আল ইমরান শোভন
চাঁদপুরে খাল খনন ও পুনঃখননের জন্য গত ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ১১ কোটি ৫৭ লাখ ১৫ হাজার ২৯৫ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও পুরো অর্থ ব্যয় হয়নি। জেলার আটটি খাল খনন ও পুনঃখনন প্রকল্পে প্রকৃত ব্যয় দেখানো হয়েছে ১০ কোটি ৭ লাখ ১৬ হাজার ৬৮৯ টাকা। অর্থাৎ বরাদ্দের ৮৬ লাখ ২৩ হাজার ৬০৬ টাকা খরচ হয়নি।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের ‘বিগত ২০২৫–২০২৬ অর্থ বছরের খাল খনন/পুনঃখনন/সংস্কার কার্যক্রমের বরাদ্দকৃত অর্থের হিসাব বিবরণী’ পর্যালোচনা করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
হিসাব অনুযায়ী, আটটি প্রকল্পে বরাদ্দের প্রায় ৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ অর্থ অব্যয়িত রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ অব্যয়িত রয়েছে শাহরাস্তির দুটি প্রকল্পে। সেখানে বরাদ্দের তুলনায় কম ব্যয় হয়েছে ৪০ লাখ ৮০ হাজার ৩৯৯ টাকা। মতলব উত্তর উপজেলার একটি প্রকল্পে কম ব্যয় হয়েছে আরও ২০ লাখ ১৮ হাজার ৫৮২ টাকা।
তবে বরাদ্দের পুরো অর্থ ব্যয় না হওয়াটাই একমাত্র প্রশ্ন নয়। খাল খননের মতো বড় প্রকল্পে কতটুকু খাল খনন হয়েছে, নির্ধারিত গভীরতা ও প্রস্থ অনুযায়ী কাজ হয়েছে কি না এবং অব্যয়িত অর্থের কারণে প্রকল্পের কোনো অংশ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
সদরের তিন প্রকল্পে কম ব্যয় ২৬ লাখ ৬৩ হাজার
চাঁদপুর সদর উপজেলায় তিনটি খাল খনন ও পুনঃখনন প্রকল্পে মোট বরাদ্দ ছিল ৩ কোটি ৬২ লাখ ৫৩ হাজার ৪৭৪ টাকা ২৩ পয়সা। প্রকৃত ব্যয় হয়েছে ৩ কোটি ৩৫ লাখ ৯০ হাজার ২৩৭ টাকা ২৩ পয়সা। অর্থাৎ এ তিন প্রকল্পে মোট ২৬ লাখ ৬৩ হাজার ২৩৭ টাকা কম ব্যয় হয়েছে।
এর মধ্যে বালিয়া বাজারসংলগ্ন ব্রিজ থেকে দক্ষিণে জনতা বাজারের পূর্ব দিকে রাড়ীর পুল হয়ে নূরুল ইসলাম চেয়ারম্যানের ব্রিজ পর্যন্ত খাল খননে বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ২৮ লাখ ৭৪ হাজার ২৩৭ টাকা। প্রকৃত ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ১৯ লাখ ৮২ হাজার ৬৬৮ টাকা। কম ব্যয় ৮ লাখ ৯১ হাজার ৫৬৯ টাকা।
জনতা বাজার থেকে হরিপুর বাজারের দক্ষিণ সীমানা পর্যন্ত খননযোগ্য প্রধান খালে একই পরিমাণ বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ২৮ লাখ ৭৪ হাজার ২৩৭ টাকা। প্রকৃত ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ১৯ লাখ ৮২ হাজার ৬৬৯ টাকা। এ প্রকল্পে কম ব্যয় ৮ লাখ ৯১ হাজার ৫৬৮ টাকা।
আর সদর উপজেলার বিশু খাল পুনঃখনন প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ৫ হাজার টাকা ২৩ পয়সা। প্রকৃত ব্যয় হয়েছে ৯৬ লাখ ২৪ হাজার ৯০০ টাকা ২৩ পয়সা। এখানে কম ব্যয় হয়েছে ৩ লাখ ৮০ হাজার ১০০ টাকা।
শাহরাস্তির দুই প্রকল্পেই কম খরচ ৪০ লাখ
শাহরাস্তির ডাকাতিয়া নদীর খোর্দ থেকে মোড়াগাঁও বটতলা শৈলশানী খাল পর্যন্ত খননে বরাদ্দ ছিল ৩ কোটি ৯ লাখ ২ হাজার ৪৯০ টাকা। প্রকৃত ব্যয় হয়েছে ২ কোটি ৮৮ লাখ ৫৪ হাজার ৪৩০ টাকা। অর্থাৎ কম ব্যয় ২০ লাখ ৪৮ হাজার ৬০ টাকা।
একই উপজেলার নাওড়া মেহের গোদা খাল প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ২৮ লাখ ৭৮ হাজার ৫৩৭ টাকা। প্রকৃত ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৮ লাখ ৪৬ হাজার ১৯৮ টাকা। এ প্রকল্পে কম ব্যয় হয়েছে ২০ লাখ ৩২ হাজার ৩৩৯ টাকা।
দুটি প্রকল্পে মোট ৪০ লাখ ৮০ হাজার ৩৯৯ টাকা অব্যয়িত রয়েছে।
মতলব উত্তরেও ২০ লাখ টাকা অব্যয়িত
মতলব উত্তর উপজেলার কালিপুর পাশা হাউস থেকে পাঠান বাজার-দাস বাজার হয়ে ব্রাহ্মণচক পর্যন্ত খাল পুনঃখননে বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ৮০ লাখ ২৮ হাজার ২৬২ টাকা। প্রকৃত ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৬০ লাখ ৯ হাজার ৬৮০ টাকা। অর্থাৎ কম ব্যয় ২০ লাখ ১৮ হাজার ৫৮২ টাকা।
ফরিদগঞ্জের পূর্ব জয়শ্রী ব্রিজ থেকে সরকারদের ব্রিজ পর্যন্ত খাল খনন প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ২৯ লাখ ৩৮ হাজার ৫৩৭ টাকা। প্রকৃত ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ২৬ লাখ ৩৮ হাজার ৩৮৯ টাকা। এখানে কম ব্যয় ৩ লাখ ১৪৮ টাকা।
হাইমচরের দক্ষিণ চরভৈরব দেউয়ান বাড়ি থেকে চরপোড়াগাছুমী রহিম মাস্টারের বাড়ি পর্যন্ত খাল পুনঃখননে বরাদ্দ ছিল ৫২ লাখ ১৩ হাজার ৯৯৫ টাকা। প্রকৃত ব্যয় হয়েছে ৫১ লাখ ৫২ হাজার ৭৫৫ টাকা। কম ব্যয় হয়েছে ৬১ হাজার ২৪০ টাকা।
প্রশ্ন কাজের পরিমাণ ও মান নিয়ে
খাল খনন প্রকল্পের উদ্দেশ্য সাধারণত পানি নিষ্কাশন, জলাবদ্ধতা কমানো, কৃষিজমিতে সেচব্যবস্থা সহজ করা এবং নৌপথের সক্ষমতা বাড়ানো। এ ধরনের প্রকল্পে বরাদ্দের পুরো অর্থ ব্যয় না হলে তা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করতে পারে—প্রাক্কলনে যে পরিমাণ কাজ ধরা হয়েছিল, বাস্তবে কি তার পুরোটা হয়েছে?
বিশেষ করে আটটি প্রকল্পে প্রায় ৮৬ লাখ টাকা অব্যয়িত থাকার কারণে প্রকল্পগুলোর কাজের পরিমাণ ও বাস্তব অগ্রগতি যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। শুধু আর্থিক হিসাব নয়, প্রকল্পের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, গভীরতা, উত্তোলিত মাটির পরিমাণ এবং কাজের আগে-পরে খালের অবস্থান যাচাই করলেই প্রকৃত চিত্র পাওয়া সম্ভব।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ জাহিদ হাসান খান বলেন, খাল খনন ও পুনঃখননের কাজ নির্ধারিত প্রাক্কলন ও কাজের পরিমাণ অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হয়। বরাদ্দের পুরো অর্থ ব্যয় করতেই হবে—এমন নয়। কাজের প্রকৃত পরিমাণ ও পরিমাপ অনুযায়ী ব্যয় নির্ধারণ করা হয়। কোনো অর্থ অব্যয়িত থাকলে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী তা সমন্বয় করা হয়।
তিনি বলেন, প্রকল্পের কাজের পরিমাণ ও ব্যয়ের হিসাব সংশ্লিষ্ট নথিপত্রে রয়েছে। কোনো প্রকল্পের কাজ নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন থাকলে নথি ও পরিমাপ যাচাই করে বিষয়টি দেখা হবে।