চাঁদপুর আড়তে ইলিশের আমদানী বাড়লেও দাম কমেনি

তালহা জুবায়ের/শরীফুল ইসলাম :
মৌসুমের শেষ দিকে ইলিশের সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে চাঁদপুর বড়স্টেশন মাছ ঘাটে। স্থানীয় পদ্মা- মেঘনায় কম ধরা পড়লেও দক্ষিণাঞ্চলের প্রচুর ইলিশ সরবরা হচ্ছে চাঁদপুরে। তবে মাছের দাম না কমায় হতাশ ক্রেতারা। বিক্রেতারা বলছেন, ভারতে ইলিশ রপ্তানীর সিদ্ধান্তে চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় দাম কিছুটা চওড়া।

মৌসুমের শেষ সময়ে ইলিশের সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে চাঁদপুর মাছ ঘাটে। সেপ্টেম্বরের ভরা পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে দক্ষিণাঞ্চল ও সমুদ্র উপকূলের জেলেদের জালে ধরা পড়ছে ঝাঁকে ঝাঁকে রুপালী ইলিশ। জেলেরা এসব ইলিশ নৌকা ও ট্রাকে করে বিক্রির উদ্দেশ্যে নিয়ে আসছে দেশের অন্যতম বড় ইলিশের পাইকারি বাজার চাঁদপুর বড়স্টেশন মাছ ঘাটে। বাজারে ইলিশের আমদানী বৃদ্ধি পাওয়ায় কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের মাঝে।

বুধবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সরেজমিন বড়স্টেশন মাছঘাটে গিয়ে দেখা যায়, ডাকাতিয়া নদীতে ভিড়ানো রয়েছে ৮ থেকে ১০টি সমুদ্র উপক‚লের ফিসিং বোট (নৌকা)। মাছ ভর্তি এসব নৌকা থেকে মাছ নামিয়ে বাজারে নিয়ে যাচ্ছেন শ্রমিকরা। তাছাড়া ট্রাক ভোজাই করেও ইলিশ নিয়ে আসা হয়েছে দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে। আজ সারা দিনে প্রায় ৪ হাজার মণ ইলিশ বেচাকেনা হয়েছে এই বাজারে।

ইলিশ ব্যবসায়ী সম্রাট বেপারী বলেন, বরিশাল, ভোলা, লক্ষ্মীপুর, আলেকজান্ডার, সন্দীপ, হাতিয়াসহ দেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে ইলিশ বেশি আমদানী হচ্ছে। বর্তমানে মাছঘাটে ৩ থেকে সাড়ে ৩হাজার মণ ইলিশ সরবরাহ হচ্ছে। এর মধ্যে স্থানীয় পদ্মা-মেঘনা নদীর ইলিশ সরবরাহ হচ্ছে ৪শ’ থেকে ৫শ’ মণ।

আরেক ইলিশ ব্যবসায়ী বিপ্লব খান বলেন, বর্তমানে স্থানীয় পদ্মা-মেঘনা নদীর ৫শ’ থেকে ৭শ’ গ্রাম ওজনের ইলিশ কেজি প্রতি ৭ থেকে সাড়ে ৭শ’ টাকা, ৭শ’ থেকে ৯শ’ গ্রামের ইলিশ কেজি প্রতি ৯শ’ থেকে সাড়ে ৯শ’ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তাছাড়া ১হাজার থেকে ১২শ’ গ্রাম ওজনের ইলিশ সাড়ে ১২শ’ থেকে ১৩শ’ টাকা এবং ১৫শ’ থেকে ১৮শ’ গ্রামের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১৪শ’ থেকে ১৫শ’ টাকা কেজি দরে। সমুদ্র ও দক্ষিণাঞ্চলের নদীর ইলিশ প্রকার ভেদে ১শ’ থেকে ২শ’ টাকা কম দরে বিক্রি করা হচ্ছে।

বর্তমানে বাজারে ইলিশের সরবরাহ বৃদ্ধি পেলেও মাছের দাম না কমায় হতাশ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ক্রেতারা। ইলিশের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে থাকায় ইলিশের স্বাদ নিতে পারছেন না নিম্ন আয়ের মানুষেরা।

ইলিশ কিনতে আসা কুমিল্লা জেলার মো. আশিকুর রহমান বলেন, চাঁদপুর ইলিশের জন্য বিখ্যাত। তাই প্রতি বছরই মৌসুমে ইলিশ কিনতে এখানে আসি। কিন্তু আজকে দেখলাম দাম দেড় থেকে দুইশ টাকা বেশি চাচ্ছে কেজি প্রতি। বাজারে ইলিশ সরবরাহ বেশি থাকলেও দাম কমেনি। বরচং অন্যান্য বছরের তুলনায় অনেক বেশি।

স্থানীয় গনি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক নাজির আহমেদ বাদল বলেন, আমি ৬শ’-৭শ’ গ্রাম ওজনের ইলিশ কিনেছি ৫শ’ ৭০টাকা কেজি দরে। অন্যান্য বছর এই সাইজের মাছ সাড়ে ৪শ’ থেকে ৫শ’ টাকা কেজি দরে কিনেছি। এবছর দাম অনেক বেশি।

গত বছর এই সময়ে ৫শ’ থেকে ৬শ’ গ্রাম ওজনের ইলিশ কেজি প্রতি ৫শ’ টাকা, ৭শ’ থেকে ৯শ’ গ্রামের ইলিশ কেজি প্রতি ৬শ’ থেকে সাড়ে ৬শ’ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তাছাড়া ১ কেজি সাইজের ইলিশ সাড়ে ৭শ’ থেকে সাড়ে ৭শ’ টাকা এবং দেড় কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার টাকা দরে। স্থানীয় নদীর ইলিশ প্রকার ভেদে ৫০ টাকা থেকে ১শ’ টাকা বেশি দরে বিক্রি করা হচ্ছে।

চাঁদপুর কান্ট্রি বোট ফিসিং মালিক সমিতির সভাপতি মো. শাহ আলম মল্লিক বলেন, চাঁদপুরের নদীতে মৌসুমের অন্যান্য সময়ের চেয়ে ইলিশ কিছুটা বেশি ধরা পড়ছে। তবে তা বিগত বছরের তুলনায় অনেক কম। যে পরিমানে মাছ জেলেদের জালে উঠে আসছে তাতে করে লাভের মুখ দেখছে না তারা। কোনমতে নৌকার খচর তুলতে পারছে তারা। এতে করে পরিবার পরিজন নিয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে তাদের। আগামী মাসেই মা ইলিশের অভিযান দিলে মহা বিপাকে পড়তে হবে জেলেদের।

চাঁদপুর মৎস্য বণিক সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শবে বরাত বলেন, ভরা পূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে দক্ষিণাঞ্চলের জেলেদের জালে মাছ উঠছে ভালো। এরফলে চাঁদপুর মাছঘাটেও সরবরাহ বৃদ্ধি পেয়েছে ইলিশের। তবেন ভারতে ইলিশ রপ্তানীর ঘোষণার পর থেকে বড় ইলিশের দাম কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই মৌসুমে ইলিশের দাম আর না কমার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান এই মৎস্য ব্যবসায়ী নেতা।

চাঁদপুর সদর উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা সুদীপ ভট্টাচার্য বলেন, বর্তমানে প্রচুর পরিমানে অনলাইনে ইলিশ কেনা বেচা হচ্ছে। যার ফলে ইলিশের চাহিদা আগের তুলনায় অনেক বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। তাছাড়া ভারতে ইলিশ রপ্তানীর প্রভাবে ইলিশের দাম কিছুটা বেশি। তবে আমরা আশা করছি সামনে ইলিশের সরবরাহ আরো বৃদ্ধি পাবে এবং দামও ক্রেতা সাধারণের নাগালের মধ্যে চলে আসবে।

মাছঘাটে ইলিশ কিনতে আসা জামাল হোসেন বলেন, কয়েকদিন ধরে শুধু দেখছি ইলিশ আর ইলিশ। সেই জন্য ইলিশ কিনতে ঘাটে আসলাম। এসে অবাক হলাম। প্রচুর ইলিশ থাকা সত্তে¡ও দাম কমেনি। তাহলে আমাদানি বেড়ে আমাদের লাভ কি। ব্যবসায়ীদের জন্য আমরা মাছ কিনে নিতে পারছি না।

নোয়াখালী থেকে বড়স্টেশন মাছঘাটে আসা অনলাইনে ইলিশ ব্যবসায়ী মো. সরোয়ার হোসেন বলেন, ক্রেতাদের কাছে ইলিশের প্রচুর চাহিদা রয়েছে। দাম বেশি থাকায় আমাদেরকেও অনলাইনে বেশি বিক্রি করতে হয়। ঘাটে পর্যাপ্ত ইলিশ আছে, তবে দাম নাগালের বাইরে। সরকারের প্রতি অনুরোধ, যাতে ইলিশের দামের বিষয়ে একটু নজরদারি করে।

চাঁদপুর জেলা মৎস্য র্কমকর্তা গোলাম মেহেদী হাসান বলেন, অক্টোবরের যে কান সময় মা ইলিশ রক্ষা অভিযান শুরু হবে। যার কারনে জেলেরা পুরোদমে ইলিশ শিকারে ব্যস্ত রয়েছে। গত বছর ২২ অক্টোবর থেকে ২২দিন ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ ছিল। এবার এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি কবে থেকে অভিযান শুরু হবে। তবে ২০ তারিখ পূর্ণিমা, যার কারনে ২০ তারিখের আগেও মা ইলিশ রক্ষা অভিযান শুরু হতে পারে।

চাঁদপুর মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমান বলেন, অমাবস্যা ও পূর্ণিমা ঘিরে ইলিশ লোনাপানি থেকে মিঠা পানিতে বিচরণ করে। এই সময়টাতে ইলিশ খাদ্য সংগ্রহ এবং ডিম ছাড়ার লক্ষে নদী অঞ্চলে যাতায়াত শুরু করে। যার কারনে এখন ইলিশের আমদানি বেড়েছে। সেপ্টেম্বর থেকে শুরু করে অক্টোবর পর্যন্ত ইলিশ মিটা পানিতে বিচরণ করবে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।