টাকার নোটে পোড়া দাগ! বিড়ম্বনায় ক্রেতা-বিক্রেতা

আল ইমরান শোভন
চাঁদপুর শহরের বাজারগুলোতে ১০, ২০ ও ৫০ টাকার বিভিন্ন নোটে প্রায়ই দেখা যাচ্ছে পোড়া দাগ। নতুন কিংবা পুরোনো, এমনকি চকচকে নোটেও মিলছে এ ধরনের চিহ্ন। নোটের এক কোণে বা কোনো অংশে পোড়া দাগ থাকায় লেনদেনের সময় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। অনেক ক্ষেত্রে টাকা হাতে নেওয়ার পর পোড়া দাগ চোখে পড়লে তা বদলে দেওয়ার দাবি জানান ক্রেতারা। এতে বাড়তি ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, এসব নোটের একটি অংশ মাদক সেবনের কাজে ব্যবহারের পর বাজারে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ইয়াবা সেবনের সময় টাকা পুড়িয়ে ব্যবহারের কারণে নোটের এক পাশে পোড়া দাগ তৈরি হয় বলে তাঁদের দাবি। তবে এসব নোটের প্রকৃত উৎস ও পোড়া দাগের কারণ সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত বা আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি।
সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন লেনদেনে ১০, ২০ ও ৫০ টাকার নোটের ব্যবহার ব্যাপক। চায়ের দোকান, মুদি দোকান, হোটেল, গণপরিবহনসহ ছোটখাটো কেনাকাটায় এসব নোট হাতবদল হয় অসংখ্যবার। ফলে কোনো নোটে পোড়া দাগ থাকলে তা লেনদেনের সময় সহজেই চোখে পড়ে না। পরে বিষয়টি নজরে এলে তৈরি হয় বিব্রতকর পরিস্থিতি। এক পক্ষ টাকা নিতে না চাইলে অন্য পক্ষকে সেটি বদলে দেওয়ার চেষ্টা করতে হয়।
চাঁদপুর শহরের নতুন বাজার এলাকার ব্যবসায়ী মমিন বলেন, ‘টাকা কেনাবেচার ভিড়ে কখন যে পোড়া দাগযুক্ত নোট লেনদেন হয়ে যায়, তা অনেক সময় বোঝা যায় না। পরে কোনো ক্রেতা টাকা দেওয়ার সময় পোড়া দাগ দেখতে পেলে সেটি বদলে দিতে বলেন। তখন আমাদের বেশ বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়।’
তাঁর ভাষ্য, ব্যবসার ব্যস্ততার মধ্যে প্রতিটি নোট ভালোভাবে পরীক্ষা করে নেওয়া সম্ভব হয় না। আবার ক্রেতার হাতে এমন নোট তুলে দিলে তিনিও অসন্তুষ্ট হন। ফলে ছোট অঙ্কের টাকা নিয়েও অপ্রয়োজনীয় তর্ক-বিতর্কের পরিস্থিতি তৈরি হয়।
আরেক ব্যবসায়ী মান্নান বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবনের কাজে টাকা ব্যবহারের কারণে এ ধরনের পোড়া দাগ তৈরি হচ্ছে বলে তাঁরা শুনে আসছেন। বিশেষ করে ইয়াবা সেবনের সময় টাকা পোড়ানো হয় বলে তাঁর দাবি। এ কারণে অনেক নোটের এক কোণে পোড়া চিহ্ন দেখা যায়।
তবে শুধু পোড়া দাগ দেখেই কোনো নোট মাদক সেবনের কাজে ব্যবহার করা হয়েছে- এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। অসাবধানতা, আগুনের সংস্পর্শ কিংবা অন্য কারণেও নোট পুড়ে যেতে পারে। তাই বিষয়টি নিশ্চিত করতে প্রয়োজন যথাযথ অনুসন্ধান।
টাকার অঙ্ক ছোট হলেও লেনদেনের ঝামেলা ছোট নয়। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দৈনিক আয়ের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের কাছে ১০, ২০ কিংবা ৫০ টাকার নোটের গুরুত্ব অনেক। তাঁদের প্রতিদিনের কেনাকাটা ও ব্যবসায় এসব নোটের ব্যবহার বেশি হওয়ায় পোড়া বা ক্ষতিগ্রস্ত নোট নিয়ে সমস্যায় পড়ার আশঙ্কাও থাকে।
একজন ক্রেতা কোনো নোট গ্রহণের পর সেটি অন্যত্র খরচ করতে গিয়ে প্রত্যাখ্যাত হলে তাঁকেও ভোগান্তিতে পড়তে হয়। আবার দোকানিরা নোটটি গ্রহণ না করলে ক্রেতার সঙ্গে মনোমালিন্য তৈরি হতে পারে। এভাবে একটি ক্ষতিগ্রস্ত নোট ঘিরে একের পর এক লেনদেনে বিড়ম্বনা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। তাঁদের হাতে প্রতিদিন অসংখ্য নোট আসে। প্রতিটি নোটের উৎস জানা বা আগের ব্যবহার শনাক্ত করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে অজান্তেই ক্ষতিগ্রস্ত নোট গ্রহণ করার পর অন্য ক্রেতার কাছে সেটি চালাতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়।
ব্যবসায়ীদের বক্তব্যে মাদক সেবনের সঙ্গে পোড়া দাগযুক্ত নোটের একটি সম্পর্কের অভিযোগ উঠে এসেছে। তাঁদের দাবি, মাদক সেবনের সময় কিছু নোট ব্যবহারের পর সেগুলো আবার সাধারণ লেনদেনে চলে আসে। এ অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি শুধু মাদক ব্যবহারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং জনসমাগমপূর্ণ বাজারে মাদকসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের বিস্তার এবং তার সামাজিক প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চাঁদপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রহিম বাদশা এ বিষয়ে সচেতন হওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর মতে, এ ধরনের সমস্যা মোকাবিলায় সাধারণ মানুষকে সচেতন হতে হবে।
পোড়া বা ক্ষতিগ্রস্ত নোট হাতে এলে তা নিয়ে অযথা বিরোধে না জড়িয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক বা কর্তৃপক্ষের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে মাদক সেবন ও এর সম্ভাব্য ক্ষতিকর সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
বাজারে পোড়া দাগযুক্ত নোটের প্রকৃত সংখ্যা কত, কোন এলাকায় এর প্রবণতা বেশি এবং এসব নোটের সঙ্গে মাদক সেবনের কোনো প্রমাণিত সম্পর্ক আছে কি না- এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে বিষয়টি অনুসন্ধান করা গেলে সমস্যার প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে।
চাঁদপুরের বাজারে ছোট অঙ্কের নোট নিয়ে এই বিড়ম্বনা আপাতদৃষ্টিতে তুচ্ছ মনে হতে পারে। কিন্তু প্রতিদিনের লেনদেনে এমন অভিজ্ঞতা ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের জন্যই বিরক্তিকর। আর যদি এসব নোটের পেছনে মাদকসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডের কোনো বাস্তব যোগসূত্র থাকে, তবে সেটি আরও গভীর সামাজিক উদ্বেগের বিষয়।
তাই শুধু পোড়া নোট নিয়ে ক্রেতা-বিক্রেতার পারস্পরিক দোষারোপ নয়, প্রয়োজন অভিযোগের সত্যতা যাচাই, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল ভূমিকা।
শেয়ার করুন