চাঁদপুরে করোনায় আক্রান্তের হার ১৮.৪৩% : মৃত্যুর হার ৩.১৩%

রহিম বাদশা :
চাঁদপুরে দ্বিতীয় দফায় করোনা রোগী শনাক্তের হার বৃদ্ধির পর বর্তমানে পরিস্থিতি অনেকটা স্থিতিশীল পর্যায়ে রয়েছে। আক্রান্তের হার কিছুটা কমলেও মৃত্যুর হার বেড়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী চাঁদপুরে করোনা শনাক্তের অষ্টম মাসে (৯ নভেম্বর-৯ ডিসেম্বর) করোনায় আক্রান্ত হিসেবে মোট শনাক্ত হয়েছেন ১২২জন, সপ্তম মাসে যেখানে আক্রান্ত ছিলেন ১৩৮জন। এর আগে ষষ্ঠ মাসে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ১৩৭জন, পঞ্চম মাসে শনাক্ত হয়েছিলেন ২৫৫জন। গত ৮ মাসে জেলায় নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় আক্রান্তের শতকরা হার ১৮.৪৩ ভাগ। আক্রান্ত হিসেবে শনাক্তকৃতদের মধ্যে মৃত্যুর শতকরা হার ৩.১৩ ভাগ।

জেলা স্বাস্ত্য বিভাগের তথ্য মতে, অষ্টম মাসে চাঁদপুরে করোনায় ৩জনের মৃত্যু হয়েছে। এর আগের তিন মাসে (৯ আগস্ট-৯ নভেম্বর) মৃত্যুর সংখ্যা ছিল প্রতি মাসে ১জন করে মোট ৩জন। মূলত মৃত্যুর সংখ্যা কমার সাথে সাথে জনমনে করোনা নিয়ে অসচেতনতা বেড়ে গেছে। যদিও শীতের তীব্রতা বাড়লে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

চাঁদপুর জেলায় করোনায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত ও লকডাউনের ৮ মাস পূর্ণ হয়েছে গত বুধবার (৯ ডিসেম্বর)। করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যু অব্যাহত থাকলেও জীবনযাত্রা এখন পুরোদস্তুর স্বাভাবিক। কেবলমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার প্রবণতাও খুব কম। তবে জেলাব্যাপী ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার কারণে মাস্ক ব্যবহার সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা বেড়েছে।

চাঁদপুর সিভিল সার্জন অফিসের হিসেব মতে, গত এক মাসে (৯ নভেম্বর-৯ ডিসেম্বর) জেলায় করোনামুক্ত হয়েছেন ১৪১জন, আগের মাসে করোনামুক্ত হয়েছিলেন ১৬১জন। গত ৮ মাসে ১৩ হাজার ৮৮৯জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ২ হাজার ৫৬১জনের রিপোর্ট করোনা পজেটিভ এসেছে। তবে অন্য জেলায় শনাক্ত হয়ে চাঁদপুর আসা রোগীসহ জেলায় মোট রোগীর সংখ্যা ২ হাজার ৫৮০জন। নমুনা পরীক্ষার বিবেচনায় আক্রান্তের শতকরা হার ১৮.৪৩ ভাগ। আর মোট রোগী হিসেবে আক্রান্তের শতকরা হার ১৮.৫৭ ভাগ। আক্রান্তদের মধ্যে এ যাবৎ (৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত) করোনামুক্ত হয়েছেন ২ হাজার ৪৩৯জন। এ পর্যন্ত মোট মারা গেছেন ৮১জন। করোনায় আক্রান্ত হিসেবে শনাক্তদের মধ্যে মৃত্যুর হার শতকরা ৩.১৩ ভাগ।

এছাড়া অনেকেই এখন করোনার উপসর্গ নিয়ে অসুস্থ অবস্থায় বাসা-বাড়িতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তারা নমুনা পরীক্ষা করাচ্ছেন না। এদের মধ্যে কেউ কেউ মারাও যাচ্ছেন। এসব অসুস্থ ও মৃত লোকজন করোনায় আক্রান্ত কিনা তা অজানাই থেকে যাচ্ছে। অধিকাংশ ক্সেত্রে উপসর্গে মৃতদের এখন আর নমুনা সংগ্রহ করা হয় না। ফলে করোনায় মৃতের প্রকৃত সংখ্যা জানাও অসম্ভব হয়ে পড়ছে।

অন্যদিকে পরিসংখ্যানের বাইরে দেশের বিভিন্ন জেলায় এবং বিদেশে চাঁদপুরের বহু লোক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। মারাও গেছেন অনেকে। বিক্ষিপ্তভাবে তাদের অনেকের তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও সঠিক পরিসংখ্যান এখনো সরকারি-বেসরকারি কোনো সূত্র জানাতে পারেনি।

বাংলাদেশে ৮ মার্চ প্রথম করোনায় আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হলেও চাঁদপুরে সন্দেহভাজন লোকদের নুমনা সংগ্রহ শুরু হয় ২৭ মার্চ। ওইদিন ঢাকার আইইডিসিআর থেকে বিশেষ টিম এসে চাঁদপুরের একজনের নমুনা সংগ্রহ করে। ২ এপ্রিল চাঁদপুর সিভিল সার্জন অফিসের তত্ত্বাবধানে চাঁদপুর জেলা থেকে নমুনা সংগ্রহ শুরু হয়। প্রথম দিনে চাঁদপুর সদর, হাইমচর, মতলব দক্ষিণ, ফরিদগঞ্জ ও হাজীগঞ্জ থেকে ২জন করে মোট ১০জনের নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

চাঁদপুরে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় ৯ এপ্রিল। তার নাম মোঃ সুজন (৩২)। নারায়ণগঞ্জ ফেরত এই যুবক অসুস্থ অবস্থায় মতলব উত্তরে তার শ্বশুর বাড়িতে আসার পর ৬ এপ্রিল নমুুনা দিয়েছিলেন। চিকিৎসার পর তিনি এখন সুস্থ।

প্রথম শনাক্তকৃত করোনা রোগী সুজনের নমুনা টেস্টের পজেটিভ রিপোর্ট আসার দিনেই (৯ এপ্রিল) চাঁদপুর জেলা লকডাউন ঘোষণা করেন জেলা প্রশাসক। ওইদিন সন্ধ্যায় এই লকডাউন কার্যকর শুরু হয়। সরকারের কেন্দ্রীয় নির্দেশনার আলোকে পরে তা শিথিল হয়। বাস্তবে না থাকলেও কাগজ-কলমে এখনো লকডাউন আছে নাকি প্রত্যাহার হয়েছে- এ বিষয়টি স্পষ্ট করেনি প্রশাসন।

চাঁদপুরে করোনায় প্রথম মৃত্যুর ঘটনা ঘটে ১১ এপ্রিল চাঁদপুর সদর উপজেলার রামপুর ইউনিয়নের কামরাঙ্গা এলাকায়। তিনিও নারায়ণগঞ্জ ফেরত। শ্বশুর বাড়িতে করোনার উপসর্গ নিয়ে তিনি মারা যান। খবর পেয়ে চাঁদপুর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ তার নমুনা সংগ্রহ করে। ১৫ এপ্রিল তার নমুনা টেস্টের রিপোর্ট আসে করোনা পজেটিভ। এরপর তার শ্বশুর ও এক শ্যালিকা করোনায় আক্রান্ত হন। শ্যালিকা সুস্থ হয়েছেন। আর শ্বশুর করোনা থেকে সুস্থ হয়ে পরবর্তীতে মারা যান।

চাঁদপুরে করোনার আগমন ও সংক্রমণের বাহক হিসেবে স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ ফেরত লোকদের চিহ্নিত করেছে। প্রথম পর্যায়ে বিদেশ ফেরত লোকদের সন্দেহের শীর্ষে রাখা হলেও এখন পর্যন্ত জেলায় একজন বিদেশ ফেরত লোকেরও করোনা শনাক্ত হয়নি। চিকিৎসকদের মতে, সারা জেলায় দীর্ঘদিন ধরেই করোনার কমিউনিটি ট্রান্সমিশন চলছে। তবে বর্তমানে চাঁদপুরে করোনা পরিস্থিতি স্থিতিশীল পর্যায়ে রয়েছে।

সিভিল সার্জন ডা. সাখাওয়াত উল­াহ এ প্রতিনিধিকে জানান, ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত করোনায় আক্রান্তদের মধ্যে চিকিৎসাধীন ছিলেন ৬০জন। ওইদিন পর্যন্ত আইসোলেশনে ভর্তিকৃত রোগীর সংখ্যা ১৫৫৭জন। এর মধ্যে ইতিমধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছেন ১৫৫১জন। আইসোলেশনে ভর্তিকৃত রোগীর সংখ্যা ৬জন। তিনি জানান, চাঁদপুরে করোনায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা মাঝখানে কমে আসলেও দ্বিতীয় দফায় আবার তা বেড়েছে। অতি সম্প্রতি মৃত্যুর হারও বেড়ে গেছে। গত এক মাসে করোনায় আক্রান্ত ৩জন মারা গেছেন, এর আগে ৩ মাসে মারা গেছেন ৩জন।

তিনি জানান, ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত চাঁদপুর জেলায় বর্তমানে করোনায় আক্রান্ত ২৫৮০জনের উপজেলাভিত্তিক পরিসংখ্যান হলো : চাঁদপুর সদরে ১০৮৯জন, ফরিদগঞ্জে ২৮৯জন, মতলব দক্ষিণে ২৮৫জন, শাহরাস্তিতে ২৪১জন, হাজীগঞ্জে ২২০জন, মতলব উত্তরে ২০০জন, হাইমচরে ১৬৮জন ও কচুয়ায় ৮৮জন।

করোনায় জেলায় মোট ৮১জন মৃতের উপজেলাভিত্তিক পরিসংখ্যান হলো : চাঁদপুর সদরে ২৪জন, হাজীগঞ্জে ১৭জন, ফরিদগঞ্জে ১২জন, মতলব উত্তরের ১০জন, শাহরাস্তিতে ৭জন, কচুয়ায় ৬জন, মতলব দক্ষিণে ৪জন ও হাইমচরে ১জন।

সিভিল সার্জন বলেন, করোনা থেকে রক্ষায় আমাদের সবাইকে আরো সচেতন হতে হবে। নইলে যে কোনো সময় পরিস্থিতি আবার ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা তথা নিয়মিত ঘরের বাইরে মাস্ক ব্যবহার ও সামাজিক দূরত্ব মেনে চলতে হবে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন