আগে ভারত পরে চীন

———মুহম্মদ শফিকুর রহমান——–

লক্ষ করার বিষয় হলো সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশ-ভারত, বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক নিয়ে বেশ আলোচনা-সমালোচনা শোনা যাচ্ছে। রাজনৈতিক আড্ডা থেকে শুরু করে পেশাজীবী, ব্যবসায়ী ক্লাব, সাদা কাপড়ের ভদ্রলোকদের ড্রয়িং রুমে। মিডিয়ায় লিখছেনও কেউ কেউ। প্রিন্ট মিডিয়া থেকে শুরু করে সোশ্যাল মিডিয়ায়। মনে হয় কোভিড-১৯ ইনফেকশন ছড়ানোর কারণে রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের কোনো কাজ নেই। পেটে ভাত থাকলে কাজ থাকে না, এ যুগের রাজনৈতিক নেতা, অ্যাকটিভিস্টদের ভাতের অভাব কম, অতএব যত পারো রাজা-উজির মারো।

আমি বহুবার বলেছি ভারত আজ কী করছে না করছে তা যেমন দুই দেশের পর্যায়ে আলোচনার বিষয়, তেমনি ভারতের সঙ্গে অর্ধশতাব্দী আগে দুই দেশের রক্তে লেখা যে ঐতিহাসিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে, তা কোনোভাবেই ভুলে যাওয়া উচিত নয়। কারো সঙ্গে তুলনা করাও শোভন নয়। সম্পর্কটি যেমন রক্তের বন্ধনে গড়া, তেমনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে মহাকালের ইতিহাসের মহানায়ক বাঙালি জাতির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন। তার আগে যুদ্ধের জন্য কোথায় সরকার গঠন করতে হবে, কলকাতার কোন বাড়িতে উঠতে হবে, দেখা করতে হবে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মহীয়সী ইন্দিরা প্রিয়দর্শিনী গান্ধীর সঙ্গে- সবই ঠিক করে রেখেছিলেন। কোথায় কোথায় ট্রেনিং হবে, তা-ও তিনি বলে রেখেছিলেন। তারই প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগ, কৃষক লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা শুরুতে যে যেভাবে যে পথে পেরেছে ভারতে চলে গেছে। কেউ কলকাতা, কেউ আসাম, কেউ আগরতলা। তারপর তো সশস্ত্র যুদ্ধ, দেশের অভ্যন্তরে গেরিলা যুদ্ধ এবং সীমান্ত এলাকায় সরাসরি যুদ্ধ। এই যুদ্ধে বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর পাশাপাশি ভারতের সৈন্যরাও অংশগ্রহণ করেছেন এবং বাংলাদেশের ৩০ লাখ শহীদের পাশাপাশি ভারতেরও ১৩ হাজার, মতান্তরে ১৭ হাজার সৈন্য শহীদ হন। এতে করে মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তের সঙ্গে ভারতীয় মিত্রশক্তির রক্ত মিশে যে ইতিহাস রচিত হয়েছে, তাকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণার পরপরই পাকিস্তানি মিলিটারি জান্তা বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি কারাগারের অন্ধকার ঘরে বন্দী করে। এমনকি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার দুরভিসন্ধি করে এবং জেলের পাশে কবর পর্যন্ত খোঁড়া হয়। বঙ্গবন্ধু তখন বলেছিলেন, ‘তোমরা আমাকে হত্যা করবে জানি। আমি মৃত্যুকে ভয় করি না। কারণ, আমি জানি আমাকে হত্যা করার পরও বাংলাদেশ স্বাধীন হবে। তা ছাড়া, আমি মানুষ, আমি বাঙালি, আমি মুসলমান, মুসলমান একবারই মরে।’ ওই সময়টাতে ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুর জীবন রক্ষা ও মুক্তির জন্য গোটা বিশ্ব ঘুরে বেড়িয়েছেন। প্রভাবশালী দেশের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য। এক তথ্যে জানা গেছে, ওই সময় শুধু সেপ্টেম্বর-অক্টোবর দুই মাসে ৩৭ দেশ সফর ও সেই সব দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে কথা বলেছেন।

এখানেই শেষ নয়, যুদ্ধ শেষে ১৯৭২ সালে মাত্র সাড়ে তিন মাসে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয় এবং আমাদের পুনর্গঠন কাজে সহায়তা করে। সহায়তা করে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্বাসনে। ১ কোটি অসহায় মানুষ ভারতে শরণার্থী হয়েছে, পুল-কালভার্ট সব ভাঙা, যোগাযোগব্যবস্থা বিধ্বস্ত। যেমন গেরিলা কৌশল হিসেবে মুক্তিযোদ্ধারাই পুল-কালভার্ট, রেললাইনের ব্রিজ মাইন দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছিল। এখানে একটি উদাহরণ দিতে চাই। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধে বীরত্বের জন্য সিতারা-এ-জুরাত প্রাপ্ত বেঙ্গল রেজিমেন্টের সুবেদার মেজর জহুরুল হক পাঠানের নেতৃত্বে বাঙালি সৈনিকদের একটি দলকে নিয়ে আমি আমার গ্রামের বাড়িতে ক্যাম্প করি। এখানে তারা ১০-১২ দিন ছিল। গেরিলাদের এক জায়গায় বেশি দিন থাকতে নেই। তখন বর্ষা শুরু হয়ে গেছে। এক রাতে জহুরুল হক পাঠান, সুবেদার আব্দুর রবের নেতৃত্বে একটি দল নৌকা করে আমাদের বাড়ি থেকে ডাকাতিয়া নদী অতিক্রম করে সুন্দরদিয়া বাজারের খাল দিয়ে মধু রোড রেলস্টেশনের কাছে যায়। আমার বয়স কম দেখে পাঠান প্রথমে আমাকে নিতে চাননি। যখন বললাম আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা ফেলে চলে এসেছি। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের কারণে অনার্স ফাইনাল দিচ্ছিলাম, নয়তো এখন এমএ ফাইনাল দেবার কথা ছিল। তখন আপত্তি করলেন না। আমরা মধু রোড স্টেশনের দক্ষিণ পাশে খালপাড়ে জমিদার মধু বাবুর বাড়ির (মধু বাবু নামে রেলস্টেশন ও ব্রিজের নাম) বাগানে অবস্থান নিলাম। ডানে বেঙ্গল রেজিমেন্টের তিনজন এক্সফ্লুসিভ এক্সপার্ট বা বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ ছিল। তারা ক্যান্টননেন্ট ত্যাগ করার সময় বেশ কিছু অস্ত্র-গোলাবারুদ, মাইন নিয়ে আসেন। তাদের দুজন কোমরে মাইন ও তার পেঁছিয়ে খালে সাঁতরে মধু রোড রেলস্টেশনের পাশে রেলব্রিজের নিচে যান এবং কয়েকটি মাইন ব্রিজের পিলারে বসিয়ে দেন। মাইনের বুকে চুম্বক থাকায় সহজেই মাইন লাগানো সম্ভব হয় এবং তার টানতে টানতে অবস্থানে ফিরে আসেন এবং এখান থেকে মেশিনে চাপ দিয়ে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে এবং রেলব্রিজের মাঝের অংশ ভেঙে পড়ে। সেই থেকে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। উদাহরণ হিসেবে আমি নিজের অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করলাম। এইভাবে গেরিলারা দেশব্যাপী পাকিস্তানি মিলিটারির চলাচল বন্ধ করার জন্য পুল-কালভার্ট ভেঙে ফেলেছিলেন। বঙ্গবন্ধু মাত্র সাড়ে তিন মাসে ভারতের সহায়তায় যাতায়াতব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করেন। ওই সময় পাকিস্তানিদের পোতা মাইন সরানোর কাজে ভারতের সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়নও বঙ্গবন্ধু সরকারকে সহায়তা করে।

আগে ভারত পরে চীন

মাত্র সাড়ে তিন মাসে বঙ্গবন্ধু সরকার যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনকাজ সম্পন্ন করে। এখানে আরেকটি তথ্য হলো, এক কোটি শরণার্থী দেশে ফিরে আসে নিঃস্ব অবস্থায়, ৩০ লাখ শহীদ পরিবার, প্রায় ৫ লাখ নির্যাতিত মা-বোন ও তাদের পরিবারের পুনর্বাসন এবং দেশের অভ্যন্তরে ৩ কোটির অধিক মানুষ আজ এ-বাড়িতে কাল ও-বাড়ি করতে করতে নিঃস্ব। এইসব মানুষকে পুনর্বাসন ও সহায়তা দেন। আমেরিকান কবি অ্যালেন গিন্সবার্গ মুক্তিযুদ্ধের মাঝে কলকাতা থেকে যশোর রোড হয়ে বেনাপোল পর্যন্ত আসেন এবং যশোর রোডে কাদামাটি, বৃষ্টির মধ্যে পশ্চিমবঙ্গমুখী শরণার্থীদের লাইন দেখে একটি কবিতা লেখেন-

শিরোনাম : ‘September on jessore road’

“Millions of babies watching the skies
Bellies swollen, with big round eyes
On Jessore Road -long bamboo huts
No place to shit but sand channel ruts

Millions of fathers in rain
Millions of mothers in pain
Millions of brothers in woe
Millions of sisters nowhere to go

One Million aunts are dying for bread
One Million uncles lamenting the dead
Grandfather millions homeless and sad
Grandmother millions silently mad

Millions of daughters walk in the mud
Millions of children wash in the flood
A Million girls vomit & groan
Millions of families hopeless alone

Millions of souls nineteen seventy one
Homeless on Jessore Road under grey sun
A million are dead, the million who can
Walk toward Calcutta from East Pakistan

এই কবিতার মানুষগুলো ফিরে এসে দেখল তাদের কারো বাড়ি পুড়ে ছাই, কারো ঘরের চালার টিন নেই, গেরস্তালি আসবাব নেই, কিছু নেই। এমনি অবস্থায় বঙ্গবন্ধু মাত্র সাড়ে তিন বছরে পুনর্গঠন, পুনর্বাসন কাজ সম্পন্ন করেন। আগে বলেছি যোগাযোগব্যবস্থা পুনঃস্থাপন করা হয় মাত্র সাড়ে তিন মাসে। এ ক্ষেত্রে ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পাশে দাঁড়িয়েছিল।

কেমন ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছিল, তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দিকে তাকালে বোঝা যাবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয় ১ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯ সালে এবং শেষ ২ সেপ্টেম্বর ১৯৪৫ সালে। যুদ্ধ চলেছে ছয় বছর অর্থাৎ ২ হাজার ১৯০ দিন। যুদ্ধে মানুষ মারা গেছে ৫০ থেকে ৫৫ মিলিয়ন এবং যুদ্ধোত্তর রোগশোক অনাহারে-অর্ধাহারে আরো ১৯ থেকে ২৮ মিলিয়ন অর্থাৎ ধরা যায় ৮৩ মিলিয়ন।

আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চিত্র হলো ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত অর্থাৎ ২৬৫ দিন। এ সময়ে শহীদ হয়েছে (লোক মারা গেছে) ৩০ লাখ এবং প্রায় ৫ লাখ নারী নির্যাতিত ও মৃত্যুবরণ করেছেন। ৫ লাখ নারীর মধ্যে সবাই মৃত্যুবরণ করেননি, ধর্ষণের যন্ত্রণা নিয়ে কেউ কেউ এখনো বেঁচে আছেন। যেমন গর্ভবতী হয়েছেন এবং সন্তান জন্ম দিয়েছেন- এমন সংখ্যা সাত-আট শর কম নয়। যাদের নাম দেয়া হয়েছিল যুদ্ধশিশু। এবং তখনই ইউরোপের কয়েকটি দেশ তাদের পালক সন্তান হিসেবে নিয়ে গেছে। তখন প্রশ্ন উঠেছিল ওই সন্তানদের বাপের নাম কী হবে? বঙ্গবন্ধু সঙ্গে সঙ্গে বলে দিলেন ‘লিখে দাও বাবার নাম শেখ মুজিবুর রহমান, ঠিকানা ৩২ নং ধানমন্ডি’।

এই কথাগুলোর পেছনে আমার উদ্দেশ্য হলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধে যত লোক শহীদ হয়েছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের চেয়ে খুব একটা কম নয়। এ থেকে আমাদের দেশের ধ্বংসযজ্ঞেরও পরিমাপ করা যায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জাপানের পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনের সময় লেগেছিল এক দশক বা ১০ বছর। আর বঙ্গবন্ধুর বিচক্ষণ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে আমাদের পুনর্গঠন ও পুনর্বাসনে সময় লেগেছে সাড়ে তিন বছর। জাপানের ওই ১০ বছরকে বলা হয় ERA OF DEVELOPMENT. বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছরকে কি বলা হবে- ERA OF BANGABANDHU? বঙ্গবন্ধুর সাড়ে তিন বছরকে কি বলা হবে- ওই ১০ বছরের ওপর দাঁড়িয়ে জাপান যেমন আজ বিশ্বের উন্নত দেশের একটি, তেমনি বঙ্গবন্ধুর ওই সাড়ে তিন বছরের ওপর দাঁড়িয়ে তারই কন্যা সমসাময়িক কালের শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রনেতা শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বের কাতারে দাঁড় করিয়েছেন।

শুরু করেছিলাম বাংলাদেশ-ভারত আগে না বাংলাদেশ-চীন আগে? বস্তত বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের পাশাপাশি বাংলাদেশ চীন সম্পর্কের কথাটাই আসতে পারে না। ১৯৭১ সালে আমরা যে অস্ত্র দিয়ে পাকিস্তানি মিলিটারির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি সেই অস্ত্র-গোলাবারুদ ছিল ভারতের দেয়া এবং যে অস্ত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি সেগুলো ছিল চীনের। আজ চীন আমাদের ডেভেলপমেন্ট পার্টনার হয়েছে- ভালো কথা। এই মুহূর্তে চীন আমাদের পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেল, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণসহ মেগা প্রকল্পে কাজ করছে। আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। এটি যেমন মনে রাখতে হবে তেমনি মুক্তিযুদ্ধের পর আমাদের জাতিসংঘের সদস্যপদেও চীন ভেটো দিয়েছিল। সেটিই বা ভুলব কি করে। ভারত যেমন তিস্তা নদীর পানি আটকে রেখে দিয়েছে, তেমনি চীনও ইচ্ছে করলে আরাকানি রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরত নিতে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে পারে। অবশ্য মিয়ানমারে ভারতেরও বাণিজ্যিক স্বার্থ কম নয়। আর তাই চীনেরও সময় এসেছে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে ভূমিকা রেখে নিজেদের অপরাধবোধ কমানোর।

ঢাকা, ১৩ নভেম্বর ২০২০
লেখক : এমপি, সদস্য- মুজিববর্ষ জাতীয় কমিটি, সাবেক সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেসক্লাব।
ই-মেইল: balisshafiq@gmail.com

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন