বিশেষ কলাম : কিছু কথা আছে বলা দরকার

মুহম্মদ শফিকুর রহমান :
বেশ আগে লিখেছিলাম, আজি হতে শতবর্ষ পরে বাংলার নদীতীরের কাশবনে বসে যে কবি কবিতা লিখবেন, সামনে ভেসে উঠবে বিশাল ছবি এবং সে ছবির মানুষটি হবেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজ আবার লিখছি, সেই ছবিটির পাশে আরেকটি মুখ ভেসে উঠবে এবং সে মুখ দেশরত্ন শেখ হাসিনার। একজন সাহসী মানুষ জেল-জুলুম-নির্যাতন সহ্য করে এগিয়ে গেছেন এবং অস্তিমে বাঙালি জাতির হাজার বছরের স্বপ্নসাধ স্বাধীন জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। হয়েছেন বাঙালি জাতির পিতা, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, মহাকালের ইতিহাসের মহানায়ক। অপরজন বাবা-মা, ভাই-বোন সবাইকে হারিয়েও স্ট্যাচু অব লিবার্টির মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছেন এবং ঘাতকের বুলেট-বোমা-গ্রেনেডের তোয়াক্কা না করে স্বাধীন দেশটাকে আধুনিক বাংলাদেশে রূপ দিয়েছেন। পিতা এবং কন্যার এমন ইতিহাস অভূতপূর্ব ঘটনা। পিতা ভিত্তি স্থাপন করে গেছেন আর কন্যা সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে একে একে সব বাধা অতিক্রম করে আধুনিক বাংলাদেশ গড়েছেন। আজ বাংলাদেশ আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিশ্বের বিস্ময়, রোল মডেল। পিতার মতোই তিনিও মাদার অব হিউম্যানিটি, চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ, স্টার অব দ্য ইস্ট এবং দুই ডজন বিশ^বিদ্যালয়ের ডক্টরেট। সর্বনাশা কোভিড-১৯ বা করোনা এসে প্রথম ধাক্কায় গতি কিছুটা শ্লথ করলেও শেখ হাসিনার সাহসী ও দূরদর্শী পদক্ষেপে অচিরেই বাংলাদেশ, বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তারপরও বলব, আধুনিক বাংলাদেশের জীবন থেকে ছয়টি মাস চলে গেল। কোভিড খেয়ে ফেলল। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সবাইকে সতর্ক করেছেন কোভিডের দ্বিতীয় আঘাত সামনে। তারপরও শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এ থেকে উত্তরণ ঘটাবেই। ভয় কী, বাংলাদেশের বর্তমান বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রতিদিন বাড়ছে। গত বৃহস্পতিবারের একটি পত্রিকায় ছাপা হয়েছে, বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি হবে ১ হাজার ৮৮৮ মার্কিন ডলার এবং ভারতের ১ হাজার ৮৭৭ মার্কিন ডলার। খাদ্য উৎপাদন ৪ কোটি টন, উদ্বৃত্ত ৬৪ টন।

সমস্যা হলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার ক্লান্তিবিহীন প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ রাষ্ট্র যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, ক্ষমতাসীন দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে না বরং ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়ছে। বিশেষ করে দলের জেলা থেকে নিচের দিকে তৃণমূলে উপজেলা, ইউনিয়ন ওয়ার্ড, কমিটি যা আছে সবই ওপরের কমিটির আজ্ঞাবহ এবং একেকটির বয়স ৫, ১০, ১৫ বছর। কখনো কখনো কোনো কমিটি বা নেতৃবৃন্দের কার্যকলাপ দলকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে তুলছে। আবার কোন্দলের কারণে দেখা গেছে কাউন্সিল হচ্ছে না, দল রক্তশূন্যতার দিকে চলে যাচ্ছে। কোনো কোনো নেতা আবার নিজের শক্তি বৃদ্ধির জন্য ছদ্মবেশী জামায়াত-শিবির, রাজাকার-আলবদরদের দলে ভেড়াচ্ছে। কেউ আবার মাসল পাওয়ার বাড়ানোর জন্য চোর, মুরগি চোর, গুণ্ডা, ফৌজদারি মামলার আসামিকে দলে ভেড়াচ্ছে। তারা ভাবে, ক্ষমতায় আছি জনগণের বাপের কী? দিনে দিনে যে পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে, দুদিন পর যে দাঁড়ানোর মাটি পাবে না, তা ভাবে না। আমরা বঙ্গবন্ধুর মতো জাতির পিতা পেয়েছি, শেখ হাসিনার মতো বিশ্বমানের রাষ্ট্রনেতা পেয়েছি, তবু আমরা থামছি না। আরেকটা দিক হলো, অর্থসম্পদের দিকে দৌড়ানো। সরকারি বড়-ছোট উন্নয়ন প্রকল্প কে কীভাবে হাতাবে, তার একটা প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলে। আর এই সুযোগে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ফুলতে ফুলতে ঢোল হচ্ছে। একশ্রেণির নেতার মতো তারাও ছদ্মবেশে দল ও সরকারের বিরুদ্ধে কাজ করে। অ্যান্টি আওয়ামী লীগ রাজনীতি করছে। রাস্তার মোড়ে চায়ের দোকানে বসে নেতাদের চরিত্র হরণ স্বাভাবিক ঘটনা। চরিত্রহীন নৈতিকতাবিবর্জিত নেতারা তাদের কাছে ভালো। এভাবে জনগণ থেকে আওয়ামী লীগ ও সরকারকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হচ্ছে, টাকা কামানো হয়ে গেলে বা পেট ভরে গেলে কেটে পড়ে। এখনকার টু-পাইস কামানো পার্টির কিন্তু শতকোটি, হাজার কোটিতেও পেট ভরে না, কেটেও পড়ে না। তারা জানে বিএনপি নামক দলটির ক্ষমতায় ফিরে আসা অলীক কল্পনা। কোনোই সম্ভাবনা নেই। নেতা নেই, কর্মীরা বিচ্ছিন্ন, আশাহত। সম্প্রতি শাহ মোয়াজ্জেমের একটি সাক্ষাৎকার মিডিয়ায় দেখা গেছে, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন বলছেন, খালেদা জিয়া সমঝোতা না করলে কারাগার থেকে মুক্ত হতে পারতেন? লেখাপড়া জানেন না, তিনি কী নেতৃত্ব দেবেন। শেখ হাসিনার আমলে অপরাধ করে কেউ পার পাচ্ছে, এমন ঘটনা বিরল, তবু তারা থামছে না। সম্রাট-পাপিয়ারা যে বাঁচতে পারে না, তা কোনো গোপন ঘটনা নয়। তবু কেউ দমছে না।

এসব দেখেও অনেকে চুপ থাকে, কথা বলে না। ভয় হয় শুধু যে নিজের অবস্থান হারাবে তা নয়, নির্যাতিতও হতে পারেন। দলীয় পদ বা শাসনতান্ত্রিক পদবি না থাকলে কথা বলার মধ্যে ঝুঁকি আছে। তারপরও বলব, আর চুপ থাকা ঠিক নয়। এখন সময় এসেছে কথা বলার।

ক’দিন আগে আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র দেখেছিলাম। এর ৪৭ অনুচ্ছেদে আছে- প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা : ক) ‘এতে বলা হয়েছে কোনো সদস্য আওয়ামী লীগের আদর্শ, লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, গঠনতন্ত্র ও নিয়মাবলি বা প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের পরিপন্থী কার্যকলাপে অংশগ্রহণ করিলে এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ কাউন্সিল, কার্যনির্বাহী সংসদ, সংসদীয় বোর্ড বা সংসদীয় পার্টির বিরুদ্ধে কোনো কাজ করিলে শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদ তার বিরুদ্ধে যেকোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে পারিবে।’
খ) ‘তবে কার্যনির্বাহী সংসদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জাতীয় কমিটিতে সাধারণ সম্পাদক-এর মাধ্যমে আপিল করা যাইবে এবং এ ক্ষেত্রে জাতীয় কমিটির সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলিয়া গণ্য হইবে।’

তাহলে দেখা যাচ্ছে, দলীয় আদর্শ ও নৈতিকতাবিবর্জিত নেতার বিরুদ্ধে কথা বলা যাবে, তার অপকর্মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া যাবে। তবে দলীয় প্রধানের বিরুদ্ধে কোনো ফোরামে কথা বলার সুযোগ নেই। বিশেষ করে প্রথমত দলীয় প্রধান জাতির পিতার কন্যা, তিনি সবকিছুর ঊর্ধ্বে, শুধু তা-ই নয়, তিনি আছেন বলেই দল আছে, দলের সরকার আছে, নেতা-কর্মী আছে। তাঁর নেতৃত্ব বর্তমান বিশ্বের অদ্বিতীয় এবং অতুলনীয়। বরং তাঁর হাতকে শক্তিশালী করার জন্যই ওই সব নীতিহীন নেতা, পাতি নেতার চেহারা উন্মোচন করে দিতে হবে। জানি মাননীয় নেত্রীর কম্পিউটারে আমিসহ সব এমপি, মন্ত্রী, নেতা-নেত্রীর আমলনামা রয়েছে। তারপরও আমাদেরও দায়িত্ব আছে তৃণমূলের খবর জানানো। তাঁর কোনো কিছু অজানা নয়, তবুও।

মানুষের লোভের কোনো সীমা নেই। একজন ব্যক্তি তার পারিবারিক অতীত ব্যবহার করে চাঁদ দখল করার জন্য হাত বাড়ায়, তারও উদাহরণ কম নয়। একই অঙ্গে অনেক রূপ এমন দৃষ্টান্ত রয়েছে: সরকারে ও দলে বড় পদ, তৃণমূলের হর্তাকর্তা তবু মন ভরছে না, চাঁদ ধরতে চায়। তাই ক্ষমতার অপব্যবহার তাদের রাজনীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমন উদাহরণও রয়েছে। আশপাশের সব লোক তাদের অনুগত হতে হবে। জেলা-উপজেলার, এমনকি ইউনিয়ন নেতৃত্ব, প্রশাসন সব তাদের অনুগত হতে হবে। এদের উচ্চাভিলাষ সীমাহীন। অথচ এলাকায় জনপ্রিয় নেতা যাদের কোণঠাসা করতে করতে দলের নেতৃত্ব থেকে ঘরে বসিয়ে দেয়া হয়েছে। তবে শিক্ষা হয়েছে একটি জেলার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের। পৌরসভা নির্বাচনে তাদের দুজনের ওয়ার্ডের মনোনীত কাউন্সিলরকে হারিয়ে দেয়া হয়েছে। জনগণের পক্ষে না থেকে সো-কলড নেতার ফাই-ফরমাশ খাটায় এমন পরিণতি হয়েছে। জেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাদের যথেষ্ট ক্ষমতা ছিল, কিন্তু তারা সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাদের জন্য সামনে আরো কত কী অপেক্ষা করছে, সময় বলে দেবে।

সবচেয়ে বিপদের ব্যাপার হলো নেতা বলুন, এমপি বলুন, মন্ত্রী বলুন, ত্যাগী নেতা-কর্মীদের দূরে সরিয়ে এলাকার সন্ত্রাসী-মাদকাসক্ত-সমাজ ধিক্কৃত লোকদের বেশি প্রাধান্য। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দল ও দলীয় সরকার। তবু তারা বেপরোয়া। কেউ মুখ খুললে সন্ত্রাসীদের রক্তচক্ষু দেখতে হয়।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উচ্চাভিলাষী রাজনৈতিক নেতাদের কথা ভেবেই আমাদের রাষ্ট্রীয় শাসনতন্ত্রে ৭০ অনুচ্ছেদ সন্নিবেশিত করে গেছেন : ‘কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি- ১) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন অথবা ২) সংসদে উক্ত দলের বিরুদ্ধে ভোটদান করেন তাহা হইলে সংসদে তাহার আসন শূন্য হইবে।’

এভাবে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু উচ্চাভিলাষীদের লাফালাফি বন্ধ করে দিয়ে গেছেন।

-লেখক: সংসদ সদস্য। সদস্য, মুজিববর্ষ জাতীয় কমিটি। সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেসক্লাব।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন