আধিপত্য বিস্তারে সংঘর্ষের আগুনে পুড়ল মসজিদ-মাদ্রাসা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান : ক্ষতিপূরণের দাবি

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
চাঁদপুর শহরের ওয়ারলেস বাজারে ফুটপাত দখল ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিএনপির দুই পক্ষের সংঘর্ষে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে একটি মসজিদ, এতিমখানা-মাদ্রাসা এবং একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পুড়ে গিয়ে কয়েক কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করেছেন ক্ষতিগ্রস্তরা।
ঘটনার পর এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ও উত্তেজনা বিরাজ করছে। ভুক্তভোগীরা প্রশাসনের কাছে সুষ্ঠু তদন্ত, জড়িতদের গ্রেফতার এবং ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছেন।
রোববার রাতে ওয়ারলেস বাজার এলাকায় বাজারের ইজারাদার শফিকুল ইসলাম ও যুবদল নেতা বোরহান গাজীর সমর্থকদের মধ্যে কয়েক দফা সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ফুটপাত দখল ও বাজার নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছিল। এর জেরে রাতের দিকে উভয়পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করলে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও আশপাশের স্থাপনাগুলোতে অগ্নিসংযোগ করা হয় বলে অভিযোগ ওঠে।
আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যবসায়ী মুকতার হোসেনের গাজী পার্টস, বি টি হোমিও হল নামের ওষুধের দোকান, স্থানীয় একটি মসজিদ এবং এতিমখানা-মাদ্রাসা। অগ্নিকাণ্ডে দোকানের মালামাল, আসবাবপত্র, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ও গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র পুড়ে ছাই হয়ে যায়। মসজিদ ও মাদ্রাসার বিভিন্ন কক্ষও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় অনেকেই কিছু উদ্ধার করতে পারেননি।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী মুকতার হোসেন গাজী বলেন, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। দোকানে কোটি টাকার মালামাল ছিল, যা মুহূর্তেই আগুনে ভস্মীভূত হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নই। অথচ অন্যদের আধিপত্য বিস্তারের সংঘর্ষে আজ আমাদের পথে বসতে হয়েছে। অনেক কষ্ট করে, বোনদের মাধ্যমে বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ ও ধারদেনা করে এই ব্যবসা দাঁড় করিয়েছিলাম। এখন আমার সব শেষ হয়ে গেছে। সংসার কীভাবে চলবে, আর লাখ লাখ টাকার ঋণ কীভাবে পরিশোধ করব, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা।
জামিয়া ইসলামিয়া ফজলুল উলূম মাদ্রাসা ও এতিমখানার পরিচালক মো. আল আমিন বলেন, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘটিত আগুনে মসজিদ, মাদ্রাসা ও আশপাশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কোনো কিছুই রক্ষা পায়নি। আগুনে মাদ্রাসার গুরুত্বপূর্ণ আসবাবপত্র, শিক্ষার্থীদের বইপত্রসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রী পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এছাড়া মাদ্রাসার নিচতলায় থাকা মসজিদের এসি রুমের দরজা-জানালাসহ বিভিন্ন স্থাপনার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
তিনি বলেন, এই ক্ষতির পর মসজিদ ও মাদ্রাসার কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া আমাদের জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষজন যদি এখন আমাদের পাশে না দাঁড়ান, তাহলে এতিমখানা ও মাদ্রাসার স্বাভাবিক কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না।
বি টি হোমিও হলের স্বত্বাধিকারী ডা. সায়মন আল মামুন বলেন, তিনি অত্যন্ত দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসেছেন। তার বাবা অনেক কষ্ট করে তাকে লেখাপড়া করিয়েছেন। নিজের চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে জমি বিক্রি, ধারদেনা ও ঋণ করে ওষুধ কিনেছিলেন। কিন্তু ভয়াবহ আগুনে তার পুরো দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। তিনি আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, আমার জীবনের সমস্ত সঞ্চয় ও স্বপ্ন এই দোকানটিকে ঘিরেই ছিল। এখন সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। এত বড় ক্ষতি আমি কীভাবে পুষিয়ে নেব, সেটাই বুঝতে পারছি না।
চাঁদপুর সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ফয়েজ আহমেদ জানান, সংঘর্ষ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। বাজারের ইজারাদার শফিকুল ইসলামের দায়ের করা একটি মামলা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী মুকতার হোসেন লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন, সেটি মামলা হিসেবে গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।
তিনি আরও বলেন, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে। যারা জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শেয়ার করুন