চাঁদপুরে ডায়রিয়া আক্রান্ত বাড়ছে হু হু করে : আইসিডিডিআরবিতে প্রতি ঘন্টায় ভর্তি ১৪!

তালহা জুবায়ের :
গরম আবহাওয়া আর জলবায়ুর প্রভাবে ডায়রিয়া ও কলেরায় আক্রান্ত রোগীর চাপ বৃদ্ধি পেয়েছে চাঁদপুরে। শুধু চাঁদপুর নয়, আশপাশের জেলা থেকেও রোগীরা ছুটে আসছেন মতলবে অবস্থিত ‘আইসিডিডিআরবি’ বিশেষায়িত হাসপাতালে। ধারণ ক্ষমতার কয়েকগুন বেশি হওয়ায় নির্ধারিত আসনের বাইরেও রোগীদের দেওয়া হচ্ছে চিকিৎসা সেবা। পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হয়ে বর্তমানে ঘন্টায় প্রায় ১৪জন রোগী ভর্তি হচ্ছে এখানে। এছাড়া চাঁদপুর সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত রোগীর চাপ বাড়ছে।

বুধবার সরেজমিন চাঁদপুরের মতলব আইসিডিডিআরবি হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন বাহনে করে একের পর এক রোগী নিয়ে আসছেন স্বজনরা। ডায়রিয়া ও কলেরায় আক্রান্ত হয়ে চাঁদপুর সদরসহ বিভিন্ন উপজেলা ও পাশর্^বর্তী ল²ীপুর, ফেনী, নোয়াখালী, শরীয়তপুর ও কুমিল্লাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে রোগীরা ছুটে আসছে এখানে। নারী, পুরুষ, শিশু, তরুণ বা বৃদ্ধ কেউ বাদ যাচ্ছে না রোগীর তালিকা থেকে। গরম আর আবহাওয়াজনিত কারণে পেটের পীড়ায় অসুস্থ হয়ে পড়েছে মানুষজন।

গত ৩০ মার্চ থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত হাসপাতালটিতে পেটের পীড়াজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ২২৪০জন রোগী। গত বছর একই সময়ে রোগীর সংখ্যা ছিল এর অর্ধেক ১১২২জন। সাধারণ সময়ে গড়ে প্রতিদিন রোগী ভর্তি হয় ১০০ থেকে ১২০জন।

চাঁদপুর শহরের মিশন রোডের বাসিন্দা হোসনে আরা বেগম বলেন, আমার চার মাস বয়সী বাচ্চাটা গতকাল রাত থেকে অনেক বার পাতলা পায়খানা ও বোমি করছিল। কোন অবস্থাতেই পায়খানা সাড়ছিল না। পরে আজকে দুপুর বেলা হাসপাতালে এসে ভর্তি হই। এখানে ঔষধের পাশাপাশি খাবার স্যাইন দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে কিছুটা ভালো আছে।

কুমিল্লা থেকে আসা আরেক রোগী রোকসানা আক্তার বলেন, গত দুপুর থেকে গরমে পেট ফ্যাপা দেয়। সন্ধ্যার পর থেকে পাতলা পায়খানা শুরু হয়। রাতে কম করে ১৫- ২০ বার টয়লেটে যাই। একপর্যায়ে খিচুনী নিয়ে অজ্ঞান হয়ে পরি। আজকে সকালে পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে এনে ভর্তি করায়। শরীরে পানি শূণ্যতার কারণে দু’টি স্যালাাইন দিয়েছে। আরো দেওয়া লাগতে পারে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

ফরিদগঞ্জ থেকে আসার এক রোগীর অভিভাবক বলেন, চাঁদপুরে বর্তমানে ডায়রিয়ার রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক বেশি। কিন্তু আইসিডিডিআরবি হাসপাতালে এই রোগের সব চেয়ে ভালো সেবা পাওয়া যায় বলে এতো দূর থেকে এখানে নিয়ে এসেছি রোগী। এখানো রোগীর অনেক চাপ থাকলেও ডাক্তার ও নার্সরা তাদের সাধ্যমত সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

আইসিডিডিআরবি হাসপাতালের ডিউটি ডাক্তার ফাতেমাতুজ জোহরা বলেন, এই সময়টা ডায়েরিয়া ও কলেরার মৌসুম হলেও এ বছরের চিত্রটা ভিন্ন। প্রতিদিন প্রচুর পরিমানে রোগী ভর্তি হচ্ছে। এতে করে আমরা রোগীদের সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছি। তবুও আমরা কোন প্রকার বিরক্ত না হয়ে রোগীদের সর্বোচ্চ সেবাটুকু দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্যমতে, পেটের পীড়াজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে গত মাসে এখানে চিকিৎসা সেবা নিয়েছেন ৪ হাজার ১২৫জন রোগী। গেল সপ্তাহে সেবা নিয়েছেন ২ হাজার ২৪০। এর মধ্যে ৩০ মার্চ ৩১৪জন, ৩১ মার্চ ৩০৫জন, ১ এপ্রিল ৩১১জন, ২ এপ্রিল ৩০০জন, ৩ এপ্রিল ২৯৪জন, ৪ এপ্রিল ৩৫২জন, ৫ এপ্রিল এ যাবত কালের সর্বোচ্চ ৩৬৫জন। প্রতি ঘন্টায় প্রায় ১৪জন রোগী হাসপাতালটিতে ভর্তি হচ্ছেন। তাছাড়া ৬ এপ্রিল দুপুর ১২টা পর্যন্ত ভর্তি হয়েছে ২০৯জন রোগী। ভর্তি হওয়া রোগীরা স্বাস্থ্য সেবা পেয়ে দ্রুতই তাদের বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন।

মতলব স্বাস্থ্য ও গবেষণা কেন্দ্র আইসিডিডিআরবি’র প্রধান ডা. মো. আলফজল খান বলেন, গরম ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ডায়রিয়ার প্রকোপ বৃদ্ধি হয়ে থাকতে পারে। প্রতিদিনই প্রচুর পরিমানে রোগী পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হয়ে আমাদের হাসপাতালে এসে ভর্তি হচ্ছে। আমরাও তাদের সাধ্যমত সেবা দিয়ে যাচ্ছি।

তিনি বলেন, হাসপাতালের সিট সংখ্যা ৭০টি হলেও বর্তমানে প্রতিদিন রোগী আসছে ৩ শতাধিক। কোন রোগী যাতে চিকিৎসা বঞ্চিত হয়ে ফিরে না যায় তাই বাধ্য হয়ে হাসপাতালের বারান্দায় বিছানা পেতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অধিকাংশ রোগীই পানিশূণ্যতায় ভোগা নিয়ে এখানে আসছে। তাই তাদেরকে স্যালাইন দেওয়া লাগছে। ডায়রিয়া থেকে বেঁচে থাকার জন্য পরিষ্কার নিরাপদ পানি পান করার পাশাপাশি টাটকা খাবার গ্রহণের জন্য জনসাধারণকে পরামর্শ দিয়েছে তিনি।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।