নিজস্ব প্রতিবেদক :
চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার কচুয়া বাজারস্থ ইসলামীয়া মেডিকেল হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে প্রতিষ্ঠানের মালিক মো. ওমর ফারুক মজুমদারকে মারধর ও হত্যার চেষ্টা এবং হাসপাতালে জোরপূর্বক তালা লাগানোর অভিযোগে মামলা হয়েছে। চাঁদপুরের চীফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত মামলার ৪ আসামীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা (ওয়ারেন্ট) জারি করেছে। এর আগে থানায় মামলা দিতে গেলে পুলিশ মামলা নেয়নি বলে বাদী অভিযোগ করেছেন। গত ২১ আগস্ট শুক্রবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে হাসপাতালের তৃতীয়তলায় এই ঘটনা ঘটে বলে মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাদীর আইনজীবী আ. কাদের জিলানী মিল্টন জানান, মো. তরিকুল ইসলামসহ ৬জনের নাম উল্লেখ করে এবং আরো ৬/৭জন অজ্ঞাতনামাকে আসামী করে চাঁদপুরের আদালতে মামলা করা হয়েছে। মামলা নং ৮৩৩/২৬। আদালত অভিযোগের বিষয়ে তিনজন সাক্ষীর জবানবন্দি পরীক্ষা করেন। একই সঙ্গে বাদীর দাখিল করা জখমী সনদ পর্যালোচনা করেন আদালত। সাক্ষীদের জবানবন্দি ও জখমী সনদসহ উপস্থাপিত কাগজপত্র পর্যালোচনা শেষে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় চীফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মুজাহিদুর রহমান চার আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। তারা হলেন- মো. তরিকুল ইসলাম (৩৮), তার ভাই মো. শরীফুল ইসলাম (৩৫), মো. শফিকুল ইসলাম (৫২) ও গাজী গোলাম মোস্তফার (৫১) বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছেন। দন্ডবিধির ১৪৩/৩২৩/৩২৫/৩০৭/৩২৬/৪২৭/৩৮০/১০৯ ধারায় মামলাটি করা হয়েছে।
মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, বাদী মো. ওমর ফারুক মজুমদার কচুয়া বাজারে ইসলামীয়া মেডিকেলের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সুনামের সাথে হাসপাতালটি পরিচালনা করে আসছিলেন। অভিযুক্ত আসামীরা শত্রুতাপোষণ করে হাসপাতাল পরিচালনার কাজে বাধা দিয়ে আসছিলেন। এই বিরোধের জের ধরে আসামীরা বাদীর মালিকীয় হাসপাতাল থেকে বাদী মো. ওমর ফারুক মজুমদারকে অপসারণের জন্য ষড়যন্ত্র করে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২১ আগস্ট বিকেলে বাদী তার হাসপাতালের অফিসকক্ষে (তৃতীয়তলায়) অবস্থানকালে আসামীরা সেখানে এসে তাকে লোহার রড ও কাঠের আদল দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত করে হত্যার চেষ্টা করে। হামলাকারীদের আঘাতে বাদীর ডান কান ৬৫% ও বাম কানের ৫৫% শ্রবণশক্তি নষ্ট হয়ে যায়। হামলার সময় আসামীরা হাসপাতালের ক্যাশ বক্সসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী ভাংচুর করে ক্যাশ বক্স হতে ১৫ লাখ টাকা নিয়ে যায়।
এরপর আসামীরা বাদীকে তার অফিস কক্ষে আটকে রেখে হাসপাতালের নিচতলার ফার্মেসীতে গিয়ে কর্মচারীদের মারধর করে হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়। এছাড়া রিসিপশনে থাকা কর্মচারী ও আগত অসুস্থ জরুরী সেবাপ্রার্থী রোগীদেরকে টেনে-হিচড়ে হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়। বাদীর ডাকচিৎকারে স্বাক্ষীরা এসে কৌশলে দরজার লক খুলে দিয়ে বাদী সেখান থেকে প্রাণে রক্ষা পায়। নইলে আসামীরা বাদীর কক্ষে আগুন লাগিয়ে দিয়ে তাকে প্রাণে মেরে ফেলতো বলে বাদী অভিযোগ করেন। এরপর হাসপাতালে কর্মরত সকল স্টাফ, নার্স, আয়া, ল্যাব টেকনিশিয়ান, কম্পিউটার অপারেটর, কর্তব্যরত ডাক্তারসহ সকল কর্মচারীকে বের করে দিয়ে হাসপাতালের মূল গেইটে তালা লাগিয়ে দেয়। এই ঘটনা নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে বা কেউ স্বাক্ষী দিলে আসামীরা তাদের জ্যান্ত মারার হুমকি দেয়।
হামলায় বাদীর শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় কচুয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে আসামীরা বাধা প্রদান করে বলে জানান তিনি। বাধ্য হয়ে বাদী বাংলাদেশ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যেয়ে চিকিৎসা নেয়। বাদী কচুয়ার মাটিতে পা রাখলে আসামীরা তাকে ও তার স্ত্রী-সন্তানকে পুড়ে মারার হুমকি দিয়েছে বলেও এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। বাদীর স্ত্রী ইয়াছমিন আক্তার এ ব্যাপারে কচুয়ায় থানায় লিখিত অভিযোগ দিলেও সেখানে মামলা গ্রহণ করেনি। এরপর গত ২১ সেপ্টেম্বর চাঁদপুরস্থ কচুয়ার আমলী আদালতে বাদী হয়ে মামলা করেন ভুক্তভোগী মো. ওমর ফারুক মজুমদার। ২৭ সেপ্টেম্বর মামলার ৪ আসামীর বিরুদ্ধে আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে বলে বাদীপক্ষের আইনজীবী জানান।
ভুক্তভোগী মো. ওমর ফারুক মজুমদার বলেন, এ ঘটনাটি স্থানীয় সংসদ সদস্য ও শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন ভাই ও তাঁর স্ত্রী বেবী আপাকে আমি জানিয়েছি। মো. তরিকুল ইসলাম টাকা বিনিয়োগ ছাড়াই আমার হাসপাতালের পার্টনার হতে চাইতো। আমি রাজি না হওয়ায় সে হাসপাতাল পরিচালনার কাজে বাধা দিয়ে আসছে। সে সব সময় ক্ষমতাসীনদের সাথে থেকে অবৈধ প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন। বিগত আওয়ামী লীগের সময়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের দিয়েও তদ্বির করেছে তাকে টাকা ছাড়া তাকে শেয়ার দিতে। সে একজন ভূমিদস্যু, মাদক কারবারি, চাঁদাবাজ এবং এলাকায় ত্রাস সৃষ্টিকারী হওয়ায় এলাকার সাধারণ জনগণ তাকে অনেক ভয় পায়। সরকার পরিবর্তন হলে সেও দল ও নেতা পাল্টায়। অথচ আমি ছাত্রদল ও বিএনপির একজন ত্যাগী কর্মী। আমাদের দল ক্ষমতায় থাকার সময়ে সে আমার সাথে এমন বেআইনী ও সন্ত্রাসী কাজ করছে এটা মেনে নেওয়া কষ্টকর। আমি ন্যায় বিচার চাই।
তিনি আরো বলেন, বর্তমানে তরিকুল ইসলাম হাসপাতাল দখল করে ক্যাশে তার তালতো ভাইয়ের ছেলে শরীরফকে এনে বসায়। হাসপাতালের সব তালা পরিবর্তন করে নিজে অন্য তালা এনে লাগায়। হাসপাতালের সকল টাকা-পয়সা নিজেই আত্মসাত করছে। আমার কাছ থেকে হাসপাতালের কাগজের নামে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়ে ওর গাড়ির বিভিন্ন কাগজাদি করতো সুবিদপুরের গোলাপ কাকার মাধ্যমে। চাঁদপুর সিভিল সার্জন অফিসের সেলিমের মাধ্যমে টাকার বিনিময়ে দ্রুত কাগজপত্র করতে যেয়ে কাগজপত্রের প্রথম ধাপ নামের অনুমোদন না নেওয়ায় তার করা সকল কাগজপত্র বাতিল হিসেবে সিভিল সার্জন অফিস থেকে চিঠি পাঠানো হয়। বর্তমানে আমাদের নামে বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও সে পেশিশক্তি দিয়ে হাসপাতাল দখল করে আছে। তাছাড়া কচুয়া থানায় বার বার মামলা করতে গেলে আসামি পক্ষ তাদের ক্যাডার বাহিনী ও দেশিয় অস্ত্র নিয়ে আমাদের বাধা দেয়।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত তরিকুল ইসলাম বলেন, আমার হাসপাতাল, নিজের হাসপাতালে তালা দিব কেন। আমার বিরুদ্ধে যদি কোনো অভিযোগ থাকে সেটি আপনারা সরাসরি এসে তদন্ত করে দেখুন। যারা আমাকে জড়িয়ে বিভিন্ন কথা বলছে তাদের বিষয়ে আমার কাছে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। আর্থিক কেলেঙ্কারি, মাদকসহ বিভিন্ন অপকর্মের সাথে তারা জড়িত। আমার বিরুদ্ধে যদি কোনো অভিযোগ পান সেটা আপনারা দেখেন।
