জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে বিশ্ব নেতাদের মহামিলন : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অপেক্ষায় প্রবাসীরা

রহিম বাদশা, নিউ ইয়র্ক, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে :

জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আসছেন। জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের প্রতিনিধি দল এতে অংশ নিতে যাচ্ছে। এর ফলে কার্যত বিশ্ব নেতাদের আরেক দফা বার্ষিক মহামিলনমেলা হতে যাচ্ছে নিউইয়র্ক শহরে। নিউইয়র্ক সিটির ম্যানহাটনে অবস্থিত জাতিসংঘের সদর দপ্তরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এই অধিবেশন চলছে।

ইতিমধ্যে বহু দেশের প্রতিনিধি দলের পূর্ণাঙ্গ কিংবা আংশিক সদস্যরা নিউইয়র্ক এসে পৌঁছেছেন। এই অধিবেশনে যোগ দিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি দলের সদস্য, মিডিয়াকর্মী, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দসহ হাজার হাজার অংশগ্রহণকারী এখন নিউইয়র্কে অবস্থান করছেন। সম্মেলন এলাকা ম্যানহাটনের হোটেল-মোটেলে ব্যাপক বিদেশীদের অবস্থান। এ কারণে হোটেল-মোটেলের ভাড়া বেড়েছে কয়েকগুণ। তারপরও অধিকাংশ হোটেলে এখন আর সিট খালি নেই। বাধ্য হয়ে লোকজন নিউইয়র্কের অন্যান্য প্রশাসনিক অঞ্চল (বারো) ব্রুকলিন, দ্য ব্রংক্‌স, কুইন্‌স এবং স্ট্যাটেন আইল্যান্ডে ভিড় করছেন। তবে ম্যানহাটনের মতো অন্য অঞ্চলেও প্রায় সমান তালে বেড়েছে হোটেল-মোটেলের ভাড়া।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে অবস্থিত আটলান্টিক মহাসাগর তীরবর্তী একটি বন্দর শহর নিউইয়র্ক। এই শহরের ম্যানহাটন বরোর টার্টল বে এলাকায় জাতিসংঘের সদর দপ্তর অবস্থিত। ৮১তম সাধারণ অধিবেশন উপলক্ষে পুরো এলাকাটি এখন কয়েক দফার নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা হয়েছে। সদর দপ্তর সংলগ্ন রাস্তাগুলোতে যানবাহন চলাচল সীমিত করা হয়েছে। কিছু সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধের প্রস্তুতি চলছে। অধিবেশনের মূল পর্ব শুরু হলে অনেক রাস্তা বন্ধ করে সেখানে শুধুমাত্র অংশগ্রহণকারী, আমন্ত্রিত ও অনুমোদিত ব্যক্তিদেরই প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হবে।

এদিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল আজ ২১ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৫৫ মিনিটে জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আসার কথা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অপেক্ষায় এখন প্রবাসী বাংলাদেশী ও এখানকার বিএনপির নেতা-কর্মী-সমর্থকরা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিউইয়র্ক আগমন উপলক্ষে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে। তাকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানাতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

নিউইয়র্কে বসবাসরত বাংলাদেশিদের কেন্দ্রস্থল জ্যাকসন হাইটসে এই উদ্দীপনা বিশেষভাবে দৃশ্যমান। প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে সেখানকার সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুনে সাজানো হয়েছে। বিভিন্ন ব্যক্তি ও সামাজিক সংগঠনগুলো নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এসব সংগঠনগুলোর কার্যক্রমের একটি বড় অংশ পরিচালনা করছেন বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীগণ।

বাংলাদেশি কমিউনিটি সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি, এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন এবং দলের সাবেক নেতাদের নিয়ে এ পর্যন্ত ৩৪টি প্রস্তুতিমূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার জ্যাকসন হাইটসে অনুষ্ঠিত এক সভায় বিএনপি নেতারা নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, চাঁদপুরের কৃতি সন্তান আনোয়ার হোসেন খোকন সভায় সভাপতিত্ব করেন।

পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বাংলাদেশের নব গণতান্ত্রিক যাত্রা, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তন, টেকসই উন্নয়ন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, যুব ও নারীর ক্ষমতায়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, রোহিঙ্গা সংকট, আধুনিক প্রযুক্তির সমতাভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবহার এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার সংস্কার প্রভৃতি বিষয় গুরুত্ব পাবে।

এই সফরে দীর্ঘমেয়াদি রোহিঙ্গা সংকটটি বিশেষ গুরুত্ব পাবে। আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর এ বিষয়ে বাংলাদেশ আয়োজিত একটি সাইড ইভেন্টে প্রধানমন্ত্রীর যোগদানের কথা রয়েছে, যেখানে তিনি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের দ্রুত মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করার আহ্বান জানাবেন। বাংলাদেশ মনে করে যে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবর্তনই এই সংকটের একমাত্র কার্যকর ও স্থায়ী সমাধান।

জাতিসংঘের কার্যক্রমে জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টিও জোরালোভাবে স্থান পাবে। আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিবের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জলবায়ু কর্মসূচি ও ন্যায্য রূপান্তর’ (ক্লাইমেট অ্যাকশন এন্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন) শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি যোগ দেবেন। পরদিন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সৃষ্ট অস্তিত্বের সংকট সম্পর্কিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিনি উদ্বোধনী ভাষণ দেবেন। সেখানে জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ক্ষয়ক্ষতি এবং জলবায়ু ন্যায্যতার ওপর জোর দিয়ে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান তিনি তুলে ধরবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী এছাড়া যৌথভাবে ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে এবং স্পেন আয়োজিত বৈশ্বিক অসমতা সংকট মোকাবিলা সংক্রান্ত একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকেও অংশগ্রহণ করবেন, পাশাপাশি তিনি মাতৃ ও নবজাতক স্বাস্থ্য এবং মিডওয়াইফারি বিষয়ক বাংলাদেশ আয়োজিত একটি সাইড ইভেন্টে অংশ নেবেন। মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরার পাশাপাশি দক্ষ ও পেশাগতভাবে প্রশিক্ষিত মিডওয়াইফারি সেবার গুরুত্বের ওপর জোর দেবেন তারেক রহমান।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে কুয়েতের যুবরাজ এবং ক্রোয়েশিয়া, ভুটান, থাইল্যান্ড, পাকিস্তান ও হাইতির প্রধানমন্ত্রীর সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এসব বৈঠকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, উন্নয়ন সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

এছাড়া তিনি জাতিসংঘ মহাসচিব, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট, মিয়ানমারে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূত এবং শরণার্থী ও মানবাধিকার বিষয়ক জাতিসংঘ হাইকমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করবেন। আন্তর্জাতিক শান্তি ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্টের সঙ্গেও তার বৈঠকের কথা রয়েছে।

সরকারের অর্থনৈতিক কূটনীতির অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী মেটা, ওয়াল স্ট্রিট এবং অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ, উৎপাদন, অবকাঠামো ও প্রযুক্তি খাতে সুযোগ, মানবসম্পদ ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং তরুণদের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান এসব বৈঠকে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী আগামী ২২ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সম্মানে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের আয়োজিত স্বাগত প্রাতঃরাশের মাধ্যমে তার দাপ্তরিক জাতিসংঘ কার্যক্রম শুরু করবেন। পরবর্তীতে তিনি বিশ্বনেতাদের সঙ্গে অধিবেশনের উদ্বোধনী পর্বে যোগ দেবেন এবং রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান ও তাদের সহধর্মিণীদের সম্মানে মার্কিন প্রেসিডেন্টের দেওয়া সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে তার নিউইয়র্ক থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেওয়ার কথা রয়েছে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বলে এই সফর বাংলাদেশের জন্য বাড়তি তাৎপর্য বহন করছে। এর মাধ্যমে তারেক রহমান তার পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দিতে যাচ্ছেন। এর আগে তাঁর পিতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালে এবং তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া প্রথম ১৯৯৩ সালে এবং পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছিলেন।

প্রধানমন্ত্রীর সহকারী প্রেস সচিব কে এম নাজমুল হক জানান, ]প্রধানমন্ত্রী, তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান ও অন্যান্য সফরসঙ্গীদের নিয়ে তুর্কি এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট তুরস্কের স্থানীয় সময় দুপুর ২টা ১০ মিনিটে ইস্তাম্বুল বিমানবন্দর ত্যাগ করেছে। এর আগে ঢাকা থেকে প্রায় ৮ ঘণ্টা ৪৫ মিনিটের ফ্লাইট শেষে তুরস্কের স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে বিমানটি ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরে অবতরণ করে। ইস্তাম্বুলে দুই ঘণ্টা ৩৫ মিনিট যাত্রাবিরতি করেন প্রধানমন্ত্রী। বিমানটি নিউইয়র্ক সময় বিকেল ৫টা ৫৫ মিনিটে জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবে।

বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাবেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি আইরিন খান এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত তারেক মো. আরিফুল ইসলাম। বিমানবন্দর থেকে মোটর শোভাযাত্রা সহকারে প্রধানমন্ত্রীকে ‘হায়াত গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল নিউইয়র্ক’ হোটেলে নিয়ে যাওয়া হবে। সফরকালে তিনি সেখানেই অবস্থান করবেন।

শেয়ার করুন