প্রযুক্তি নির্ভর সাংবাদিকতার একাল সেকাল

।। নাসির উদ্দিন পাঠান।।

শাওন জামান একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করেছেন। একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে কাজ করার প্রবল ইচ্ছে থেকে যোগ দেন একটি পত্রিকায়। তারপর থেকে অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই বেশ কিছু হাউজে সে আসা যাওয়ার মধ্যে ছিলো। এক কথায় কোথাও স্থায়ী হতে পারেনি। একদিন হটাৎ ফোন করে চাকরি চাইলো আমার কাছে। সরাসরি দেখাও করলো। প্রথমেই তার কাছে আমার প্রশ্ন ছিলো কেন সে কোথাও স্থায়ী হতে পারেনি?

মেয়েটার সরাসরি জবাব ভাই যে সাংবাদিকতা ওখানে করতে হয়, তা তো আমার পক্ষে সম্ভব না। আমি অবাক হয়ে রইলাম তার কথা শুনে। আমি তার কথা বুঝতে পারিনি বলে সে এবার বললো। ভাই যেখানেই যাই একটা মোবাইল ধরিয়ে দিয়ে বলে, অমুক নেতা, তমুক সেলিব্রিটি কিভাবে হাঁটলো কিভাবে বসলো ওইটার রিলস করো, সর্ট করো, কনটেন্ট বানাও। এগুলো তো ভাই আমার সাথে যায় না।

আমি চাই লিখতে, অনুসন্ধান করতে সমস্যা সম্ভাবনা তুলে ধরতে, কিন্তু তার আর সুযোগ কই? যে গণমাধ্যমে এই সুযোগ আছে সেখানে আমি অযোগ্য। আমি তার কথাগুলো অপলক তাকিয়ে শুনেই গেলাম কোন জবাব ছিলো না।

আর ভাবলাম আসলেই তো একালের সাংবাদিকতা একটা মাত্র মোবাইল ফোনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। প্রযুক্তির কারণে সাংবাদিকতায় যেমন আধুনিকতা এসেছে আবার এর বিপরীত দিকও আছে।

আধুনিক সাংবাদিকতায় যেমন দ্রুত সংবাদ পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারে। তেমনি সংবাদের তথ্য উপাত্তে থেকে যায় ঘাটতি।

এবার একটু দৃষ্টি ফেরাতে চাই সেকালের সাংবাদিকতার দিকে। আমার গণমাধ্যম কর্মী হিসেবে ২৭ বছর পার হয়েছে তাহলে এটাকে মোটামুটি সেকাল বলা যেতেই পারে। তার উপর যেহেতু মফস্বল থেকেই শুরু, লেখাটাও সেখান থেকে শুরু করলেই ভালো।

ওই যে প্রথমেই বলেছিলাম প্রযুক্তি এই দুই কালের সাংবাদিকতাকে পুরোপুরি আলাদা করে দিয়েছে। তখনও প্রযুক্তির ছোঁয়া একেবারে নেই বললেই চলে। প্রথমে আসি।

একজন সাংবাদিক হিসেবে নিজে আগে ঘটনা সম্পর্কে জানার চ্যালেঞ্জ ছিলো সবচেয়ে বড়। একটি ঘটনা বা দূর্ঘটনা ঘটার অন্তত দুই থেকে তিন দিন পর খবর পেতাম। কোন কোন ক্ষেত্রে সপ্তাহ পার।

এবার লোকমুখে সেই ঘটনা শোনার পর ঘটনাস্থলে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে পরিবহন সমস্যা অন্যতম। কখনো বাইসাইকেল, কখনো রিকশা কখনো বা পাশে হেঁটেও ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে হতো।

এরপর অবশ্য হাতে গোনা দু’একজন সহকর্মীর মোটরসাইকেল বা ধার করা ৫০ সিসির মোটর সাইকেল ছিল ভরসা। তারপর কোন রকমে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পারলেও সামনে আরেক চ্যালেঞ্জ তথ্য সংগ্রহ করা।

ঘটনা ঘটে যাওয়ার দুই দিন পর (অনেক ক্ষেত্রে) আলামত নেই। কারণ মোবাইল তো নেই যে কেউ না কেউ ভিডিও করে রাখবে।

এরপর শুরু হলো তদন্ত। এবার কেউ মুখ খোলে তো কেউ খোলে না। তারপরও নানান চড়াই-উৎরাই পার করে তথ্য নিয়ে মোটামুটি বেলা শেষ করে জেলা /উপজেলা সদরে ফেরা। এবার সাদা কাগজ বা পত্রিকা থেকে সরবরাহ করা নিউজপ্রিন্টের প্যাড নিয়ে লিখতে বসা।

পুরো সংবাদ লেখার পর এবার ঢাকায় পত্রিকা অফিসে পাঠানোর পালা। মাধ্যম ওই একটাই ডাক বিভাগ। আজ পাঠালে সেটা অফিসে পৌঁছাতে সময় নিতো তিন থেকে পাঁচ দিন। আবার কখনো কখনো গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ হলে সেটা নিয়ে ঢাকায় যেতে হতো প্রায় ৭ ঘন্টা জার্নি করে। এরপর অবশ্য বেশ কিছু বছর পর আসলো কুরিয়ার সার্ভিস।

যে মাধ্যমে সংবাদ পাঠানো যেতো ২৪ ঘণ্টার মধ্যে। এর মাঝে কিন্তু আরেকটি পদ্ধতি ব্যবহার করা হতো সেটা টিএনটি এনালগ ফোন। অতি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এখন যাকে আমরা ব্রেকিং নিউজ বলি। এমন ঘটনা হলে সাহায্য নেয়া হতো সেই পদ্ধতির। সেখানেও জটিলতা কম নয়।

পুরো ঘটনা আগে কাগজে সংবাদ আকারে লিখতে হতো তারপর ফোনে পড়ে পড়ে বললে অফিসের প্রান্তে একজন সাব এডিটর সেটা হুবহু লিখে বার্তা সম্পাদকের টেবিলে রাখতেন। এভাবে ধীরে ধীরে সাংবাদিকতায় প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হতে থাকে।

এরপর একটু আধুনিকতা নিয়ে এলো ডেক্সটপ কম্পিউটার, হাতের লেখার সংবাদ থেকে কম্পিউটার কম্পোজ করে লেখা পাঠানোটা অনেকটা আধুনিক আধুনিক ভাব আসতো। তবে এখানেও ছিলো জটিলতা ব্যক্তিগত কম্পিউটার না থাকার কারণে আগে হাতে লিখে সংবাদ তৈরি করে তা নিয়ে যেতে হতো কম্পিউটারের দোকানে। সেই লেখা দেখে কম্পোজ ম্যান তা ছাপার অক্ষরে প্রিন্ট বের করে দিতেন। এরপর অবশ্য একজন দুইজন করে সাংবাদিকরা কম্পিউটার ব্যবহার শুরু করেন।

এরপর আধুনিকতায় যোগ হলো বেসরকারি টেলিফোন কোম্পানির সিটিসেল এর ফ্যাক্স। সকলে যেন হাতে চাঁদ ধরার মতো অবস্থা। যেন নিজেরাই বিশ্বাস করতে পারছে না। যে নিজের লেখা সংবাদ কয়েক মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যায় রাজধানীর পত্রিকা অফিসে।

কিন্তু এখানেও জটিলতা ও চ্যালেঞ্জ কখনো সদরে, কখনো আবার ২০ থেকে ৫০ কিলোমিটার দূরে গিয়েও পাঠাতে হতো ফ্যাক্স। এরপর যখন টিএনটি ডিজিটাল হওয়া শুরু হলো অনেকটা হাতের কাছেই চলে আসলো ফ্যাক্স। তখন সংবাদ লেখার প্রতিযোগিতাও যেন বেড়ে গেলো।

এরপর প্রযুক্তি সবার সামনে নিয়ে আসলো ইমেইল । তখন থেকে কমে গেলো কাগজ কলমের ব্যবহার। এবার যেই ডেক্সটপে লেখা সেই ডেক্সটপে ইমেইল ব্যবহার করে মুহুর্তে সংবার চলে যায় পত্রিকা অফিসে। সাথে ছবিও। ও ছবির কথা তো না বললে অপূর্ণ থেকে যায়। সচিত্র প্রতিবেদন তৈরির জন্য তো ছবি দরকার। আর সেই ছবির একমাত্র যোগানদাতা ইয়াশিকা ক্যামেরা।

যার কাঁধে একটা ইয়াশিকা ক্যামেরা, সাংবাদিক হিসেবে তার তত নামডাক। এখানেও চ্যালেঞ্জ ছবি তুললে তো হবে না সেটাকে ল্যাবে নিয়ে প্রিন্ট বের করে তারপর পাঠাতে হবে পত্রিকা অফিসে। যার জন্য ছবি তুলেই ক্যামেরা নিয়ে ছুটে যেতে হতো, আশপাশের জেলা শহরে।

এরপর আসলো ডিজিটাল ক্যামেরার যুগ। এবার ছবি তুলে ইমেইলের মাধ্যমে মোটামুটি কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ছবি পৌঁছে যায় ঢাকায়। এরপর সাংবাদিকদের হাতে বাটন মোবাইল ফোন। এতে সংবাদের তথ্য পাওয়া ও পত্রিকা অফিসে যোগাযোগ করার মাধ্যম কিছুটা সহজ হতে শুরু করে। তার পরের গল্প তো স্মার্ট ফোনের।

স্মার্ট ফোন যতই সহজলভ্য হতে শুরু করলো সাংবাদিকতা যেন ততই সহজ হতে শুরু করলো। আর এই সাংবাদিকতার বিষয়ে বিস্তারিত বলার প্রয়োজন মনে হয় দরকার পড়ে না।

একটা স্মার্ট ফোনই এখন আপনার সকল কাজের সমাধান। এটি থাকলে আপনি ঘরে বসেই চালিয়ে যেতে পারেন সাংবাদিকতা। শুধু সিসি ও ফরোয়ার্ড করা জানলেই আপনার নাম পরের দিন পত্রিকায়। ক্রেডিট লাইনে ছাপার অক্ষরে বড় বড় করে।

এতেই শেষ নয়, প্রযুক্তি আরও সহজ করে দিচ্ছে সাংবাদিকতা। আপনি সিসি বা ফরোয়ার্ড কারও কাছ থেকে পেলেন না, হতাশ হওয়ার কিছু নাই। আপনার জন্য আছে এ আই’র চ্যাট জিপিটি। এই অপশনে গিয়ে আপনি শুধু ঘটনা সম্পর্কে তাকে মৌলিক তথ্য দিবেন, তারা আপনাকে কয়েক মিনিটের মধ্যে একটা পুরো সংবাদ বা টেলিভিশনের প্রতিবেদন তৈরি করে দিচ্ছে।

প্রযুক্তির সাহায্যে সাংবাদিকতার একাল সেকাল নিয়ে আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা তুলে ধরলাম মাত্র। কিন্তু এই প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার করার কারণে মুহূর্তের সংবাদ আমরা মুহূর্তে সরাসরি দেখছি।

সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহ বা সংরক্ষণেও কাজে লাগছে। তাই প্রযুক্তি সঠিক ব্যবহার করে একালের সাংবাদিকতাও হোক দেশ ও মানুষের কল্যাণে।

লেখক : নাসির উদ্দিন পাঠান, গণমাধ্যম কর্মী, ঢাকা।

শেয়ার করুন