অনৈতিহাসিক : সকালে টেলিফোন বাজলে বুক ধুক করে

মুহম্মদ শফিকুর রহমান :

রোজ সকাল যে টেলিফোনটি বাজে তার রিংটোন চেঞ্জ হয়ে বাজে। সঙ্গে সঙ্গে বুকটা ভয়ংকরভাবে ধুক ধুক করে এই বুঝি টেলিফোনের ওপার থেকে কোন আত্মীয় বন্ধু সহকর্মী বা পরিচিত জনের মৃত্যু সংবাদ এলো। এভাবে চলছে তিন মাসাধিককাল ধরে। ঘরেই আছি। সেলফ কোয়ারেন্টাইনে। যে কারণে প্রায় সব টেলিফোন এটেন্ড করি। আজ সকালে দেখলাম দৈনিক প্রথম আলো, ডেইলি স্টারের মালিক লতিফুর রহমানের ছবি প্রথম আলোর প্রথম পাতা জুড়ে ছাপা হয়েছে। বুঝতে খুব একটা বাকি থাকলোনা। গত বুধবার খাবার টেবিলে স্ত্রী জানালেন তার এক ভাগ্নে বউ (মধ্যবয়সী) মারা গেছে। এর আগেও মারা গেছে স্ত্রীর দিকে বাতিজা ডাক্তার ফেরদৌস রহমান ভাগ্নে শিরু (তারাও মধ্যবয়সী)। আমার নিজের দিক থেকে একেবারেই নিকটতম রক্তের সম্পর্ক চাচী চাচাতো ভাই বোন আক্রান্ত হয়েছে তবে আল্লাহপাকের অশেষ কৃপায় তারা সুস্থতার দিকে।

কয়েকদিন আগে চলে গেছেন আমার ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধেয় শিক্ষক বলা যায় গোটা জাতির এমনকি পশ্চিম বাংলার বুদ্ধিজীবীদেরও শিক্ষক অভিভাবক প্রফেসর ডঃ আনিসুজ্জামান স্যার চলে গেলেন। যে মানুষটি কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে বসে থাকেননি, শিক্ষকতা করেছেন জনসেবা বিশ্ববিদ্যালয়েও। অর্থাৎ যখনই দেশে ক্রান্তিকাল নেমে এসেছে তিনি অন্য অনেকের মতো গা বাঁচিয়ে গৃহকোণে বসে থাকেননি, এর একটি বড় কারণ হলো মুক্তিযুদ্ধে তার সংক্রিয় অবদান। আমি এক লেখায় ভুলক্রমে বলেছিলাম তিনি মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন। আমার ভুলটি ধরিয়ে দেন বন্ধু সহকর্মী মঞ্জুরুল আহসান বুলবুল। মূলত আনিস স্যার মুজিবনগর সরকারের প্ল্যানিং কমিশনের সদস্য ছিলেন। ভুলটি ধরিয়ে দেবার জন্য বুলবুলকে ধন্যবাদ।পাশাপাশি আরেকজন দেশপ্রেমিক মানুষ প্রফেসর ডঃ বোরহান উদ্দিন খান জাহাঙ্গীর চলে গেলেন। চলে গেলেন অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী। এদের চলে যাওয়া অনেক মূল্যের।

কোভিড ১৯-এ প্রতিদিনই মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। তিন চারদিন আগে চলে গেলেন আমাদের আরেকজন প্রিয় মানুষ খন্দকার মোজাম্মেল হক। এক সময় ছাত্রলীগ করতেন। মুক্তিযুদ্ধের আগে ফেনী জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতার পর তিনি সংবাদপত্র জগতে প্রবেশ করেন এবং শেষ দিন পর্যন্ত সাংবাদিকতা নিয়ে পড়ে ছিলেন। সৎ মানুষ সৎ সাংবাদিক ছিলেন, জানতেন এতে ব্যাংক ব্যালেন্স বা কানাডায় বেগম পল্লী হবেনা, তবুও পেশাটাকেই আঁকড়ে ছিলেন। বন্ধু হিসেবে ছিলেন অকৃত্রিম। স্বাধীনতার পর তিনি আজকের সূর্যোদয় নামে একটি সাপ্তাহিক কাগজ বের করতেন। কাগজটি উন্নাসিক বুদ্ধিজীবী বা অর্ধমূর্খ সাংবাদিকদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি সত্যি কিন্তু বড় বড় বুদ্ধিজীবীরা গোপনে তার সেই বহুল পঠিত আলোচিত গেদু চাচার চিঠি কলামটি না পড়ে থাকতে পারতেন না। আমরাতো উম্মুখ হয়ে থাকতাম কখন হাতে পাব কাগজটি। গেদু চাচার চিঠি কলামটির একটি বৈশিষ্ট্য ছিল নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষার সাথে ঢাকাইয়া বা ঢাকাইয়া প্রমিত ভাষার মিশ্রণে এমন আবহ সৃষ্টি করতেন, বিশেষ করে রাজনৈতিক বিশ্লেষণে, না পড়ে থাকা যেতোনা। আড্ডার টেবিলেও ছিল দারুণ আকর্ষণীয়। খুব জোরে কথা বলতেননা কিন্তু আওয়ামী লীগ, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধু, প্রধানমন্ত্রীকে এমনভাবে কোমল স্বরে বিশ্লেষন করতে যে চরম বৈরীও পছন্দ না করলেও প্রতিবাদ করতে পারতেন না। দারুন মানুষ ছিলেন খন্দকার মোজাম্মেল হক ওরফে গেদুচাচা। দোয়া করি সবাই কবরে শান্তিতে থাকুন।

অনেকের মতো আমিও ৭৩ পার করে (চলেছি) যা কোভিড ১৯-এর অত্যন্ত প্রিয় বয়স। ডাক যে কোনো মুহূর্তেই আসতে পারে।শুধু মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা যত পাপ করেছি তা মাফ করে যেন ঈমান নিয়ে যেতে পারি। আমিন।

লেখাটা এখানে শেষ করলে ভালো হত। কিন্তু না আরো অনেক কথা বাকি। এখনো অনেক কাজ করতে হবে অনেক কথা বলে যেতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নমিনেশন দিয়ে জাতীয় সংসদ সদস্য বানিয়েছেন। সে দায় পরিশোধ করতে হবে। কালো আফ্রিকার মহান নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা বলেছিলেন and miles to go before we sleep. আমেরিকার বর্ণবাদ বিরোধী নেতা মার্টিন লুথার কিং বলেছেন I have a dream. ভারতের প্রখ্যাত বিজ্ঞানী এবং রাষ্ট্রপতি এ.পি.জে আব্দুল কালাম বলেন ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখার নাম স্বপ্ন নয়, জেগে স্বপ্ন দেখার নামই স্বপ্ন। স্বপ্ন দেখতে হবে, ক্ষুধার্ত পেটেও স্বপ্ন দেখতে হবে।আমাদের জাতির পিতা স্বপ্ন দেখেছিলেন বলেই বাঙালি জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন স্বপ্নই যদি না দেখলাম তবে সামনে তাকাবো কিসের দিকে। বাস্তবায়নই বা করবো কি? তিনি স্বপ্ন দেখাইলেন বলেই :
• স্বপ্ন দেখেছেন বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে?
• হয়েছে।
• স্বপ্ন দেখেছেন ঘরে ঘরে বিদ্যুতের আলো জ্বলবে?
• জ্বলেছে।
• স্বপ্ন দেখেছেন পদ্মা সেতু বানাবেন?
• বানিয়েছেন (কাজ শেষ হবার পথে)
• স্বপ্ন দেখেছেন কর্ণফুলী টানেল বানাবেন?
• বানিয়েছেন (কাজ শেষ হবার পথে)
• স্বপ্ন দেখেছেন ঢাকা মেট্রোরেল হবে?
• হয়েছে (কোভিড ১৯-এর কারণে গতি স্লথ)
• স্বপ্ন দেখেছেন একটি মানুষও গৃহহীন থাকবে না?
• কাজ চলছে।
• স্বপ্ন দেখেছেন কোন মুক্তিযোদ্ধা গৃহহীন থাকবে না?
• কাজ চলছে।
• স্বপ্ন দেখেছেন গভীর সমুদ্র বন্দর হবে?
• হয়েছে।
• স্বপ্ন দেখেছেন ভারতের সাথে সীমান্ত বিরোধ মিটাবেন?
• মিটেছে।
• স্বপ্ন দেখেছেন মায়ানমারের সাথে সমুদ্র সীমানা নির্ধারণ করবেন?
• করেছেন।
• স্বপ্ন দেখেছেন বাংলাদেশ হবে উন্নয়নশীল দেশ?
• হয়েছে।
• স্বপ্ন দেখেছেন উন্নত বাংলাদেশ বানাবেন?
• কাজ এগিয়ে চলেছে।
• স্বপ্ন দেখেছেন বাংলাদেশ বিশ্ব পরিমণ্ডলে সম্মান ও মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হবে
• হয়েছে।
জানি একথা বিএনপি নামক দল এবং তাদের নেতাদের জন্য গ্রাত্রদাহ। এজন্য যে বিএনপি জন্ম থেকে কেবল আওয়ামী লীগের খুঁত খুঁজে বেড়িয়েছে। কাজ করবে কি স্বপ্নইতো দেখে না দেখতে জানে না। স্বপ্ন দেখার জন্য স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটি ঘুরে আসতে হয়। এ অভিজ্ঞতা বিএনপিতে খুব কম। শীর্ষ পর্যায়েতো একেবারেই নেই।এক নেতা বাসায় বসে সাংবাদিকদের কাছে হাছা-মিছা যা খুশি বলে যেতেন আরেক নেতা নয়াপল্টনের কার্যালয়ে বসে হাছা-মিছার প্রতিদ্বন্দিতায় অবতীর্ণ হতেন।দুজনের হাচা-মিছার প্রতিদ্বন্দিতা দলীয় কর্মীরাও বেশ উপভোগ করেন।নারী নেত্রীদের মধ্যে একজন বর্তমান এমপি ও দুইজন সাবেক এমপি নাকে-মুখে অসত্য তথ্য পরিবেশন করেন। ভাগ্যিস তারা জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে এমপি নন এবং ছিলেন না। নইলে ভোটার জনগণই (অবশ্যই মহিলা ভোটার) এক্সপোর্ট কোয়ালিটি লাক্স সাবান দিয়ে ধুয়ে এবং সেনসোডাইন টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত মেজে পবিত্র করে সংসদে পাঠাতেন বা টকশোতে বসতে দিতেন।তাহলে সংসদে কিংবা টকশোতে আর দুর্গন্ধ ছড়াবেনা।

যেভাবে করোনা ছড়াচ্ছে তাতে করে কত দিনের জীবন আমরা কেউ জানিনা। এই আমাদের পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং সমবায়-এর নির্বাচিত চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন চলে গেলেন। অসুস্থ (কোভিড ১৯) হয়ে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন চিকিৎসার জন্য। পৌর ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি কামরুল ইসলাম খবরটি জানিয়ে তার জন্য আইসিইউর ব্যবস্থা করার অনুরোধ জানিয়েছিল। আমি কুমিল্লার নেতা এমপি বাহার ভাইর সাহায্য চাই আইসিইউ-তে একটা বেড ব্যবস্থা করে দিন। বাহার ভাই বলেছিলেন এরপর প্রথম যে বেডটি খালি হবে সেটি তাকে দেওয়া হবে। জানিনা মোতাহার আইসিইউ-তে যাবার সময় পেয়েছিল কিনা? চলে গেলেন। দোয়া করি আল্লাহ যেন তাকে বেহেশত নসিব করেন।
এমনি বহুজন চলে গেছেন।খবরের কাগজ খুললে বা টিভি অন করলে যা দেখি কাউকে চিনি কাউকে চিনি না। তাদেরও রুহের মাগফেরাত কামনা করি।

আল্লাহ পাকের শুকরিয়া যে বন্ধু বঙ্গবন্ধু প্রফেসর লেখক ইতিহাসবিদ ডক্টর মুনতাসির মামুন সুস্থ হয়ে ঘরে ফিরেছেন। পরিবারের সবাইসহ আবেদ খান এখনো সুস্থ হয়ে ওঠেনি। কদিন আগে টেলিফোন করলে বলেছিল সুস্থ হয়ে গেছেন। ২/৩ দিন পর কাগজে দেখলাম আবেদ খান আবার অসুস্থ হয়ে পড়েছেন সাথে তার স্ত্রী ছেলে ছেলের বউ।আমাদের মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের স্ত্রী ইন্তেকাল করেছেন, তিনি এখনো অসুস্থ। আওয়ামী লীগ প্রধান নেত্রী সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন সংক্রমিত।কাগজে দেখলাম তাকে ব্যাংকক পাঠানোর চিন্তাভাবনা চলছে।

কদিন আগে পর পর তিনজন মানুষ কোভিডে ২০১৯ চলে গেলেন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ১৪ দলের সমন্বয়ক সাবেক মন্ত্রী ও বর্তমান সংসদ সদস্য বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর খুব কাছের মানুষ মোহাম্মদ নাসিম, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সংসদীয় আসনে প্রতিনিধি ধর্ম প্রতিমন্ত্রী শেখ আব্দুল্লাহ এবং সিলেটের মানুষের প্রিয় নেতা সাবেক মেয়র বদরুদ্দিন আহমদ কামরান।

দেশটা যখন একটা একটা করে মেগা প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করে এগিয়ে চলছিল এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী মানুষের চাহিদাগুলো পূরণ করে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশত বার্ষিকী (১৭ মার্চ ১৯২০ – ১৭ মার্চ ২০২০) এবং তারপরই স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী (২৬ মার্চ ১৯৭১ – ২৬ মার্চ ২০২১) উদযাপনের প্রস্তুতি চলছিল তখন বাংলাদেশসহ বিশ্বের ২১৩ টি দেশে কোভিড ১৯ বা করোনা ভাইরাস সবকিছু এলোমেলো করে দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এরই মধ্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আবার কৃষিজীবী জনগণ মাঠে নেমেছে, শ্রমজীবী মানুষ কলকারখানায় যেতে শুরু করেছে। এইভাবে বাংলাদেশ তার স্বমহিমায় ঘুরে দাঁড়াবে। আমাদের স্বপ্ন দেখার, স্বপ্ন দেখানোর, স্বপ্ন বাস্তবায়নের দূরদর্শী নেতৃত্ব রয়েছে। আমাদের ভয় কী?

ঢাকা- ০২ জুলাই ২০২০
লেখক- এমপি
সাবেক সভাপতি, জাতীয় প্রেসক্লাব
ই-মেইল- balisshafiq@gmail.com

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন