চাঁদপুরে করোনায় মৃত্যুর চেয়ে উপসর্গে মৃত্যু দ্বিগুণ

আল ইমরান শোভন/তালহা জুবায়ের :
দিন যতই যাচ্ছে, চাঁদপুরে ততই করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্য্যা বেড়েই চলছে। সেই সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে করোনায় আক্রান্ত মৃতের সংখ্যা।

অবস্থা এমন পর্যায়ে এসেছে যে, করোনা ভাইরাসে মৃতের চেয়ে উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়ার সংখ্যা দ্বিগুণ কিংবা তার চেয়েও বেশি।

গোপনীয়তা ও অসচেতনতার কারণেই করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে বলে মনে করছেন স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগ।

চাঁদপুর জেলা সিভিল সার্জন মো. সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, অনেকেই করোনার উপসর্গ জ¦র, সর্দি কিংবা কাশি দেখা দিলে চিকিৎসক বা হাসপাতালের স্মরণাপন্ন হন না। বিষয়টি খুবই দুঃখজনক।

এমনও দেখা গেছে, দায়িত্বশীল জনপ্রতিনিধিও বিষয়টি গোপন রাখছেন। এতে যেমন একদিকে শংকা বাড়ছে, অন্যদিকে আক্রান্ত ও উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

সিভিল সার্জন জানান, মঙ্গলবার পর্যন্ত চাঁদপুর জেলায় করোনা ভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে ৮৬জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে করোনা পজেটিভ রিপোর্ট এসেছে ৩৯জনের। এর মধ্যে হাজীগঞ্জে ১২জন, চাঁদপুর সদরে ১১জন, ফরিদগঞ্জে ৪জন, কচুয়ায় ৪জন, মতলব উত্তরে ৪জন, শাহরাস্তি ৩জন, মতলব দক্ষিণে ১জন রয়েছেন।

এদের মধ্যে ৪জন করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর পরে নমুনা সংগ্রহে ৩৫জনের রিপোর্ট করোনা পজেটিভ এসেছে। তাছাড়া ৩৭জনের রিপোর্ট করোনা নেগেটিভ এসেছে। বাকী ১০জনের রিপোর্ট এখনো পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। জেলায় করোনা আক্রান্ত হওয়া পরে সুস্থ হয়েছেন ১০৫জন।

চাঁদপুর শহরের গুণরাজদী এলাকার বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা মো. রুহুল আমিন (৬৭)। করোনা উপসর্গ নিয়ে শুক্রবার চাঁদপুর সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে মারা যান তিনি।

রুহুল আমিনের ছেলে মাহমুদ আমিন বাবু জানান, এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে তিনি জ্বর নিয়ে ভুগছিলেন রুহুল আমিন। পরিবারের লোকজন তাকে শুধুমাত্র নিয়মিত ঔষধ খাওয়াতেন। পাশাপাশি তিনি ডায়াবেটিস ও হার্টের সমস্যায়ও ভুগছিলেন। মৃত্যুর আগে শ্বাসকষ্টেও ভুগেন। কিন্তু করোনায় আক্রান্ত ছিলেন কিনা- সে সম্পর্কে পরিবারের সদস্যরা কিছুই বুঝতে পারেনি।

বাবু বলেন, অবস্থা যখন খুব খারাপ পর্যায়ে যায়, তখন অর্থাৎ বৃহস্পতিবার বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখানকার দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে হাসপাতালে করোনার আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি করান।

বাবু বলেন, বাবা সুস্থ-সবল ছিলেন। শুক্রবার সকালে তিনি বেড থেকে উঠে হাঁটাহাটিও করেন। পাশের রোগীরা তাকে বিশ্রামের জন্য বেডে শুয়ে থাকার জন্য বলেন। বাবা ওই সময় শুয়ে পড়ার কিছুক্ষণের মধ্যে মারা যান।

চাঁদপুর শহরের গুয়াখোলা এলাকার বাসিন্দা জয়দল হোসেন চোকদার (৬৩)। তিনিও সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে করোনার উপসর্গ নিয়ে শুক্রবার সকালে মৃত্যুবরণ করেন।

জয়দলের ছেলে শামীম হোসেন চোকদার বলেন, দুই সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে জ¦রে ভুগছিলেন। তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজধানী ঢাকা ও চাঁদপুরে বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে দ্বারস্থও মিলেনি কোনো সহযোগিতা। শেষ মুহূর্তে পরিবারের লোকজন স্থানীয় সরকারি হাসপাতালে গেলেও বাঁচানো যায়নি তাকে।

২৫০ শয্যাবিশিষ্ট চাঁদপুর সরকারি জেনালের হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. সুজাউদ্দৌলা রুবেল বলেন, রোগীদের মাঝে করোনা ভাইরাসের উপসর্গ দেখা দিলে আমরা সাথে সাথে তাদের আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি দেই। এরপর তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়।

ডা. রুবেল বলেন, অনেক সময় দেখা যায়, রোগীকে মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। তখন আমাদের পক্ষে ওই রোগীকে বাঁচানো সম্ভব হয় না। যখনই রোগীদের মাঝে করোনার উপসর্গ দেখা দেয়, তখন স্বজনরা হাসপাতালে নিয়ে আসলে, কিংবা চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করলে ওই রোগীকে সুস্থ করার ক্ষেত্রে চিকিৎসা সেবা দেয়া যায়।

চাঁদপুর সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাজেদা বেগম পলিন বলেন, অনেক রোগী করোনার উপসর্গ করছেন। তারা চিকিৎসকের সাথে কোনো ধরনের পরামর্শ করছেন না, কিংবা হাসপাতালেও যাচ্ছেন না। আমরা সাধারণ মানুষকে বলছি, আপনারা জ্বর, সর্দি কিংবা কাশি থাকলে চিকিৎসকের কাছে যান।

ডা. পলিন বলেন, অসচেতনতা ও গোপনীয়তার কারণে করোনা উপসর্গে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। লোকজন যদি সচেতন না হয়, তাহলে এই সংখ্যা বাড়তে থাকবে।

ডা. পলিন জানান, চাঁদপুর জেলায় এ পর্যন্ত যারা করোনা উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদের অধিকাংশই মৃত্যুর পর নমুনা সংগ্রহ করা হয়। মানুষের মাঝে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমেই করোনা উপসর্গে মৃত্যু সংখ্যা কমানো সম্ভব।

চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কানিজ ফাতেমা বলেন, করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। জনসাধারণকে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাচলের পাশাপাশি, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলারন জন্য অনুরোধ জানানো হচ্ছে।

ইউএনও বলেন, চাঁদপুরে করোনা পজেটিভে আক্রান্ত কিংবা উপসর্গে মৃত্যুর হার কমানোর জন্য আমরা বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছি। বিশেষ করে এখন থেকে কোনো ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত তার বাড়িসহ আশপাশের বাড়ি কড়াকড়িভাবে লকডাউন বাস্তবায়ন করা হবে। আর গ্রামাঞ্চলের ক্ষেত্রে করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তিসহ আশপাশের কয়েকটি বাড়ি লকডাউন করা হবে। করোনায় আক্রান্ত ব্যক্তি এই নিয়ম লংঘন করলে, তার বিরুদ্ধে জরিমানাসহ আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।

জেলা সিভিল সার্জন অফিস জানায়, মঙ্গলবার পর্যন্ত জেলায় মোট করোনা আক্রান্ত হয়েছে ৪৭৮জন। এরমধ্যে সর্বোচ্চ সংখ্যক ১৬২জন আক্রান্ত হয়েছে চাঁদপুর সদর উপজেলায়। তাছাড়া শাহরাস্তিতে ৬৩জন, হাজীগঞ্জে ৫৮জন, ফরিদগঞ্জে ৫৭জন, মতলব দক্ষিণে ৫০জন, কচুয়ায় ২৮জন, হাইমচরে ৩৩জন ও মতলব উত্তরে ২৭জন আক্রান্ত হয়েছে।

চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক মো. মাজেদুর রহমান খান বলেন, করোনা রোধে আমরা শুরু থেকে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। আমরা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। রোববার করোনা ভাইরাস প্রতিরোধ কমিটির এক ভার্চুয়াল সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে করোনা রোধে আমরা গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি।

জেলা প্রশাসক বলেন, বর্তমানে করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে সরকার যেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে, আমরা সেই সিদ্ধান্ত মোতাবেক কাজ করছি। তবে চাঁদপুরের কোনো এলাকা সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ‘রেডজোন’-এর আওতায় পড়েনি।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন