অনৈতিহাসিক : মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পরও ধর্ষকরা বেপরোয়া

মুহম্মদ শফিকুর রহমান :
ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড এই আইনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষরদানের পরপরই ২০১২ সালে টাঙ্গাইলে একটি গ্যাং রেপের ঘটনায় ৫ ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়া হয়েছে। জাস্ট এর অল্প ক’দিন পরেই গত বুধবারের প্রথম আলোর প্রথম পাতার ডাবল কলাম রিপোর্ট কলেজ ছাত্রীকে নৌকায় তুলে ৫ জনের ধর্ষণ।

ভাবুন। ধর্ষকরা কোনকিছুই কেয়ার করছেনা। যাবজ্জীবনতো ওদের কাছে কোনো ঘটনাই ছিলনা, কিছুদিন কারাভোগ করে একদিন বেরিয়ে আসবে। যে কারণে গণদাবির প্রেক্ষিতে সরকারের ধর্ষণ প্রতিরোধ কর্মসূচির আওতায় সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ করা হয়। তারপরও তারা বেপরোয়া। আমার মনে হয় মুক্তিযুদ্ধকালে পাকিস্তান আর্মি এবং তাদের সহযোগী জামাত-শিবির আলবদর রাজাকাররা যেমন আমাদের মা বোনদের ধর্ষণ করেছে হত্যা করেছে এবং ওটাকে পুণ্যের কাজ মনে করেছে, তেমনি আজকের ধর্ষকরাও তাই মনে করছে। নইলে ধর্ষকের সারিতে এত হুজুর, মাদ্রাসা শিক্ষক, অধ্যক্ষ, মসজিদের ইমাম, মন্দিরের পুরোহিত, গির্জার পাদ্রী ক্যানো?

আগে এক কলামে আমি লিখেছিলাম দ্রুত বিচারের। কোনভাবেই দীর্ঘসূত্রতা চলবেনা। এজন্যে আমি দেশের নাগরিক হিসেবে একটা ফর্মুলাও দিয়েছিলাম যে ধর্ষণের সংবাদ পাওয়ার সাথে সাথে ধর্ষিতার বাড়িতেই আদালত বসাতে হবে। আদালতে থাকবেন ডিস্ট্রিক জাজ, ডিসি, এসপি, ওসি, তদন্ত ওসি, একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, স্থানীয় ইউনিয়ন, সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা, লোকাল ইউনিয়ন চেয়ারম্যান, ওয়ার্ড মেম্বার এই ১১ জনকে নিয়ে গঠিত হবে আদালত এবং আদালত ওই এক বসায় রায় দেবেন এবং রায় কার্যকর করার জন্য পুলিশকে নির্দেশ দেবেন। সরকারকে ধন্যবাদ যে কাগজে দেখলাম শিশু ধর্ষণের বিচার ৭ দিনে শেষ করা হবে। আমি এখনো মনে করি ৭ দিন নয়, এক বসায় বিচার শেষ করা দরকার।

কারণ আমাদের দেশে বিচারের অভিজ্ঞতা সুখকর মোটেই নয়। নইলে ২০১২ সালের গ্যাং রেপের বিচারের রায় কদিন আগে দেয়া হলো? এক্ষেত্রে মনে করা হয় যতক্ষণ পর্যন্ত না বিচার এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পেট ভরছে ততক্ষন পর্যন্ত তারা কিছুতেই বিচারকার্য শেষ করবেনা। এটা সিস্টেম হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সিস্টেম ভাঙতে হবে। যেকোনো মূল্যে।

টাঙ্গাইলের গত বুধবারের ঘটনাটি অনেককেই মর্মাহত করেছে। অনেক শব্দটি ব্যবহার করলাম এজন্যে আজ ধর্ষণবিরোধী সমাবেশের আয়োজন করে ধর্ষকরাই। প্রফেসর ডঃ জাফর ইকবাল এক কলামে লিখেছেন তিনি ধর্ষণ বিরোধী এক সমাবেশে আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে বক্তৃতা করেন। পরে ছবিতে তাকে দেখানো হয় যে ধর্ষণ বিরোধী সমাবেশে তিনি বক্তৃতা করলেন সে ধর্ষণের ঘটনার প্রধান আসামি তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে এবং সে ঐ সমাবেশের অন্যতম আয়োজক। সংসদ সদস্য হিসেবে আমারও একটি সংসদীয় এলাকা রয়েছে। এক থানায় এক কমস্টিটুয়েন্সী এবং প্রায়ই আমাকে বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করতে হয়। যখন দেখি আমার মিছিলে বা সমাবেশে ক্ষণে ক্ষণে বড় ধরনের ভিড় জন্ম নিচ্ছে তখন বুঝি এখানে মাদকাসক্ত কোনো সন্ত্রাসী নিজের চেহারাটা আমার পেছনে দেখানোর জন্য ভিড় করছে। সে তার সহযোগী কাউকে দিয়ে মোবাইলে ছবিটা তুলে নিচ্ছে। এটা সে পুলিশকে দেখাবে এবং পুলিশ স্বভাবত দুর্বল হয়ে যাবে। আমি কাউকে সেলফি তুলতে দেইনা। তারপরও কিভাবে যেন তারা ছবি তুলে নেয় এবং ব্যবহার করে?

সমাজের এই যে অবক্ষয় তার জন্য কে দায়ী? আমরা কাকে দায়ী করব? আমি আপনি না অন্য কেউ? এটা খুঁজতে গেলে আমাদের একটু পেছনে যেতে হবে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বর্বর আর্মি স্থানীয় জামাত শিবির রাজাকার আলবদরদের সহযোগিতায় আমাদের মা বোনদের বাড়ি বাড়ি থেকে ধরে ক্যাম্পে নিয়ে দিনের পর দিন ধর্ষণ করেছে। ৫ লক্ষাধিক নারী সেদিনও পাশধিকতার শিকার হয়েছে। অনেককে ধর্ষণ করতে করতে মেরেও ফেলেছে। গর্ভবতী হয়েছে কয়েক হাজার। দেশ শত্রুমুক্ত হবার অর্থাৎ বিজয় অর্জনের পর তারা সন্তান প্রসব করেছেন। নাম দেয়া হয়েছিল যুদ্ধশিশু। ইউরোপের কয়েকটি দেশ বঙ্গবন্ধুর কাছে আবেদন করে যুদ্ধশিশুদের পালক সন্তান হিসেবে নিয়ে যায়। এই শিশুদের বয়স আজ পঞ্চাশের কাছাকাছি। সেদিন যে নারী গর্ভবতী হয়েছিলেন তার কাছে ঐ গর্ভটা একটা বোঝা ছিল এবং যে সন্তান জন্মে ছিল তাকে কেউ সহ্য করতে পারছিলনা। এই অপকর্মটি ধর্ষক পাকিস্তানি এবং তাদের এ দেশীয় সহযোগীরা করেছে অর্থাৎ পবিত্র ইসলাম ধর্মের নামে। যে কারনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজয়ের পর পরই ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ও রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে দেন এতে করে জামাত-শিবির তখন নাম ছিল ইসলামী ছাত্র সংঘ, মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলামী নিষিদ্ধ হয়ে যায়। একইসঙ্গে জাতির পিতা মদ জুয়া হাউসিং ইত্যাদিও নিষিদ্ধ করে দেন। জাতির পিতা পারিবারিকভাবেই ধার্মিক ছিলেন তাই ধর্মের অবমাননা বা ধর্মের নামে অধর্মের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করে দেন। জনগণ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। কিন্তু জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করে ক্ষমতায় বসে মিলিটারী জিয়াউর রহমান একদিকে যেমন জামাত-শিবির মুসলিম লীগ নেজামে ইসলামসহ ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে তাদের আবার প্রকাশ্যে রাজনীতি করার সুযোগ দেন। এই সুযোগে একাত্তরের ধর্ষকরা আবার সাদা কাপড় পরে সমাজে ভালো মানুষের সুযোগ পেয়ে যায়। মিলিটারি জিয়া একদিকে যেমন জামাতের পলাতক প্রধান গোলাম আযমকে দেশে ফিরতে দেন এবং তার সাথে সাথে জামাতের সবগুলো অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে। একইসঙ্গে জিয়া জাতির পিতার খুনিদের বিদেশি দূতাবাসের বড় বড় চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করে। আরেক মিলিটারি এরশাদ তাদের রাজনীতি করতে দেয় এবং খালেদা জিয়াতো ক্ষমতার অংশীদার করে নেয়। ওই নিজামী-মুজাহিদরা যারা পাকি গণহত্যার এবং নারী নির্যাতনের সহযোগী এবং বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী তাদের গাড়ি-বাড়িতে শহীদের রক্তে রাঙ্গানো পতাকা তুলে দিল। তারা রাস্তায় পুলিশ প্রহরায় পতাকা উড়িয়ে যাচ্ছে আর মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ সন্তানরা ফুটপাতে দাঁড়িয়ে দেখছে আর চোখের জল ফেলছে। এই ছিল তখনকার চিত্র।

এখানে আরেকটি তথ্য সবার জানা দরকার। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ওইসব গণহত্যাকারী বা সহযোগী নারী ধর্ষণকারী বুদ্ধিজীবী হত্যাকারীদের বিচারের জন্য আইন করে দেশব্যাপী ৭৪ টি ট্রাইবুনাল গঠন করেন এবং এই আইনে ৩৯ হাজার রাজাকার-আলবদর কে গ্রেফতার করা হয়। তন্মধ্যে ১১ হাজারের বিরুদ্ধে চার্জশিট হয়ে বিচার শুরু হয় এবং চার জনের মৃত্যুদণ্ডের সাজা হয়। মিলিটারি জিয়া ওই ট্রাইবুনাল বন্ধ করে দিয়ে গ্রেপ্তারকৃত ও সাজা প্রাপ্ত সকল রাজাকার-আলবদর কে মুক্ত করে দেন। এদের সন্তান সন্তানেরা এখন সমাজে দাপটের সাথে ঘুরে বেড়ায় কারণ এদের পাশে রয়েছে মিলিটারী জিয়া প্রতিষ্ঠিত এবং খালেদা-তারেক পরিচালিত বিএনপি-ছাত্রদল। যারা একাত্তরে ওইসব হত্যা নারী ধর্ষণ করেছিল তারা বিকৃত মানসিকতার এবং সন্তানরা সেই বিকৃত মানসিকতার বাপ-মা থেকে জন্ম নেয় বিকৃত প্রজন্ম। এই প্রজন্মের প্রতিনিধি ডাকসুর সাবেক ভিপি নুর যে এখন দলবলসহ ধর্ষণ মামলার আসামি।

আর যে কারণে আমি মনে করি ধর্ষণের ঘটনা বলি নিছক কোন যৌন লালসার ব্যাপার না। এর পেছনে জামাত-শিবিরের ষড়যন্ত্রের রাজনীতি জড়িত কিনা দেখা দরকার। এই জামাত-শিবিরের কাছে দেশ, ধর্ম, নীতি কিছুই নয়। জামাত শিবির কতখানি দেশবিরোধী তা রোহিঙ্গা শিবিরে অনুসন্ধান চালালেই ধরা পড়বে। রোহিঙ্গারা যাতে বাংলাদেশ ভূখণ্ড না ছাড়ে সে জন্য বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে গোপন ষড়যন্ত্র করে চলেছে। কাজেই ঐ কালসাপদের সমাজ থেকে নিশ্চিহ্ন করা ছাড়া ধর্ষণ বলুন সন্ত্রাস বলুন কোন অপরাধই সমাজ থেকে শেষ হবে না।

ঢাকা – ২১ অক্টোঃ ২০২০
লেখক – এমপি, সাবেক সভাপতি ও সাঃ সম্পাদক জাতীয় প্রেসক্লাব
ই-মেইলঃ balisshafiq@gmail.com

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন