শুধু ভিআইপিদের নাগালে চাঁদপুরের ইলিশ : স্বাদ উধাও!

তালহা জুবায়ের :
মৌসুম শুরুর আগে এবার ইলিশের বাড়ি খ্যাত চাঁদপুরের নদ-নদীতে ইলিশের আকাল চলছে। ফলে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে ইলিশের দাম। স্বাদও নেই আগের মতো। মূলত দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা ইলিশে এখন সচল রয়েছে দেশের ঐতিহ্যবাহী চাঁদপুর বড়স্টেশনস্থ ইলিশ আড়ৎ।

বর্ষার শুরুতে আষাঢ়ের টানা বৃষ্টিপাতে প্রকৃতির তাপমাত্রা কমায় স্বস্তিতে জনসাধারণ। কিন্তু ইলিশের বাজারের চিত্রটা পুরোই উল্টো। বাজারে সরবরাহ কম থাকায় ইলিশের দাম আগুন। দেশের অন্যতম বড় ইলিশের বাজার বড়স্টেশন মাছঘাটের ব্যবসায়ীরা বলছেন, ইলিশের যে চাহিদা, সে তুলনায় সরবরার নেই বললেই চলে। তাই শুধু ভিআইপিরাই ইলিশ কিনতে পারছে, সাধারণ মানুষ নাগাল পাচ্ছে না ইলিশের।

সাধারণ ক্রেতারা বলছেন, ইলিশের দাম আগুন, ইলিশ ছুতে গেলেই হাত পুড়ে যাওয়ার উপক্রম। সাধ থাকলেও সাধ্যে কুলাচ্ছে না। তাই দাম শুনেই কেনার আশ মিটে যাচ্ছে। যদিও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আর কিছু দিন পরেই জেলেদের জালে ধরা পড়বে কাঙ্খিত ইলিশ। সকল মানুষের নাগালে থাকবে দাম।

বড়স্টেশন মাছ ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ইলিশশূণ্য বাজার। অধিকাংশ আড়তেই নেই মাছ। বাজারের খুচরা ব্যবসায়ীরা কিছু ইলিশ নিয়ে বসে আছেন বিক্রির উদ্দেশ্যে। কিন্তু দাম অত্যাধিক বেশি হওয়ায় ক্রেতাদেরও আনাগোনা নেই খুব একটা। যারাই দুই একজন কিনছেন, প্রত্যেকেই চড়া দামে ইলিশ কিনে বাড়ি ফিরছেন।

ইলিশ ব্যবসায়ী বিপ্লব খান বলেন, মার্চ-এপ্রিল দুই মাস নিষেধাজ্ঞা শেষে আবারও ইলিশ ধরা শুরু হয়েছে নদীতে। কিন্তু জেলেদের জালে ইলিশ না পাওয়ায় বাজারে সরবরাহ নেই বললেই চলে। ইলিশের যেই চাহিদা, সেই তুলনায় মাছ নেই। তাই ইলিশের দাম এখন বেশি।

তিনি বলেন, কয়েক দিন আগে দুই কেজি ছয়শ’ গ্রাম একটি ইলিশ বিক্রি হয়েছে ১২ হাজার টাকায়। যেই টাকা দিয়ে একটি আস্ত খাসি কিনা যেত। মাছ না থাকায় আমাদের কিনতে হচ্ছে বেশি টাকায়, তাই বিক্রিও করতে হচ্ছে বেশি মূল্যে।

মৎস্য ব্যবসায়ী আলী আকবর বলেন, বাজারে এখন ৫শ’ গ্রাম থেকে ৭শ’ গ্রাম ওজনের ইলিশ মণ প্রতি বিক্রি হচ্ছে ৩৫ হাজার থেকে ৩৮ হাজার টাকায়, তাছাড়া ৮শ’ গ্রাম থেকে ৯শ’ গ্রাম ওজনের ইলিশ মণ প্রতি ৪০ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকায়, ১ কেজি ওজনের ইলিশ প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে ৬০ হাজার থেকে ৬৫ হাজার টাকায়, এবং ১২শ’ গ্রাম থেকে দেড় কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৮০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকা মণ দরে।

বাজারের খুচরা ইলিশ বিক্রেতা আলাউদ্দিন ও মো. মোস্তফা বলেন, আমরা যারা খুচরা ইলিশ বেচি আমাগো কাছেও অন্যান্য বছর এই সময় ১০ থেকে ১২ মণ ইলিশ মজুদ থাকতো। অনেক সাধারণ মানুষ মাছ কিনতে আইতো। বাজারে ক্রেতাদের উপচে পড়া ভিড় থাকতো। কিন্তু অহন মাছ না থাহনে ১ মণ ইলিশও মজুদ করতে পারি না। ইলিশের দাম হুইন্নাই সাধারণ মানুষ জায়গ্যা। ঠেহায় না পড়লে কেউ মাছ কিনে না। বড় বড় সরকারি অফিসার, ঠিকাদার, ব্যবসায়ীসহ ভিআইপি কাস্টমাররাই অহন ইলিশ কিনে।

সবুজ হোসেন নামের এক ক্রেতা বলেন, বাজারে আসছিলা ইলিশ কিনতে। কিন্তু যেই দাম চায় তা শুনে আর সাহসে কুলায় নাই। এই দাম দিয়া আমাগো মত মানুষের ইলিশ কিনা সম্ভব না। তাই খালি হাতেই ফিরে যাচ্ছি, অন্য বাজার থেকে তেলাপিয়া মাছ নিয়া যামু বাড়িতে।

চাঁদপুর জেলা মৎস্য বণিক সমবায় সমিতি সাধারণ সম্পাদক শবে বরাত বলেন, ঘাটে ইলিশের সরবরাহ নেই। অন্যান্য বছর এই সময়ে কয়েকশ মণ ইলিশ সরবরাহ হলেও বর্তমানে হচ্ছে মাত্র ৮ থেকে ১০ মণ। যেই চাহিদা রয়েছে, তার কিছুই সরবরাহ হয় না। তাই ইলিশ কিনতে ঢাকাসহ দূর দূরান্ত থেকে মানুষ চাঁদপুরে এসে অনেক সময় খালি হাতেই ফিরে যাচ্ছেন।

তিনি বলেন, মূলত এবছর বৈশাখ মাসে ঝড়-বৃষ্টি কম হওয়ায় নদীতে মাছ নেই খুব একটা। তাছাড়া মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণ অভিযানের সময় নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ইলিশ নিধন করাও প্রভাব পড়েছে এখন। তবে আগামী দুই এক মাস পর থেকে নদীতে আবারও ইলিশ পাওয়া যাবে বলে তিনি আশাবাদী।

চাঁদপুর মৎস্য ইনস্টিটিউটের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও ইলিশ গবেষক ড. আনিসুর রহমান বলেন, মূলত এপ্রিল, মে, জুন, জুলাই ইলিশের জন্য ডাল সিজন। এই সময়টাতে সাধারণত নদীতে ইলিশ কম আসে, তাই ধরাও পড়ে কম। তাছাড়া এ বছর বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় নদীতে স্রোতও কম হয়েছে, তাই সমুদ্র থেকে ইলিশ উঠে আসেনি নদীতে।

তবে তিনি জেলে ও ব্যবসায়ীদের হতাশ না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আশাকরছি ঠিকমত বৃষ্টিপাত হলে আগামী জুলাই মাসের শেষ নাগাদ থেকেই নদীতে প্রচুর পরিমানে ইলিশ পাওয়া যাবে। তখন দামও ক্রেতা সাধারণের নাগালের মধ্যে চলে আসবে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।