চলে গেলেন আমাদের বটবৃক্ষ ইকরাম চৌধুরী

রহিম বাদশা :
অগ্রজ সাংবাদিক ইকরাম চৌধুরীর সাথে আমার সাংবাদিকতা জীবনের অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে আছে। যার অধিকাংশই কৃতজ্ঞতার। আমার প্রায় দু’যুগের সাংবাদিকতায় চাঁদপুরের যে ৩টি দৈনিকে কাজ করেছি তার মধ্যে ইকরাম ভাইয়ের চাঁদপুর দর্পণ অন্যতম।

প্রায় দেড় বছর আমি চাঁদপুর দর্পণের বিভাগীয় সম্পাদক ও স্টাফ রিপোর্টার ছিলাম। পাশাপাশি কম্পিউটার বিভাগেও কর্মরত ছিলাম। রাতের পর রাত জেগে চাঁদপুর দর্পণে কাজ করেছি ইকরাম ভাইয়ের সাথে।

অধিকাংশ রাতে ইকরাম ভাইয়ের সাথে সর্বশেষ কর্মী থাকতাম এসটি শাহাদাত, আমি আর কম্পিউটারের লিটন। মাঝে মাঝে ইকবাল ভাই ও শরীফ ভাইও কাজ শেষ করে বাসায় যেতেন।

তখন বিকেলে শুরু হয়ে রাতব্যাপী চলতো চাঁদপুর দর্পণের কাজ। রাতভর কাজ করে ভোরে এসটি শাহাদাত আর আমি পদব্রজে শহর প্রদক্ষিণ করতাম। আমাদের প্রধান গন্তব্য থাকতো মুখার্জিঘাট। সকালে নাস্তা করে প্রেস থেকে পত্রিকা নিয়ে তবেই ঘুমোতে যেতাম। ইকরাম ভাইও সকালে প্রেস থেকে সদ্যছাপা পত্রিকা হাতে নিয়ে বাসায় যেতেন।

চাঁদপুর দর্পণকে জনপ্রিয় করতে যেয়ে নিজের শরীরের দিকে মোটেও খেয়াল করেননি ইকরাম ভাই। দিন-রাত এক করে কাজ করতেন। সে সময় চাঁদপুর দর্পণে প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় নাস্তার সাথে মিষ্টি থাকতো। ইকরাম ভাই মিষ্টি খুব পছন্দ করতেন।

আমাদেরও বলতেন- ‘মিষ্টি খাও, মিষ্টি খেলে ব্রেন ভালো থাকে’। এই মিষ্টি আর রাতজাগা’ই পরবর্তীতে তার জীবনে কাল হয়ে যায়। জটিল ডায়াবেটিক বাসা বাঁধে তার শরীরে। ডায়াবেটিকের প্রভাবে কিডনি ও হৃদরোগে আক্রান্ত হন পরবর্তীতে। অবশেষে অকালে বিদায় নিলেন আমাদের মাঝ থেকে।

২০০০ সালের শুরুর দিকে একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে এক রাতে আমি চাঁদপুর কণ্ঠ ছেড়ে চাঁদপুর দর্পণে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলে বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করেই আমাকে স্বাগত জানান ইকরাম ভাই। পরদিনই আমি চাঁদপুর দর্পণে যোগদান করি। আবার চাঁদপুর দর্পণ ছেড়ে প্রকাশিতব্য চাঁদপুর প্রবাহে যোগদানের কথা জানালে তাতেও বাধা দেননি ইকরাম ভাই। তবে রাখার চেষ্টা করেছিলেন।

চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সদস্য হওয়ার ব্যাপারে আমাকে প্রত্যাশার চেয়েও বেশি উৎসাহ, সহযোগিতা ও সমর্থন দেন ইকরাম চৌধুরী। আমার সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে ভোটাভুটি পর্যন্ত হয়েছিল। সেই ভোটে তার সহযোগিতা ও হস্তক্ষেপে খুব সহজে আমি সদস্য পদ লাভ করি। এরপর কার্যকরী কমিটি ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ প্রাপ্তিতেও তার অবদান ছিল।

চাঁদপুর প্রেসক্লাবের কমিটি নিয়ে একসময় স্থানীয় সাংবাদিক সমাজ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছিলাম। আমরা ছিলাম কাজী শাহাদাত ভাইয়ের নেতৃত্বাধীন গ্রুপে। ইকরাম ভাই ছিলেন আমাদের প্রতিপক্ষ গ্রুপের নেতা। দু’পক্ষের তখন তুমুল বিরোধ, এক পক্ষের বিরুদ্ধে অন্য পক্ষের থানায় পাল্টাপাল্টি জিডি। এমনকি পত্রিকায় লেখালেখি পর্যন্ত চলছিল দুই পক্ষের মধ্যে।

সেই চরম বিরোধের সময়ও একসাথে আমরা পেশাগত দায়িত্ব পালন করেছি আন্তরিক সহাবস্তানে। সংবাদ সংগ্রহের সময় অকুস্থলে আমাদের আচরণ দেখে অনেকেই অবাক হতেন। সাংগঠনিক শত্রুতার সময়েও পেশাগত কাজে তার সহযোগিতা বিনিময় ছিল অবিস্মরণীয়।

২০০৬ সালের মধ্যভাগে হঠাৎ করে বাংলাভিশনে কাজ করার সুযোগ হয় আমার। তখন ভিডিও ক্যামেরা ছিল না আমার। স্মরণাপন্ন হলাম ইকরাম ভাইয়ের। প্রত্যাশার চেয়েও বেশি সহযোগিতা নিয়ে পাশে দাঁড়ালেন ইকরাম ভাই। তিনি তার মোটরসাইকেল চালিয়ে আমাকে নিয়ে গেলেন হাইমচরের চরভৈরবী এলাকায়।

দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে তার নিজের ভিডিও ক্যামেরায় আমার জন্য প্রায় ঘন্টাব্যাপী ভিডিও করলেন। নানাজনের সাক্ষাৎকার নিলেন। সেটি ছিল আমার টেলিভিশন সাংবাদিকতার প্রথম ভিডিও প্রতিবেদন।

এর ক’দিন পর ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার বার্ষিকী উপলক্ষে প্যাকেজ করার জন্য নিজের মোটরসাইকেলে নিয়ে গেলেন হাইমচরের কুদ্দুছ ও মতলব উত্তরের আতিকের বাড়িতে। শুধু তাই নয়, এরপর যখনি যেখানে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছি তখনি সেখানে নিয়ে গেছেন।

এছাড়া কারেন্ট নিউজের কোনো আইটেম কাউকে দিতে কখনো কার্পণ্য করেননি তিনি। অনেক প্যাকেজও দিয়েছেন সহকর্মীদের। আমার টেলিভিশন সাংবাদিকতার শুরুর দিকে তার আন্তরিকতা সহযোগিতা কখনো ভুলার নয়।

সহযোগী পত্রিকাগুলোতে নিউজ ও বিজ্ঞাপন বিনিময়েও তিনি ছিলেন অকৃপণ। চাঁদপুর প্রবাহের গত ১৯ বছরের পথচলায় অসংখ্য নিউজ ও তথ্য শেয়ার হয়েছে তার সাথে। সাংবাদিকদের বিপদে সবার আগে পাশে দাঁড়িয়েছেন তিনি।

ওয়ান-ইলেভেনের পর একটি নিউজ সংক্রান্ত বিষয়ে চাঁদপুর সেনা ক্যাম্পে ডাক পড়লে যখন কোনো সঙ্গী পাচ্ছিলাম না তখনো সঙ্গী ছিলেন ইকরাম ভাই। তার ম্যানেজিং পাওয়ার ছিল দারুণ। যে কোনো পরিস্তিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তার বিশেষ পারঙ্গমতা ছিল।

চাঁদপুরে এক সময় বি এম হান্নান ও আমার নেতৃত্বে আমরা জুনিয়র সংবাদকর্মীরা চাঁদপুর রিপোর্টার্স ইউনিটির সরব কমিটি গঠন করলে প্রেসক্লাবের অখন্ডতার বিষয়টি বিবেচনায় ইকরাম ভাই কিছুটা বিচলিত হয়েছিলেন।

কিন্তু পরবর্তীতে আমাদের কার্যক্রমে দারুণভাবে সহযোগিতা করেন তিনি। শুধু তাই নয়, রিপোর্ট ইউনিটির অধিকাংশ সদস্য চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সদস্য হওয়ার ক্ষেত্রে তার সহযোগিতা ছিল অনেক।

২০১৫ সালে আমি যখন চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাই তখন বছরজুড়ে উপদেশ, পরামর্শ, সমর্থন দিয়ে সহযোগিতা করেন ইকরাম ভাই। প্রায় প্রতি সপ্তাহে তিনি তখন প্রেসক্লাবে আসতেন। যে কোনো অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতিতে ধৈর্য্য ধরার পরামর্শ ও সাহস যোগাতেন। তখন তিনি স্যুপ খেতে খুব পছন্দ করতেন। তার উপলক্ষে সে বছর সবচেয়ে বেশি স্যুপ খাওয়া হয়েছিল আমার।

চাঁদপুর টেলিভিশন সাংবাদিক ফোরাম প্রতিষ্ঠায় ইকরাম ভাইয়ের পরামর্শ ও সহযোগিতা ছিল ব্যাপক। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন তার ছোট ভাই শরীফ চৌধুরী আর আমি ছিলাম প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক। পরবর্তীতে নেতৃত্বের পালাবদল হলেও তার সহযোগিতা বিন্দুমাত্র হ্রাস পায়নি। এই সংগঠনের আগাগোরা নেপথ্য কারিগর ছিলেন ইকরাম ভাই।

চাঁদপুরের সাংবাদিকদের ঐক্য প্রতিষ্ঠায় এবং প্রেসক্লাবে নতুন নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে ইকরাম ভাইয়ের আগ্রহ ছিল শেষ সময় পর্যন্ত। সব সময় তিনি সাংবাদিকদের ঐক্য রক্ষার চেষ্টা করেছেন। মৃত্যুর মাত্র এক সপ্তাহ আগে গত রোববারও প্রেসক্লাবের গঠনতন্ত্র উপ-কমিটির এক সভায় মোবাইল ফোনে প্রেসক্লাবের ঐক্য ও সমঝোতা রক্ষায় নিজের অভিমত ব্যক্ত করে গেছেন তিনি।

ইকরাম ভাই ছিলেন আমাদের সাংবাদিকদের জন্য বটবৃক্ষের মতো। নানা প্রতিক‚লতায় তিনি আমাদেরকে ছায়া দিয়েছেন, মায়া দিয়েছেন। কখনো শাসনের ছলে কখনো আন্তরিক ভালোবাসায়।

ইকরাম ভাই অসুস্থ হওয়ার পর তার চিকিৎসায় গঠিত তহবিলে চাঁদপুরের বিভিন্ন স্তরের মানুষের যে সহযোগিতা ও সুস্থতা কামনায় দোয়া লক্ষ্য করা গেছে তাতে স্পষ্ট তিনি মানুষের কতটা জনপ্রিয় ছিলেন। তার এই মৃত্যু আমাদের শোকাচ্ছন্ন করেছে। মহান আল্লাহর দরবারে ইকরাম ভাইয়ের রুহের মাগফিরাত কামনা করছি। হে আল্লাহ, আপনি আমাদের ইকরাম ভাইকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন- আমিন।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন