আল ইমরান শোভন ➤
চিকিৎসা নিতে এসেছেন ৬০ বছর বয়সী রাজিয়া বেগম। সঙ্গে ছেলে শাহাদাত হোসেন। হাজীগঞ্জ উপজেলার ধেররা এলাকা থেকে মাকে নিয়ে করিম বাগানে এসেছেন তিনি। ভালো চিকিৎসক হিসেবে পরিচিতি আছে- এমন কথা শুনেই প্রথমবারের মতো এখানে আসা।
চোখ দেখানোর জন্য চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু চেম্বারে ঢোকার আগেই ঘটে গেল অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা। চিকিৎসার আগে রোগী ও স্বজনদের জন্য খাবারের আয়োজন। তাঁদের পেট ভরে খাওয়ানো হচ্ছে। এরপর শুরু হচ্ছে চিকিৎসা।
শুধু খাবার খাওয়ানোতেই শেষ নয়। দরিদ্র রোগীদের প্রয়োজন হলে ওষুধ ও ফলমূল কেনার জন্যও সহযোগিতা করা হচ্ছে। চিকিৎসাসেবার সঙ্গে এমন মানবিক উদ্যোগ নিয়েছেন চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ পৌর এলাকার করিম বাগানে বসবাসকারী অবসরপ্রাপ্ত চক্ষু চিকিৎসক প্রফেসর ডা. মো. গোলাম মোস্তফা মজুমদার।
তিনি চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ ও সদর হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিভাগীয় প্রধান। চাকরি থেকে অবসর নেওয়ার পরও চিকিৎসাসেবা থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেননি। হাজীগঞ্জের করিম বাগান এলাকায় নিজ বাসভবনেই নিয়মিত রোগী দেখছেন। প্রতিদিন দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় ৩০ জন রোগী তাঁর কাছে চিকিৎসা নিতে আসেন।
তবে অন্য অনেক চিকিৎসকের চেম্বারের সঙ্গে তাঁর জায়গাটির পার্থক্যটা চোখে পড়ে রোগীর অপেক্ষার সময়েই। এখানে চিকিৎসার পাশাপাশি রোগীর ক্ষুধার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
চিকিৎসার আগে খাবার
রাজিয়া বেগমের ছেলে শাহাদাত হোসেন বলেন, ভালো চিকিৎসকের কথা শুনে মাকে নিয়ে এখানে এসেছেন। কিন্তু চিকিৎসকের এমন উদ্যোগ দেখে তিনি অবাক হয়েছেন।
শাহাদাত বলেন, ‘ভালো চিকিৎসক। কোনো জায়গায় এমন দেখিনি, রোগী বা স্বজনদের চিকিৎসক নিজে খাবার পরিবেশন করে খাওয়ান।’
রাজিয়া বেগমের কাছেও চিকিৎসকের এই উদ্যোগ ভালো লেগেছে। তাঁর ভাষায়, ‘খাবার, ব্যবহার ভালো। চিকিৎসার জন্য এসেছি।’
শুধু হাজীগঞ্জ নয়, জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগীরা আসছেন এখানে। ফরিদগঞ্জ উপজেলার কালির বাজার থেকে এসেছেন প্রবাসী মো. হুমায়ুন কবির। তিনিও প্রথমবারের মতো চিকিৎসকের কাছে এসেছেন। চিকিৎসকের নাম শুনেই এখানে আসা। তাঁরও ভালো লেগেছে চিকিৎসকের ব্যবহার।
হাজীগঞ্জ উপজেলার সিদলা এলাকার বাসিন্দা আমেনা বেগম এবং শাহরাস্তি উপজেলার টামটা এলাকার বাসিন্দা তানিয়া আক্তারও চিকিৎসা নিতে এসেছেন এখানে। দূর-দূরান্ত থেকে আসা রোগী ও স্বজনদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা থাকায় তাঁদের অপেক্ষার সময়টিও কিছুটা স্বস্তির হয়ে উঠছে।
করিম বাগান এলাকার বাসিন্দা মো. মারুফও চিকিৎসকের এই উদ্যোগকে ব্যতিক্রমী বলে মনে করেন। তাঁর মতে, চিকিৎসার পাশাপাশি মানুষের প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে এমন উদ্যোগ নেওয়া এলাকায় ইতিবাচক বার্তা তৈরি করছে।
পেছনে যে গল্প
কেন এমন উদ্যোগ?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে চিকিৎসকের নিজের শৈশবের স্মৃতিতে।
ছোটবেলায় তিনিও অনুভব করেছেন ক্ষুধার যন্ত্রণা। ক্ষুধার্ত অবস্থায় থাকার সেই অভিজ্ঞতা তাঁর মনে এখনও দাগ কেটে আছে। সময়ের সঙ্গে জীবনে অনেক পরিবর্তন এসেছে। চিকিৎসক হয়েছেন, দীর্ঘদিন সরকারি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেছেন, বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে অবসর নিয়েছেন। কিন্তু শৈশবের সেই ক্ষুধার স্মৃতি ভুলে যাননি।
বরং সেই স্মৃতিই তাঁকে অন্যের ক্ষুধা বুঝতে শিখিয়েছে।
চিকিৎসা নিতে আসা মানুষগুলোর অনেকেই দূর এলাকা থেকে আসেন। অসুস্থ শরীর নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে চিকিৎসকের কাছে পৌঁছাতে হয় তাঁদের। কেউ আবার সঙ্গে নিয়ে আসেন বয়স্ক মা-বাবাকে। চিকিৎসার অপেক্ষায় থাকতে হয় কিছু সময়। এ সময় একজন ক্ষুধার্ত রোগীর কষ্ট কেমন হতে পারে, তা নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই উপলব্ধি করেন ডা. গোলাম মোস্তফা মজুমদার।
সেখান থেকেই রোগীদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করার ভাবনা।
তাঁর কাছে চিকিৎসা শুধু রোগ নির্ণয়, প্রেসক্রিপশন লেখা কিংবা ওষুধ দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। একজন মানুষ চিকিৎসা নিতে এলে তাঁর সামগ্রিক প্রয়োজনের কথাও বিবেচনায় রাখা দরকার- এমন বিশ্বাস থেকেই এই উদ্যোগ।
শুধু খাবার নয়, ওষুধেও সহযোগিতা
রোগীদের জন্য খাবারের আয়োজনের পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ ও ফলমূল কেনার জন্যও আর্থিক সহযোগিতা করেন ডা. গোলাম মোস্তফা মজুমদার।
চিকিৎসা নিতে আসা দরিদ্র মানুষের জন্য অনেক সময় চিকিৎসার খরচের চেয়েও ওষুধ কেনা বড় চাপ হয়ে দাঁড়ায়। আবার অসুস্থ রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় ফলমূল কেনার সামর্থ্যও অনেক পরিবারের থাকে না। এমন রোগীদের ক্ষেত্রে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন তিনি।
ফলে তাঁর কাছে আসা কিছু রোগীর জন্য চিকিৎসার পাশাপাশি এই সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চিকিৎসক নিজেই রোগীদের খাবার পরিবেশন করেন। এতে রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে তাঁর দূরত্বও কমে আসে। চিকিৎসকের এমন আচরণ অনেকের কাছে চিকিৎসাসেবার বাইরে মানবিক সম্পর্কের একটি দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রতিদিন ৩০ রোগী
হাজীগঞ্জ পৌর এলাকার করিম বাগানে নিজ বাসভবনে প্রতিদিন দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রোগী দেখেন ডা. গোলাম মোস্তফা মজুমদার। প্রতিদিন প্রায় ৩০ জন রোগী তাঁর কাছে চিকিৎসা নেন।
চোখের সমস্যায় আক্রান্ত এসব রোগীর কেউ স্থানীয়, আবার কেউ আসেন উপজেলার বাইরে থেকে। চিকিৎসকের সুনাম শুনে নতুন রোগী যেমন আসছেন, তেমনি আগের রোগীরাও আবার আসছেন।
চিকিৎসকের কাছে আসা রোগীদের অনেকের বয়স বেশি। তাঁদের সঙ্গে থাকেন স্বজনেরা। ফলে খাবারের আয়োজনটি শুধু রোগীর জন্য নয়, অনেক ক্ষেত্রে তাঁদের সঙ্গে আসা স্বজনদের জন্যও স্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ক্ষুধা বুঝতে নিজের অভিজ্ঞতা
মানুষের জীবনে কিছু অভিজ্ঞতা থাকে, যা সময় পেরিয়ে গেলেও মুছে যায় না। ক্ষুধার কষ্ট তেমনই একটি অভিজ্ঞতা। ছোটবেলায় নিজের জীবনে সেই কষ্ট অনুভব করেছিলেন ডা. গোলাম মোস্তফা মজুমদার।
সম্ভবত সেই কারণেই তাঁর কাছে চিকিৎসা নিতে আসা একজন মানুষের ক্ষুধার বিষয়টি অন্য অনেকের চেয়ে আলাদাভাবে ধরা পড়ে।
তিনি মনে করেন, অসুস্থ একজন মানুষ যখন চিকিৎসার জন্য আসেন, তখন তাঁর শরীরের অসুস্থতার পাশাপাশি মৌলিক প্রয়োজনগুলোর কথাও ভাবা দরকার। পেট খালি রেখে চিকিৎসা নিতে আসা মানুষকে আগে খাবার দেওয়া- তাঁর কাছে তাই শুধু দয়া নয়, মানবিক দায়িত্বের অংশ।
নিজের জীবনের কষ্টকে অন্যের জন্য সহায়তার শক্তিতে পরিণত করেছেন তিনি।
রোগীদের চোখে চিকিৎসক
চিকিৎসকের কাছে রোগীরা শুধু চিকিৎসা নিতে আসছেন না, সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন একটি অভিজ্ঞতাও। চিকিৎসকের ব্যবহার, খাবার পরিবেশন এবং প্রয়োজনের সময় সহযোগিতা- সবকিছু মিলিয়ে তাঁরা বিষয়টিকে আলাদা করে দেখছেন।
হাজীগঞ্জের ধেররা থেকে আসা শাহাদাত হোসেনের কথাতেই সেই অনুভূতির প্রকাশ পাওয়া যায়। তিনি বলেন, অনেক জায়গায় চিকিৎসা নিয়েছেন বা চিকিৎসকের কাছে গেছেন। কিন্তু রোগী কিংবা স্বজনদের চিকিৎসক নিজে খাবার পরিবেশন করে খাওয়াচ্ছেন- এমন অভিজ্ঞতা তাঁর আগে হয়নি।
ফরিদগঞ্জের হুমায়ুন কবিরও চিকিৎসকের ব্যবহারের প্রশংসা করেছেন। প্রথমবার এসেই তাঁর ভালো লেগেছে চিকিৎসকের আচরণ।
এমন অভিজ্ঞতাই ধীরে ধীরে চিকিৎসকের এই উদ্যোগকে স্থানীয় মানুষের আলোচনার বিষয় করে তুলেছে।
মানবিকতার ছোট উদ্যোগ
একজন চিকিৎসকের কাছে প্রতিদিন বহু রোগী আসেন। তাঁদের প্রত্যেকের আর্থিক অবস্থা এক নয়। কেউ চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারেন, কেউ পারেন না। কারও কাছে ওষুধ কেনার টাকা থাকে, কারও থাকে না।
এই ভিন্ন বাস্তবতার মধ্যেই ডা. গোলাম মোস্তফা মজুমদার নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী রোগীদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন।
হয়তো একবেলা খাবার একজন মানুষের সব সমস্যা দূর করে না। ওষুধের জন্য সামান্য আর্থিক সহযোগিতাও কোনো পরিবারের সব সংকট মেটায় না। কিন্তু প্রয়োজনের মুহূর্তে এই ছোট সহায়তাই একজন মানুষের জন্য বড় স্বস্তি হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষ করে চিকিৎসা নিতে এসে যখন কেউ দেখেন, তাঁকে শুধু একজন রোগী হিসেবে নয়, একজন মানুষ হিসেবেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে- তখন চিকিৎসাসেবার সঙ্গে তৈরি হয় আস্থার আরেকটি সম্পর্ক।
ক্ষুধার স্মৃতি থেকে অন্যের মুখে হাসি
জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতা মানুষকে কখনো ভেঙে দেয়, আবার কখনো অন্যের কষ্ট বোঝার শক্তি দেয়। ডা. গোলাম মোস্তফা মজুমদারের ক্ষেত্রে শৈশবের ক্ষুধার অভিজ্ঞতা যেন দ্বিতীয় পথটিই তৈরি করেছে।
নিজে যে কষ্ট অনুভব করেছেন, অন্য কেউ যেন অন্তত সেই কষ্টের কিছুটা কম অনুভব করেন- এই ভাবনা থেকেই রোগীদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা।
চিকিৎসার সঙ্গে মানবিকতার এই সমন্বয় হয়তো খুব বড় কোনো কর্মসূচি নয়। কিন্তু প্রতিদিন কয়েকজন মানুষের জন্য খাবারের ব্যবস্থা, দরিদ্র রোগীর ওষুধ বা ফলমূলের জন্য সহযোগিতা- এগুলো একেকটি ছোট উদ্যোগ। আর এমন ছোট উদ্যোগই কখনো কখনো বড় মানবিক দৃষ্টান্ত তৈরি করে।
হাজীগঞ্জের করিম বাগানে তাই চোখের চিকিৎসার পাশাপাশি চলছে আরেকটি নীরব কাজ- মানুষের ক্ষুধা বোঝার চেষ্টা।
শৈশবের ক্ষুধার কষ্ট থেকে পাওয়া শিক্ষা আজ অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছে। চিকিৎসক গোলাম মোস্তফা মজুমদারের এই উদ্যোগ যেন মনে করিয়ে দেয়, মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সব সময় বড় আয়োজনের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন শুধু অন্যের কষ্টটুকু নিজের মতো করে অনুভব করার।