় বদলী করেছে। একই সাথে ৫ দিনের মধ্যে তাকে অব্যাহতি প্রদানের জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অন্যথায় পরবর্তী কর্মদিবস হতে তাৎক্ষণিকভাবে অব্যাহতিপ্রাপ্ত বলে গণ্য হবে- এমনটি বলা হয়েছে বদলী আদেশে। পরিদপ্তরের উপ-পরিচালক হোসাইন মো. হাফিজুর রহমান স্বাক্ষরিত আদেশে এসব নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

মতলব উত্তর উপজেলায় দুটি সাব-ডিভিশনের মাধ্যমে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যক্রম পরিচালিত হয় কালীপুর ও উদ্দমদি। কালীপুর সাব-ডিভিশনের উপ-সহকারী প্রকৌশলী জুবায়েদ বলেন, এই স্ল্যাব নির্মাণের কাজ কারা করছে, সে বিষয়ে আমার কোনো ধারণা নেই।

এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায় এড়ানোর প্রবণতা ও তদারকির অভাবে উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে। দ্রুত সঠিক তদন্ত ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে কোটি টাকার এই প্রকল্প হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন সচেতন মহল।

বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, দশম গ্রেডে চাকুরি করেও ঢাকার ধানমন্ডি-২৭ এলাকায় বিলাসবহুল ফ্ল্যাট (২৭০০ বর্গফুট), টয়োটা এলিয়েন বাড়ি ব্যবহার, নিজ এলাকা হাইমচরে অট্টালিকা, গরু-মহিষের বিরাট খামার, শত বিঘা জমি এবং চাঁদপুর শহরের আলিশান এলাকায় প্লট রয়েছে। স্বল্প বেতনের চাকুরিতে তার এই কোটি কোটি টাকার সম্পদ নিয়ে সবাই হতবাক। বিশাল বিশাল দুর্নীতি ছাড়া এত সম্পদ অর্জন কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে স্থানীয়রা মনে করেন। এর মধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মচারী হয়েও ঠিকাদারের নামে কাজ নিয়ে সে নিজে ঠিকাদারী করে। তার বড় ভাই এস এম কবির ভূমিদস্যু হিসেবে পরিচিত।

চাঁদপুরের সাবেক আলোচিত চেয়ারম্যান সেলিম খানের সাথেও জাহাঙ্গীরের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি দোর্দন্ড দাপটের সাথে চাঁদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড নিয়ন্ত্রণ করেছেন। টানা প্রায় ১৮ বছর ধরে সে চাঁদপুর জেলায় কর্মরত। তার টেন্ডারবাজি ও ঠিকাদারী কাজ সিন্ডিকেটের আরেক সহযোগী এসডি সালাউদ্দিন। তারা দু’জনে মিলে অন্য জেলার ঠিকাদারের নামে কাজ নিয়ে নিজেরা পুকুর চুরি করেন। অথচ কাজে অনিয়ম-দুর্নীতি তাদের ধরার কথা ছিল। তাদের কাছে যেন চাঁদপুরের পাউবো কর্মকর্তা-কর্মচারী, ঠিকাদাররা অনেকটা জিম্মি।

এসব অভিযোগ অস্বীকার করে উপ-সহকারী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, ফরাজিকান্দিতে যেসব স্ল্যাব তৈরী করা হচ্ছে সেগুলো আমাদের কোনো প্রকল্পের না। তারপরও অভিযোগ পেয়ে কাজ রাখতে বলেছি আমরা। তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো সত্য নয় বলে তিনি দাবি করেছেন।

শেয়ার করুন