ডাকাতি না অন্য কোনো ঘটনা! রহস্য উন্মোচনে কাজ করছে পুলিশ
ফয়েজ আহমেদ
চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলায় গভীর রাতে এক রহস্যজনক ঘটনায় রিগান আক্তার মিম (২৬) নামের এক গৃহবধূ নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত একই পরিবারের আরেক গৃহবধূ সুমাইয়া আক্তার (২৪) কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। ঘটনাটির প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) দিবাগত রাত আনুমানিক আড়াইটার দিকে শাহরাস্তি পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাত্তলা গ্রামের বেপারী বাড়িতে এ ঘটনা ঘটে।
নিহত রিগান আক্তার মিম ওই গ্রামের মৃত সেলিম বেপারীর পুত্রবধূ। তিনি আড়াই বছর বয়সী কন্যা সাইফা ও চার মাস বয়সী ছেলে সিরাজের জননী। তার স্বামী রনি চাকুরির কারণে ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। ঘটনার সময় বাড়িতে দুই গৃহবধূ, পরিবারের প্রবীণ সদস্য নুরুল ইসলাম এবং তিনটি শিশু ছিল।
আহত সুমাইয়া আক্তার পুলিশকে জানান, রাত ১২টার দিকে তিন মাস বয়সী সন্তানকে নিয়ে নিজ কক্ষে ঘুমিয়ে পড়েন। গভীর রাতে মুখ বাঁধা দুই ব্যক্তি ছুরির মুখে তাকে ও তার শিশুকে জিম্মি করে স্বর্ণালংকার ও মূল্যবান জিনিসপত্র দাবি করে। তিনি আলমারিতে থাকা জিনিসপত্র নিয়ে যেতে বললে তারা তার ওড়না দিয়ে হাত বেঁধে ফেলে এবং হাতুড়ি দিয়ে মাথায় দুই দফা আঘাত করে। পরে তার কানের দুল, আলমারিতে থাকা আরও এক জোড়া দুল ও একটি আংটি নিয়ে পাশের কক্ষে প্রবেশ করে।
তিনি আরও জানান, পাশের কক্ষ থেকে বড় জায়ের কান্নার শব্দ শুনতে পেলেও হাত বাঁধা থাকায় তাকে সাহায্য করতে পারেননি।
পরিবারের প্রবীণ সদস্য নুরুল ইসলাম জানান, রাতে তিনি বাড়ির লোহার গেটে তালা লাগিয়ে চাবি টেবিলের ওপর রেখে ঘুমিয়ে পড়েন। চিৎকার শুনে জেগে উঠে গেট খুলতে গিয়ে দেখেন গেটটি ভেতর থেকে আটকানো থাকলেও তালাটি নেই। পরে বাড়ির বাইরে অক্ষত অবস্থায় তালাটি পাওয়া যায়।
প্রতিবেশী আনোয়ার হোসেন বলেন, রিগান আক্তার মিমের কক্ষ থেকে আর্তচিৎকার শুনে তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে যান। ঘরের ভেতর ধস্তাধস্তির শব্দ শুনে জানালার পাশে গিয়ে ডাকাডাকি করলেও কোনো সাড়া পাননি। পরে আশপাশের লোকজনকে খবর দেওয়া হলে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দেওয়া হয়। স্থানীয়রা বাড়িটি ঘিরে ফেলেন।
একপর্যায়ে চেয়ারম্যান (দাদা শ্বশুর) গেট খুলে দিলে তারা ঘরে প্রবেশ করেন। ছোট গৃহবধূকে হাত বাঁধা অবস্থায় এবং অপর কক্ষে রিগান আক্তার মিমকে মেঝেতে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন। তার গলায় ওড়না পেঁচানো ছিল। স্থানীয়রা ওড়না খুলে তাকে জাগানোর চেষ্টা করলেও কোনো সাড়া মেলেনি। পরে খবর পেয়ে চিকিৎসক এসে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
খবর পেয়ে নিহতের বাবা-মা, ভাই-বোন ও স্বজনরা ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। দুই শিশুসন্তানকে বুকে জড়িয়ে তাদের আহাজারিতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) লুৎফর রহমান, সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (কচুয়া সার্কেল) মো. আব্দুল হাই চৌধুরী এবং শাহরাস্তি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মীর মাহবুবুর রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তারা ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহের কার্যক্রম তদারকি করেন। পরে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য চাঁদপুর সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায়।
ওসি মীর মাহবুবুর রহমান বলেন, ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে।
সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (কচুয়া সার্কেল) মো. আব্দুল হাই চৌধুরী বলেন, ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে পুলিশের একাধিক টিম কাজ করছে। তদন্তের স্বার্থে সব সম্ভাব্য দিক গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত আহত গৃহবধূ সুমাইয়া আক্তারকে ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তের স্বার্থে কাউকেই এখনই দায়ী বা দায়মুক্ত বলা হচ্ছে না। ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত কোনো হত্যাকাণ্ড নাকি অন্য কোনো ঘটনার ফল সেসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় রয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি পুলিশ।