নিজস্ব প্রতিবেদক
চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদের জমির মালিকানা নিয়ে জটিলতার তথ্য উঠে এসেছে একটি আইনগত মতামতে। মসজিদ কর্তৃপক্ষের পক্ষে দেওয়া ওই মতামতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন সময়ে নিবন্ধিত দানপত্র ও ওয়াক্ফ দলিলের মাধ্যমে মোট প্রায় ৩৩ শতক জমি ঐতিহাসিক হাজীগঞ্জ বড় মসজিদের জন্য দান ও হস্তান্তর করা হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে ওই জমির কিছু অংশ ব্যক্তিমালিকানার রেকর্ডে ওঠে এবং কোথাও কোথাও মসজিদের সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
চাঁদপুর জেলা জজ আদালতের আইনজীবী মো. আজহারুল ইসলাম গত ২ আগস্ট দেওয়া তাঁর লিখিত আইনগত মতামতে হাজীগঞ্জ বড় মসজিদ কমপ্লেক্সের মালিকানাধীন সাবেক ৮৫০, ৯২৩ ও ৯২৫ দাগের জমির মালিকানা নিয়ে বিভিন্ন নথি পর্যালোচনা করেন। নথিতে মসজিদের জমির মালিকানা, দখল এবং সরকারি রেকর্ডে ভুলভাবে নাম অন্তর্ভুক্ত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
আইনগত মতামত অনুযায়ী, হাজীগঞ্জের সি.এস. ১ নম্বর খতিয়ানভুক্ত সাবেক ৮৫০ দাগে মোট ৯ শতক জমির মধ্যে সুরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী ও দেবেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী মালিক ও দখলকার ছিলেন। পরে ওই জমির অংশ হাজীগঞ্জ বড় মসজিদের জন্য দান করা হয়।
নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৬০ সালের ২৩ আগস্ট হাজীগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে নিবন্ধিত ৪০০ নম্বর দানপত্রের মাধ্যমে সি.এস. ৯২৫ দাগের ৩৩ শতক জমি হাজীগঞ্জ বড় মসজিদের পক্ষে মোতাওয়াল্লি হাজী আহমদ আলী পাটোয়ারীর কাছে দান ও দখল অর্পণ করা হয়। পরবর্তী সময়ে এস.এ. ১৩৩৫ নম্বর খতিয়ানে ওই জমি হাজীগঞ্জ বড় মসজিদের নামে রেকর্ড হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
আইনজীবীর মতামতে আরও বলা হয়, মসজিদের সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে ব্যবহৃত জমির কিছু অংশ দীর্ঘদিন ধরে মাটি ও বালি দিয়ে ভরাট করে ঈদগাহ মাঠ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি মসজিদের বর্ধিত অংশে নামাজ পড়ার স্থান এবং নারীদের নামাজের জন্য পৃথক ব্যবস্থা রয়েছে।
আইনগত মতামতে সাবেক ৮৫০ দাগের জমির মালিকানা নিয়ে পুরোনো দলিলের তথ্যও তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, সি.এস. ১ নম্বর খতিয়ানভুক্ত সাবেক ৮৫০ দাগের ৯ শতক জমিতে সুরেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী ও দেবেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী মালিক ও দখলকার ছিলেন।
পরে ওই জমি নিয়ে বিভিন্ন দলিলের মাধ্যমে মালিকানা পরিবর্তনের তথ্য পাওয়া যায়। মতামত অনুযায়ী, আমছর আলী রাজের কাছে বন্দোবস্ত দেওয়ার পর তিনি মালিক দখলকার হন। পরবর্তী সময়ে তাঁর একমাত্র পুত্র মো. দুধ মিয়া উত্তরাধিকারসূত্রে জমির মালিকানা পান।
নথিতে বলা হয়েছে, ১৯৯০ সালের ৩০ জানুয়ারি নিবন্ধিত ১০৫ নম্বর ছাপ কবলা দলিলের মাধ্যমে সাবেক ৮৫০ দাগের ৯ শতক জমি হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদের বরাবর বিক্রি ও ওয়াক্ফ করে দখল অর্পণ করা হয়। এর পরও জমির মালিকানা ও রেকর্ড নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে আইনজীবীর মতামতে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনগত মতামতে বলা হয়েছে, মসজিদ কর্তৃপক্ষ সাবেক ৮৫০ দাগের জমি নিয়ে সিনিয়র সহকারী জজ আদালত, মতলবে সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করে। ২০১১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মামলাটি দায়ের করা হয়।
পরে সরকারের পক্ষে চাঁদপুরের জেলা প্রশাসককে বিবাদী করে জেলা জজ আদালতে দেওয়ানি আপিল মামলা করা হয়। আইনজীবীর মতামত অনুযায়ী, ওই মামলায় সাবেক ৮৫০ দাগের ৩৩ শতক জমিতে সরকারের কোনো স্বত্ব বা স্বার্থ নেই মর্মে ডিক্রি জারি ও প্রচারিত হয়। পরবর্তী সময়ে সরকার ওই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে কোনো রিভিউ বা আপিল করেনি বলেও মতামতে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইনগত মতামতে সাবেক ৯২৩ দাগের জমির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। হাজীগঞ্জ এলাকার সাবেক সি.এস. ২৪ নম্বর খতিয়ানভুক্ত সাবেক ৯২৩ দাগে ১৫ শতক জমিতে সোনাতন সাহা ও বিপিন বিহারী সাহা মালিক দখলকার ছিলেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
পরে বিভিন্ন দলিলের মাধ্যমে ওই জমির মালিকানা পরিবর্তনের তথ্য দেওয়া হয়েছে। ১৯৬৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের ৪৯৫ নম্বর ছাপ কবলা দলিল এবং একই বছরের ১০ মার্চের নিবন্ধিত ১৪৯ নম্বর ওয়াক্ফনামা দলিলের মাধ্যমে জমিটি হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদের বরাবর বিক্রি ও ওয়াক্ফ করে দখল অর্পণ করা হয় বলে আইনগত মতামতে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে জরিপের রেকর্ডেও জমিটি মসজিদের নামে থাকার কথা বলা হয়েছে।
আইনজীবীর মতামতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ জরিপের সময় হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ কমপ্লেক্সের জমি মালিকানাধীন দলীয় ভূমি হিসেবে রেকর্ড না হয়ে ভুলক্রমে বাংলাদেশ সরকারের নামে রেকর্ড হয়েছে। এ কারণে মসজিদ কর্তৃপক্ষ ওই রেকর্ড সংশোধনের জন্য মামলা করেছে।
নথি অনুযায়ী, এ বিষয়ে চাঁদপুরে দায়ের করা একটি মামলা পরবর্তী সময়ে মতলব সিনিয়র সিভিল জজ আদালতে বদলি হয়ে বর্তমানে চলমান রয়েছে।
আইনগত মতামতে আরও বলা হয়েছে, হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ কমপ্লেক্সের আওতাধীন জমি বিভিন্নভাবে দখল ও ব্যবহার হয়ে আসছে। কোনো কোনো অংশ মাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মসজিদের সম্প্রসারিত অংশেও জমির ব্যবহার রয়েছে।
নথিতে দাবি করা হয়েছে, সাবেক ৮৫০, ৯২৩ ও ৯২৫ দাগের জমিতে হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদের মালিকানা ও দখল থাকার পরও ওই জমির বিষয়ে সরকারি রেকর্ড এবং ব্যক্তিমালিকানার দলিল নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছে।
আইনজীবী মো. আজহারুল ইসলামের মতামতের শেষাংশে বলা হয়েছে, উল্লিখিত সাবেক ৮৫০, ৯২৩ ও ৯২৫ দাগের জমিতে হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদের মালিক দখলকার হওয়ার কারণে ওই জমিতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের কোনো স্বত্ব বা স্বার্থ নেই এবং ছিল না।
তবে জমির বর্তমান রেকর্ড, দখল ও মালিকানা নিয়ে চলমান মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্যেই রয়েছে।