নৌ-ভ্রমণে যে কারণে জনপ্রিয় চাঁদপুর

শরীফুল ইসলাম :
চাঁদপুরের বিলাস বহুল লঞ্চ ভ্রমণ মানুষের মাঝে খুবই জনুপ্রিয় হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন চাঁদপুর থেকে টাকা এবং ঢাকা থেকে চাঁদপুরের উদ্দ্যেশে হাজার হাজার মানুষ ভ্রমণ করেন। যাতায়াত ব্যবস্থা ভালো থাকা এবং সাশ্রয়ী ভাড়া হওয়ায় লঞ্চ ভ্রমণে ঝুঁকছেন যাত্রীরা। শুধু তাই নয়, পণ্য ও মালামান পাঠানা এবং আনার ক্ষেত্রে লঞ্চ পরিবহনকে ব্যবহার করছেন ব্যবসায়ীরা।

চাঁদপুর এমনিতেই নদীমাত্রিক দেশ। তাই চাঁদপুরের অধিকাংশ মানুষ লঞ্চ ভ্রমণ খুবই পছন্দ করেন। চাঁদপুরের বহু মানুষ ব্যবসা, চাকরী, শিক্ষা, ভ্রমণ ও নানা বিধ কাজের উদ্দ্যেশে রাজধানী শহর ঢাকাতে আসেন। শুধু চাঁদপুর নয়, আশ পাশের কয়েকটি জেলার মানুষও চাঁদপুর এসে লঞ্চ করে কর্মক্ষেত্রে যান।

বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে ভালো লঞ্চ সেবা রয়েছে। তবে চাঁদপুর-ঢাকা লঞ্চ সেবা অত্যন্ত চমৎকার। এই রুটের লঞ্চ ভ্রমণ বেশির ভাগ লঞ্চ ব্যক্তিগত এবং যাত্রীদের প্রয়োজন সম্মত সুযোগ সুবিধা রয়েছে। লঞ্চগুলির বেশির ভাগ এসি, উন্নয়ত টয়লেট, প্রথম ও অন্যান্য শ্রেনী রয়েছে। যাত্রীরা চাইলে লঞ্চের আগাম টিকিট বুকিং লঞ্চগুলিতে যাওয়ার আগে টিকিট কাটার ব্যবস্থা রয়েছে।

চাঁদপুর-ঢাকা রুটে ২৪ লঞ্চ চলাচল করে। এছাড়া নারায়নগঞ্জ রুটে করে আরও ১৩টি। চাঁদপুরে বিভিন্ন অঞ্চলের লঞ্চসহ সর্বমোট ৮০টি লঞ্চ চাঁদপুর ঘাটে আসা যাওয়া করে। চাঁদপুর-ঢাকা এবং ঢাকা থেকে চাঁদপুরে আসার জন্য ভোর ৬টা থেকে রাত সাড়ে ১২টা পর্যন্ত লঞ্চ টার্মিনালে লঞ্চে যাতায়াত সুবিধা রয়েছে। ডেকের ভাড়া ১১৫ টাকা, নন এসি চেয়ারে ভাড়া ১৮০ টাকা, বিজনেস ক্লাস এসি চেয়ারের ভাড়া ৩০০ টাকা, নন এসি সিঙ্গেল কেবিনের ভাড়া ৫০০ টাকা, এসি সিঙ্গেল কেবিনের ভাড়া ৬০০ টাকা, নন এসি ডাবল কেবিনের ভাড়া ১০০০ টাকা, এসি ডাবল কেবিনের ভাড়া ১২০০ টাকা, নন এসি মিনি ভিইপি কেবিন ১৮০০ টাকা, ফ্যামেলি কেবিন ১৫০০ টাকা, ভিআইপি কেবিন ২২০০ টাকা, সিআইপি কেবিন ২৫০০ টাকা।

চাঁদপুর থেকে যেসব লঞ্চ ঢাকার উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায় : ভোর ৬টায় রফ রফ-৬ (যোগাযোগ- ০১৮১৮০০২০২৯), সকাল ৭.২০ এমভি সোনার তরী-৩, (যোগাযোগ ০১৭১৬৫০১০৭৭), সকাল ৮টায় ঈগল-৭ (যোগাযোগ ০১৯৬৮৪১৯১০২), সকাল সাড়ে ৮টায় আসা যাওয়া-১, সকাল ৯টায় ঈগল-৩ (যোগাযোগ ০১৮৮৯৮০৫২৮৩), সকাল সাড়ে ৯টায় আল বোরাক (যোগাযোগ ০১৮১৮০০২০২৯) সকাল ১০টা ২০ মিনিটে মিতালি-৫ (যোগাযোগ ০১৭২১৬৫৯৯৫০), সকাল ১০টা ২০ মিনিটে বোগদাদিয়া-৯ (যোগাযোগ ০১৭২৮৫৯০৮৪১), বেলা ১১টায় জামাল-২ (যোগাযোগ ০১৮১৮০০২০২৯), দুপুর ১২টায় রফ রফ-২ (যোগাযোগ ০১৮১৮০০২০২৯), দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে শরিয়তপুর-১, দুপুর ১টায় এভি জম জম (যোগাযোগ ০১৩১৬৩৩০৩৯০), দুপুর দেড়টায় সোনার তরী-৫ (যোগাযোগ ০১৭১৬৫০১০৭৭), দুপুর ২টায় ইামাম হাসান-৫ (যোগাযোগ ০১৭১১০০৮৭৭৭), বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে সোনার তরী-২ (যোগাযোগ ০১৭৩৫৪২৭৮০২), বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে বোগদাদিয়া-৮ (যোগাযোগ ০১৭১১০০৮৭৭৭), বিকেল ৫টায় বোগদাদিয়া-৭ (যোগাযোগ ০১৭১২৮২৫৩৭) সন্ধ্যা ৬টায় ইমাম হাসান-৭ (যোগাযোগ ০১৭৯৯৪৯৪২৯৬), সন্ধ্যা ৭টায় ইমাম হাসান (যোগাযোগ ০১৭১১০০৮৭৭৭), রাত ১০টায় মিতালি-৭ (যোগাযোগ ০১৮১৮০০২০২৯), রাত সাড়ে ১১টায় ইমাম হাসান-২ (যোগাযোগ ০১৭১১০০৮৭৭৭), রাত সাড়ে ১১টা ২০ মিনিটে জম জম-১ (যোগাযোগ ০১৭১১০০৮৭৭৭), (যোগাযোগ ০১৭২৪৭৬৬৭২০) রাত ১২টা ১৫ মিনিটে ময়ূর-৭ (যোগাযোগ ০১৭৫৯৯৪৪১৪৪) এবং সব শেষ রাত সাড়ে ১২টায় ময়ূর-২ (যোগাযোগ ০১৮৩৯১০৩৭৪৬)।

তবে এসব লঞ্চ চলাচলের সিডিউল বিভিন্ন সময় পরিবর্তন হয়ে থাকে। এসব রুটে কয়েক ধরনের লঞ্চ রয়েছে। এগুলো ১ তলা, ২ তলা ও ৩ তলা বিশিষ্ট হয়ে থাকে। কোন কোন লঞ্চে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আছে, আবার কোন লঞ্চে নেই। পাশাপাশি এটাচ বাথরুম রয়েছে। এছাড়া ফ্লাট-স্ক্রিন টিভি, সিঙ্গেল ও ডাবল কেবিন, স্টেশনারি শপ, কফি শপ ছাদে বসার স্থান ও নামাজের স্থানসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা রয়েছে। লঞ্চে নিরাপত্তার জন্য আনসার বাহিনী রয়েছে। নিরাপত্তা বিঘিœত হলে লঞ্চ কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ করতে পারেন।

এ প্রসঙ্গে লঞ্চ মালিক প্রতিনিধি বিপ্লব সরকার বলেন, চাঁদপুর লঞ্চঘাটটি দেশের মধ্যে অন্যদম একটি নদী বন্দর। এ ঘাট দিয়ে চাঁদপুর জেলাসহ পাশ^বর্তী জেলার মানুষও যাতায়াত করে। লঞ্চ জার্নি আরামদায়ক, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ হওয়ার কারনে মানুষ লঞ্চে বেশি যাতায়াত করে। আমরা লঞ্চ মালিক কর্তৃপক্ষ সব সময় চেষ্টা করি, যাত্রীদের সর্বোচ্চ সেবা এবং সর্বোচ্চ নিরাপত্তা প্রদান করতে। যাত্রী সেবায় আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।

লঞ্চের যাত্রী সোহাগী আক্তার ও মাসুম হোসাইন বলেন, সব থেকে আনন্দময় ভ্রমণ হচ্ছে লঞ্চ ভ্রমণ। লঞ্চে হাটাচলা থেকে শুরু করে প্রকৃতিক সুন্দর্য উপভোক করে সময় কাটানো যায়। যার যেই রকম সাধ্য আছে, সে তার মতই করে লঞ্চের আসন সংগ্রহ করে ভ্রমন করে। আগের তুলনায় লঞ্চের ডেকারেশন অনেক আপডেট হয়েছে। যদিও লঞ্চ টার্মিণালের অবকাঠামো উন্নয়ন হয়নি। এখানে লঞ্চের অপেক্ষা করার জন্য কোন যাত্রী ছাউনি নেই। এছাড়া ঘাটের পল্টুন খুব নড়বড়ে। এখানে আধুনিক নৌ নার্মিনাল হলে চাঁদপুর লঞ্চঘাটের চিত্র পাল্টে যাবে। বিশেষ করে প্রতিবন্ধি, শিক্ষার্থী ও বয়স্ক লোকদের জন্য জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা চালু করা প্রয়োজন।

চাঁদপুর নদী বন্দরের পরিবহন পরিদর্শক মো. রেজাউল করিম সুমন বলেন, চাঁদপুর লঞ্চঘাটটি একটি বধ্যবর্তি স্টেশন। যার কারনে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষের যাতায়াত করে থাকে। চাঁদপুর নদী বন্দরের উন্নয়নের জন্য ওয়াল্ড ব্যাংকের একটি প্রজেক্ট রয়েছে। টেন্ডার প্রক্রিয়াধিন রয়েছে, কুব শিগ্রই নদী বন্দরের কাজ শুরু হবে। যাত্রীদের জন্য আমরা যুতটুকু সম্ভব সেবা দিচ্ছে যাচ্ছি। আমাদের পাশাপাশি নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ড ও জেলা প্রশাসন কাজ করে যাচ্ছে। আমরা নৌযান ঝুঁকি এড়িয়ে চলতে, আমরা মাস্টারদেকে সতর্ক করে থাকি। একজন যাত্রীরও যেন কোন সমস্যা না হয়, তার জন্য আমরা সচেষ্টা রয়েছি।

এ বিষয়ে চাঁদপুর নৌ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, বিআইডব্লিউটিএ’র দ্বারা পরিচালিত চাঁদপুর লঞ্চ ঘাট। দেশের কয়েকটি ঘাটের মধ্যে চাঁদপুর লঞ্চ ঘাটটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে প্রায় ২৪ ঘন্টাই লঞ্চ চলাচল করে। চাঁদপুর ইলিশের শহর হওয়ায়, লঞ্চে করে বিভিন্ন স্থান থেকে হাজার হাজার মানুষ চাঁদপুরে ঘুরতে আসে। যাত্রীদের নিরাপত্তায় নৌ পুলিশ সর্বদা লঞ্চঘাটে নিয়োজিত রয়েছে। এছাড়া যাত্রীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে আমরা লঞ্চের প্রতি ব্যবস্থা নিয়ে থাকি। যাত্রীরা যাতে নির্বিগ্নে বাড়ি পৌঁছতে পারে, তার জন্য সর্বাত্মক সহযোগিতা আমাদের থাকবে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন