চাঁদপুর-ফরিদগঞ্জ-রায়পুর সড়কে লাশের মিছিল!

ঋষিকেশ :
চাঁদপুর-ফরিদগঞ্জ-রায়পুর সড়কে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটছে। ওই সড়কে যেন লাশের মিছিল লেগেছে! মৃত্যুর পরিসংখ্যান দীর্ঘ থেকে আরো দীর্ঘ হচ্ছে। ফরিদগঞ্জের বাতাস ভারী হয়ে উঠছে চলে যাওয়া স্বজনদের দীর্ঘশ^াসে। তারপরও সবাই নীরব! যেন এটা স্বাভাবিক!

বৈশ্বিক মহামারী করোনা ভাইরাসে ফরিদগঞ্জে যত লোক মারা গেছে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশী মারা গেছে সড়ক দুর্ঘটনায়। ভাইরাস নিয়ে যত আলোচনা, যত আয়োজন তার ছিটেফোটাও নেই সড়ককে নিরাপদ করতে। জনমনে প্রশ্ন- আর কত লাশ পড়লে জেগে উঠবো আমরা, আর কত লাশ পড়লে টনক নড়বে প্রশাসনের?
ফরিদগঞ্জে কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে পৃথক তিনটি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে জহিরুল ইসলাম (৩৫) নামের এক পথচারী নিহত হয়েছেন।

এছাড়া পিকআপ ও সিএনজি অটোরিক্সার মুখোমুখি সংঘর্ষে সিএনজি অটোরিক্সার যাত্রী ইসমাইল (৫৬) ও মোঃ আলী (৫৫) ও সিএনজি অটোরিক্সাচালকসহ ৩জন আহত হন। অপরদিকে একই সড়কের ধানুয়া এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি প্রাইভেট কার পুকুরে পড়ে গেলেও সেখানে কেউ আহত হয়নি। ৭ ডিসেম্বর সোমবার সকালে উপজেলার চাঁদপুর-ফরিদগঞ্জ-রায়পুর সড়কের বড়ালি, চতুরা ও ধানুয়া এলাকায় এসব দুর্ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় লোকজন জানান, সোমবার ভোরে চাঁদপুর-ফরিদগঞ্জ-রায়পুর সড়কের চতুরা এলাকায় একটি দ্রুতগামী একটি পিকআপ রাস্তার পাশের পথচারী জহিরুল ইসলামকে চাপা দেয়। আশপাশের লোকজন তাকে দ্রুত চাঁদপুর সদর হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করে।

অন্যদিকে বড়ালি এলাকায় সকালে সাড়ে ৬টার দিকে একটি দ্রুতগামী পিকআপ বিপরীত দিক থেকে আসা সিএনজি অটোরিক্সার সাথে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে চালকসহ ৩জন আহত হয়। আহতদের মধ্যে পাশ্ববর্তী রায়পুর উপজেলার ইসমাইল (৫৬) ও মোঃ আলী (৫৫) নামে দুইজন ফরিদগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা গ্রহণ করে। তবে আহত সিএনজি অটোরিক্সা চালকের সন্ধান পাওয়া যায়নি। এছাড়া সকাল সোয়া ৮টায় একই সড়কের ধানুয়া এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি প্রাইভেট কার পুকুরে পড়ে যায়। তবে সেখানে কেউ আহত হয়নি। সংবাদ পেয়ে পুলিশ প্রাইভেট কারটি উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে।

গত ৪ দিনের ব্যবধানে ৭টি তাজা প্রাণ ঝরে গেলে। ধানুয়া থেকে নারিকেলতলা। এই সড়কটুকুর মধ্যে কী আছে? এটুকু সড়ক যেন মৃত্যু ফাঁদ। উপজেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর পরিসংখ্যানে দেখা যায় প্রায় ৯৫ শতাংশ মৃত্যু এ টুকু জায়গাতেই হচ্ছে। বিশেষ করে চাঁদপুর লক্ষীপুর আঞ্চলিক মহাসড়কের ধানুয়া এবং উপজেলা সদরের টিএন্ডটি মোড় এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনার অলিখিত নির্ধারিত স্থানে পরিণত হয়েছে। কেন এখানে এতো ঘন ঘন সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে কেউ বলতে পারছে না। হয়তো গভীর ভাবে সড়ক বিভাগ এবং এলজিআরডি বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে ভাবলে সমস্যার সামাধান বেরিয়ে আসবে। সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের জীবনে বড় একটি অভিশাপ। কারণ একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না। সড়ক দুর্ঘটনায় যে চলে যায় হয়তো সে বেঁচে যায় কিন্তু যে পঙ্গু হয়ে যায় তাকে আমৃত্যু সে কষ্ট সাথে করে বয়ে বেড়াতে হয়।

এ সড়কে শুধু শুধু দুর্ঘটনা ঘটছে না। এর রয়েছে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ। শুধুমাত্র পথচারী এবং চালকদের সচেতন হলেই চলবে না। সড়ককে নিরাপদ রাখতে পুলিশ প্রশাসন, সড়ক ও জনপথ বিভাগ, এলজিআরডি, বিটিআরসিসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে স্বচ্ছতারসহিত এগিয়ে আসতে হবে। শুধুমাত্র দু’একটি বিভাগ কাজ করলে সড়ককে শতভাগ নিরাপদ করা সম্ভব নয়। যে হারে এ সড়কে প্রাণ ঝরছে এটাকে ঠিক দুর্ঘটনা বলা যায় না। এটা একটি পরিকল্পিত হত্যা কান্ড। কারণ যথাযথ বিভাগ তাদের শতভাগ দায়িত্ব সততার সহিত পালন করছেন না বিধায় এ রকম নিহতের ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটে চলছে।

চাঁদপুর আঞ্চলিক মহাসড়কে বিগত যে কোনো সময়ের তুলনায় যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। সে তুলনায় রাস্তাটি প্রশস্ত করা হয়নি। অভ্যন্তরীন যানবাহনের সাথে তাল মিলিয়ে বাড়ছে দূরপাল্লার গাড়ির সংখ্যা। পথচারীদের জন্য কোনো অংশ রাখা হয়নি। ইদানিং বিদ্যুৎচালিত অটোরিক্সার সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। এ রিক্সাগুলোও নিজের খেয়াল খুশিমত মহাসড়কে অবাধে চলাচল করছে।

এ গাড়িটি চালানোর জন্য চালককে যেমন প্রশিক্ষণ নিতে হয় না তেমনি প্রয়োজন হয় না কোনো অনুমোদনের। শুধুমাত্র পৌরসভার মেয়রের সম্মতি থাকলেই চলে। এ সড়কটির জন্য গতিসীমা নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত। সেই সাথে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণও করতে হবে। পরিকল্পিতভাবে সড়কগুলোর পুনঃনির্মান করা করা উচিত। সড়কের বাঁকগুলো সোজা করতে হবে। পর্যাপ্ত পরিমানে স্পিড ব্রেকার দিতে হবে।

এছাড়া স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা, হাসপাতাল এবং শাখা রাস্তার পাশে প্রয়োজনীয়ও জেব্রা ক্রসিং দিতে হবে। মহাসড়কের পাশ থেকে হাট-বাজারগুলোকে সরিয়ে পেলা উচিত। নির্দিষ্ট অঞ্চলের জনসংখ্যার আনুপাতিকহারে গাড়ির সংখ্যা নির্ধারণ করা। অটোরিক্সা ও সিএনজি স্কুটারের পরিবর্তে অধিক আসন সংখ্যা বিশিষ্ট গাড়ির অনুমোদন দেওয়া। চালকের ছাড়পত্র এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ছাড়া কোনো চালকের হাতে চাবি দেওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে হবে। একটি গাড়ির বয়স নির্ধারণ করে দেওয়া। ঐ সময়ের পর গাড়িটি রাস্তায় দেখলে জেল জরিমানার ব্যবস্থা করতে হবে।

গাড়ি চলা অবস্থায় চালকের মোবাইলে কথা বলা আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে। সেই সাথে ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন করা যাবে না। সিএনজি স্কুটারে চালকের দু’পাশে যাত্রী বসানো নিষিদ্ধ করতে হবে। দক্ষ চালকদের ছাড়পত্র সংগ্রহে যথাযথ বিভাগকে আন্তরিক হতে হবে। এতে জটিলতা পরিহার করে এবং দুর্নীতিমুক্ত হয়ে দক্ষ চালকদের দ্রæত সময়ের মধ্যে ছাড়পত্র দিতে হবে। সিএনজি স্কুটারসহ অন্যান্য যানবাহন থেকে পুলিশি চাঁদা বন্ধ করতে হবে (চালকদের অভিযোগের ভিত্তিতে)। থানাকে মাসোয়ারা দিতে হয় এটা এখন ওপেন সিক্রেট। মোটর সাইকেল কোনো যাত্রীবহন করে না।

তারপরও বিভিন্ন সময় এ বাহন এবং এর চালকের বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে চালকের লাইসেন্স চাওয়া হয়। অথচ অটোরিক্সা এবং সিএনজি স্কুটার যাত্রী পরিবহন করে কিন্তু তাদের ড্রাইভিং লাইসেন্স চাওয়া হয়েছে এরকম নজির তেমন একটা চোখে পড়ে না। অথচ থানা পুলিশ প্রচার করছে ‘মুজিব বর্ষের অঙ্গীকার, পুলিশ হবে জনতার’। এসব অপসংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। ফরিদগঞ্জ থানার নবাগত বর্তমান ওসি অন্যদের থেকে ব্যতিক্রম। আশাকরি তিনি গতানুগতি প্রথা থেকে বেরিয়ে আসতে পারবেন। যেমনটি খুব ভালো ভাবেই পেরেছেন চাঁদপুর জেলার সাবেক পুলিশ সুপার শামছুন নাহার। সর্বোপরি বলবো- যুগোপযোগী সড়ক আইন করতে হবে এবং তার প্রয়োগ ঘটাতে হবে।

সমাজবিজ্ঞানীদের দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, যুগোপযোগী আইনের অভাব, অপরিকল্পিত সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণ, সড়ক-মহাসড়কগুলোর পাশে হাট-বাজার, পর্যাপ্ত ট্রাফিক ব্যবস্থার অভাব, অদক্ষ চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানো, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ব্যবহার, ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন, হেলপার দিয়ে গাড়ি চালানো ও চলন্ত অবস্থায় মোবাইল ফোনে কথা বলা ইত্যাদি বিভিন্ন কারণে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন