মিনি কক্সবাজার চরে হুমকিতে চাঁদপুর শহর

তালহা জুবায়ের :
গত বেশ কয়েক বছর আগে থেকেই চাঁদপুরের মোলহেডের সামনে মেঘনা নদীতে জেগে উঠেছে একটি চর। যা স্থানীয়দের মাঝে পরিচিতি পেয়েছে ‘মিনি কক্সবাজার’ নামে। কিন্তু সেই মিনি কক্সবাজার খ্যাত চর আজ চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে চাঁদপুর শহররক্ষা বাঁধের জন্য। মাঝ নদীতে চর জেগে ওঠায় সঙ্কুচিত হয়ে গেছে মেঘনা। এতে বর্ষা মৌসুমে ভাটির উদ্দেশ্যে উজান থেকে নেমে আসা পানি প্রবাহে দেখা দিচ্ছে সমস্যা। পানির চাপে শহররক্ষা বাঁধ এলাকায় নদীর গভীরতা গভীর থেকে আরো গভীর হচ্ছে। একই সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে ঘূর্ণিস্রোত ও ঢেউ। এতে করে ঝুঁকিতে পড়েছে চাঁদপুর শহর।

সংশ্লিষ্ট মহল বলছেন, আস্তে আস্তে চর বিস্তৃত হওয়ার পাশাপাশি বাঁধ এলাকায় বৃদ্ধি পাচ্ছে মেঘনা নদীর গভীরতা। বাঁধ এলাকায় মেঘনা নদীর গভীরতা সর্বোচ্চ ৫৭ মিটার পর্যন্ত রয়েছে। অচিরেই মেঘনার বুকে নতুন করে জেগে ওঠা পরিকল্পিতভাবে খনন করার পাশাপাশি শহররক্ষা বাঁধের স্থায়ী সংস্কারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে ভাঙনের কবলে পড়তে পারে চাঁদপুর শহর। এতে শত শত স্থাপনাসহ হাজারো বাসস্থান হারানো ঝুঁকিতে রয়েছে স্থানীয় বাসিন্দারা।

নদী বেষ্টিত জেলা চাঁদপুর। পদ্মা মেঘনা ডাকাতিয়ার অববাহিকায় গড়ে উঠেছে এই জেলা। এক সময় চাঁদপুরের দুঃখ বলা হতো মেঘনাকে। মেঘনার করাল গ্রাসে দিশেহার ছিল এই জেলার বাসিন্দারা। এই নদীর ভাঙনে জমিজমা, বসত ভিটা হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন অনেক মানুষ। স্বাধনতা পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে নদী ভাঙনরোধে তৈরি করা হয়েছে শহররক্ষা বাঁধ। ভাঙনের মুখে যা খুব একটা স্থায়ী হয়নি।

চাঁদপুর জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, চাঁদপুর শহর ভাঙনরোধে ১৯৭২ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত ১৪০ কোটি ৩০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নতুন বাজার এলাকায় ১৭শ’ ৩০ মিটার এলাকায় শহররক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়। পরবর্তীতে ২০০৯-২০১০ সালে আরো প্রায় ২৪ কোটি ৯০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে পুরান বাজার এলাকার ১৬শ’ ৩০ মিটার এলাকায় বাঁধ নির্মাণ করা হয়।

মূলত এরপর থেকেই বদলাতে থাকে ভাঙনের চিত্র। চাঁদপুরের মানুষ ফিরে পায় স্বস্তির নিঃশ^াস। কিন্তু বাঁধ নির্মাণে পরে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও তা রক্ষায় নেওয়া হয়নি কোন স্থায়ী ব্যবস্থা।

স্থানীয়রা জানান, প্রতি বছর বর্ষায় মেঘনা নদীতে ভাঙন দেখা দিলে ভাঙনরোধে গ্রহণ করা হয় অস্থায়ী ব্যবস্থা। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও বাঁধ রক্ষায় মিলে নাই স্থায়ী সমাধান। ভাঙনের মুখে অনেক মানুষ হারিয়েছে তাদের মাথা গোজার শেষ আশ্রয়স্থল। কেউ বা ভাঙনের সঙ্কা মাথায় রেখেই বসবাস করছেন নদীর পাড়ে।

চাঁদপুর জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেওয়া তথ্য মতে, গত ২০১৯ ও ২০২০ সালে শহরের পুরানবাজার হরিসভা এলাকায় একাধিক বার ভাঙনের শিকার হয়েছে শহররক্ষা বাঁধটি। এতে করে ৬৭ মিটার এলাকা নদী গর্ভে বিলীন হয়েছে। বাঁধ রক্ষায় অস্থায়ীভাবে কাজ হয়েছে কয়েক কোটি টাকার। এর মধ্যে ২০১৭-১৮ সালে ৫৮ মিটার সংস্কার কাজে ব্যয় হয়েছে ২৮ লক্ষ টাকা, ২০১৮-১৯ সালে ৪৮৫ মিটার সংস্কার কাজে ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ২৯ লক্ষ টাকা এবং ২০১৯-২০ সালে বাঁধ রক্ষায় ৩২৪ মিটার সংস্কার কাজে ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ১১ লক্ষ টাকা।

স্থানীয়রা জানান, মেঘনা নদীতে নতুন করে ভেসে উঠা চরটির আয়তন প্রায় তিন কিলো মিটার। শীতের মৌসুমে ভেসে থাকলেও বর্ষার মৌসুমে তা পানিতে ডুবে যায়। নদীর সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি শীতের সময়ে চাঁদপুর জেলার মানুষসহ আশপাশের জেলা থেকে আসা পর্যটকরা এখানে বেড়াতে আসেন। কিন্তু এই চরই কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে চাঁদপুর শহররক্ষা বাঁধের জন্য। নদীর মধ্যখানে চর জেগে ওঠায় বর্ষায় উজান থেকে নেমে আসা অতিরিক্ত পানি প্রবাহে বিগ্নতা সৃষ্টি হয়। এক দিকে অতিরিক্ত পানি অপর দিকে নদীর প্রশস্ততা কমে যাওয়ায় নেমে আসা পানিতে প্রবল ¯্রােত ও ঘূর্ণির সৃষ্টি হয় নদীর পাড় এলাকায়। অতিরিক্ত পানি প্রবাহিত হওয়ায় ভাঙনের শিকার হচ্ছে শহররক্ষা বাঁধটি।

পুরানবাজার শহররক্ষা বাঁধ এলাকার বাসিন্দা মো. মিজানুর রহমান জানান, গত ২০১৯ সাল থেকে ভাঙনে অন্তত শতাধিক মানুষ হারিয়েছেন তাদের বাসস্থান। এভাবে চলতে থাকলে অচিরেই মেঘনায় বিলীন হবে এই শহররক্ষা বাঁধ।
আরেক বাসিন্দা বিমল চৌধুরী বলেন, প্রতিবছরই বর্ষার মৌসুমে নিয়ম করে বাড়ে ভাঙনের তীব্রতা। খবর শুনে ভাঙনের চিত্র দেখতে ছুটে আসেন জনপ্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা। তারা নদী ভাঙনরোধে স্থায়ী বাঁধের আশ্বাস দেন। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। আমরা অনেক ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছি। আর কারো আশ্বাস শুনতে চাই না, বাঁধ রক্ষায় কাজে বাস্তবায়ন দেখতে চাই।

স্থানীয় আরেক বাসিন্দা নাছির উদ্দিন বলেন, নদীর মাঝে চর সৃষ্টি হওয়ায় বর্ষায় পাড়ে তীব্রস্রোত ও ঢেউ দেখা দেয়। এতে করে বাঁধে ভাঙন দেখা দেয়। কিন্তু শীতের মৌসুমে যখন কাজ করার কথা তখন তা করে না। বর্ষায় ভাঙন দেখা দিলে কর্মকর্তারা আসেন কাজ করতে। মানসম্মত কাজ না করলে কোন অবস্থাতেই বাঁধ রক্ষা করা সম্ভব হবে না। আর বাঁধ ভেঙে গেলে আমাদের বাড়ি ঘর নদীতে বিলীন হবে। তখন আমাদের যাওয়ার কোন জায়গা থাকবে না। তাই আমাদের একটাই দাবি, অতিদ্রæত যেন শহররক্ষা বাঁধের স্থায়ীভাবে সংস্কার করা হয়।

চাঁদপুর চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক গোপাল চন্দ্র সাহা বলেন, ব্রিটিশ আমল থেকেই পুরানবাজার অনেক ঐতিহ্যবাহী একটি বাজার। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে নদী ভাঙনের কবলে পড়ে এই বাজার অনেকটাই বিলুপ্তির পথে। বিভিন্ন সময়ে মেঘনা নদী ভাঙনরোধে বাঁধে অস্থায়ীভাবে কাজ হয়েছে। কিন্তু স্থায়ীভাবে সংস্কার কাজ না করা হলে চাঁদপুর শহররক্ষা বাঁধ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। এতে করে শতবছরের ঐতিহ্যবাহী পুরান বাজার ব্যবসায় কেন্দ্রও বিলীন হবে নদীতে। তাই ভাঙনরোধে অচিরেই শহররক্ষা বাঁধের স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাই।

এ ব্যাপারে চাঁদপুর সরকারি কলেজের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের, সহযোগী অধ্যাপক মো. ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, মোলহেড এলাকায় মেঘনার মধ্যখানে চর জাগায় ওই অঞ্চলে নদী সঙ্কুচিত হয়ে গেছে। কিন্তু এর উত্তর পাশে নদীর প্রসস্থতা অনেক। এতে করে যখন বর্ষায় পানি প্রবাহিত হয়, তখন চরের কারণে ওই অঞ্চল দিয়ে পানি অধিক চাপে প্রবাহিত হয়। এতে করে পানির চাপ বৃদ্ধি পেয়ে পাড়ে ঘূর্ণির সৃষ্টি হয়ে ভাঙন দেখা দেয়। তাই শহররক্ষা বাঁধ টিকিয়ে রাখতে মেঘনায় জেগে ওঠা চর পরিকল্পিত ভাবে খননেন পাশাপাশি শহররক্ষা বাঁধ স্থায়ীভাবে সংস্কার করা অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে চাঁদপুর শহর বড় ধরনের ভাঙনের মুখোমুখি হতে পারে।

নদীর মধ্যে জেগে ওঠা চর খননের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়ে চাঁদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রেফাত জামিল বলেন, বিভিন্ন সময়ে নদীতে ভাঙন দেখা দিলে বাঁধ রক্ষায় প্রাথমিক ভাবে কাজ করা হলেও ২০০৯-২০১০ সালের পরে স্থায়ীভাবে সংস্কার কাজ হয়নি। তবে ২০১৯ সালে নদীতে ভাঙন দেখা দিলে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) এর উর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ ভাঙন কবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। সেসময় তারা ক্ষতিগ্রস্থ প্রতিরক্ষাকাজ শক্তিশালীকরনের জন্য একটি ডিপিপি দাখিলের নির্দেশ দেন। পরে বাপাউবো গঠিত কারিগরী কমিটির অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী প্রায় ৪২০কোটি ৮১ লক্ষ টাকার একটি স্থায়ী রক্ষণাবেক্ষণ প্রকল্প তৈরি করে ২০২০ সালের জানুয়ারী মাসে পানি সম্পদ মন্ত্রণালযে পাঠাই। পরে মার্চ মাসে মন্ত্রণালয়ে যাচাই কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয় তিন নদীর সংযোগে চাঁদপুর শহরের হাইড্রো-মরফোলজিক্যাল অবস্থা পর্যালোচনা করে বিস্তারিত সমীক্ষা করে প্রস্তাব পুনগঠনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

তিনি বলেন, সেই আলোকে গত বছর ২৭ আগস্ট বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. আতাউর রহমান, আইডব্লিউএম এর প্রিন্সিপাল স্পেশালিস্ট সারওয়াত জাহান, নদী, বদ্বীপ ও উপকূলীয় করফোলজি (সিজিআইএস) বিভাগের এ্যাসোসিয়েট স্পেশালিস্ট সুদীপ্ত কুমার হোড়সহ বিভিন্ন দপ্তরের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি কমিটি করা হয়। কমিটির সদস্যগণ সরেজমিন পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণ, ভাঙনের বর্তমান অবস্থা ও পরিবেশগত অবস্থা পর্যালোচনা করে এবং স্যাটেলাইট ইমেজ, ক্রস সেকশন, নদীর গতি প্রকৃতির পরিবর্তনসহ বিভিন্ন জিনিস বিশ্লেষন করে একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন দেন। ওই প্রতিবেদনের আলোকে চলতি বছরের জানুয়ারী মাসে ৩ হাজার ১০৩ কোটি ২ লক্ষ টাকার চাঁদপুর শহর সংরক্ষণ পুনর্বাসন প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে দাখিল করেন। মন্ত্রণালয়ে যাচাই কমিটি গত ৪ মার্চ আবার সম্ভাব্যতা সমীক্ষার মাধ্যমে প্রকল্পের পরিধি এবং কারিগরি বিষয়াদি চূড়ান্ত করার পরামর্শ দেয়। সব কাজ শেষ করে আবারও তা ২ জুন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

তিনি বলেন, শহররক্ষা বাঁধ টিকিয়ে রাখতে হলে জরুরি ভত্তিতে নদীর মধ্যখানে জেগে ওঠা চর খনন করে নদীর গতিপথ ঠিক করতে হবে। একই সাথে শহর রক্ষা বাঁধের স্থায়ী সংস্কার প্রয়োজন। তা না হলে শহররক্ষা বাঁধ বিলীন হয়ে চাঁদপুর শহর তলিয়ে যাওয়ার সঙ্কা রয়েছে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।