রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে সাইড ইভেন্টে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান : আগামীকাল সাধারণ অধিবেশনে ভাষণ

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নৈশভোজসহ একদিনে ১০ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের

রহিম বাদশা, নিউইয়র্ক থেকে :
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নৈশভোজসহ একদিনে
১০ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছেন। এসব কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সরকারের ‘৩৬০ ডিগ্রি’ কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশলের প্রতিফলন ঘটেছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তাঁর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তিনি বলেন, জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও মর্যাদা আরও উচ্চতায় নেওয়াই সরকারের লক্ষ্য।

নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় (বাংলাদেশ সময় বুধবার সকালে) জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনের ডিপ্লোম্যাট সেন্টারে এক ব্রিফিংয়ে মাহদী আমিন এ কথা বলেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্রের দপ্তরের মিডিয়া কো-অর্ডিনেটর তারিকুল ইসলাম এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ওই সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য তুলে ধরেন।

মাহদী আমিন বলেন, চার দিনের সরকারি সফরের প্রথম দিন মঙ্গলবার সকাল আটটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করেন প্রধানমন্ত্রী। পূর্বনির্ধারিত ১২টি কর্মসূচির মধ্যে সময়স্বল্পতার কারণে দুটি বাদে ১০টিতেই তিনি সশরীর অংশ নেন। প্রথম দিন জাতিসংঘ মহাসচিবের আমন্ত্রণে আয়োজিত বিশেষ প্রাতরাশে সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানকে নিয়ে অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী। এতে বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও তাঁদের সহধর্মিণীরা উপস্থিত ছিলেন। দিনের শেষ ভাগে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আয়োজিত নৈশভোজেও সস্ত্রীক অংশ নেন প্রধানমন্ত্রী।

মাহদী আমিন জানান, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের উদ্বোধনী প্লেনারি অধিবেশনেও অংশ নেন তারেক রহমান। এটিকে ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এর আগে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া জাতিসংঘের বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। এবার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান দেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এক পরিবারের তিন সদস্যের এভাবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে একটি দেশের নেতৃত্ব দেওয়ার ঘটনা অত্যন্ত বিরল।

সফরের প্রথম দিনে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী ও মালদ্বীপের ভাইস প্রেসিডেন্টের সঙ্গে পৃথক সাইড লাইন বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। এসব বৈঠকে সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ, পর্যটন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়। হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেও বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের ভূমিকা এবং হাইতির সাম্প্রতিক অস্থিতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে বাংলাদেশের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতা কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা থেকে শেখার আগ্রহও প্রকাশ করা হয়েছে।

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে এদিন। একে ‘গঠনমূলক, আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করেন মাহদী আমিন। নির্বাচনে বিজয় ও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে সফল উপস্থিতির জন্য তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান এরদোয়ান। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে তুরস্ক সফরের আমন্ত্রণও জানান। দুই দেশের বহুমাত্রিক সম্পর্ক আরও জোরদারের বিষয়েও আলোচনা হয়।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও প্রথম দিনেই দুটি বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। একটি জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের সঙ্গে এবং অন্যটি জাতিসংঘ মহাসচিবের মিয়ানমার–বিষয়ক বিশেষ দূতের সঙ্গে। বৈঠকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও স্বেচ্ছায় মিয়ানমারে ফেরানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়। ড. মাহদী আমিন জানান, অতীতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে সফলভাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। সেই অভিজ্ঞতার ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও উন্নয়ন সহযোগীদের নিয়ে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

বুধবার বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ উদ্যোগে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। এছাড়া বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বৈঠকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ, বাণিজ্য, ডিরেগুলেশন, অর্থনৈতিক উদারীকরণ ও বাজেট–সহায়তা নিয়ে আলোচনা হয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ভূমিকা বাড়ানো এবং ভবিষ্যতে যৌথ অংশীদারত্ব জোরদারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।

সময়স্বল্পতার কারণে ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ও মার্কিন প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠান মেটার সঙ্গে দুটি বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি উপস্থিত থাকতে পারেননি। তবে মেটার সঙ্গে তাঁর মনোনীত উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল বৈঠক করে। বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক মেটা ব্যবহারকারী থাকায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সুরক্ষা, আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটালাইজেশন নিয়ে সেখানে আলোচনা হয়।

প্রেস ব্রিফিংয়ে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির, শামা ওবায়েদ ইসলামসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জাতিসংঘ মিশনের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বুধবার স্থানীয় সময় সকাল সাড়ে ৮টায় জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে আন্তর্জাতিক দাতব্য, জনহিতকর ও মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাতরাশ বৈঠকে অংশ নিয়ে দ্বিতীয় দিনের কর্মসূূচি শুরু করেছেন। বৈঠকে বিশ্বের বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় জনহিতকর ও মানবিক সহায়তা সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এর মধ্যে গেটস ফাউন্ডেশন, ভিসা ফাউন্ডেশন, রকফেলার ফাউন্ডেশন, ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি (আইআরসি) এবং রোটারি ইন্টারন্যাশনালসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরের কর্মসূচির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের মাধ্যমে চলমান ইউএনজিএ অধিবেশনের প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক মানবিক সংকট, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি হয়। বৈঠকে বাংলাদেশে সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন, মানবিক সহায়তা এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিভিন্ন উদ্যোগে আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব জোরদারের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। একই সঙ্গে বৈশ্বিক পর্যায়ে দাতব্য ও মানবিক সহযোগিতার পরিধি আরও বাড়ানো এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য কার্যকর অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা হয়।

প্রাতরাশ বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে অনুষ্ঠেয় উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টে অংশ নেবেন। ‘সংকটের টেকসই সমাধানে নতুন আহ্বান : দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতি থেকে ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার পথে’ শীর্ষক ওই অনুষ্ঠানে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান, ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা এবং বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব পাবে। এছাড়া বুধবার প্রধানমন্ত্রীর ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামীকাল ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য উপস্থাপন করবপন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘে সাধারণ বিতর্কে এটি হবে তাঁর প্রথম ভাষণ। প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফরের কর্মসূচিতে মানবিক সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও রোহিঙ্গা সংকট বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।

শেয়ার করুন