চাঁদপুর সদর আইসোলেশনের ৩ মাস : করোনায় মৃত্যু ৮.১০% অন্য রোগে ৮.৬৯%

রহিম বাদশা :
চাঁদপুর সরকারি জেনারেল (সদর) হাসপাতালে করোনার উপসর্গে চলতি মাসের শুরুর দিকে ক’দিনের ব্যবধানে বেশ কয়েকজন ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনায় সারা জেলায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এর মধ্যে নমুনা পরীক্ষায় ক’জনের করোনা শনাক্ত হয়।

তখন কেউ কেউ ‘মৃত্যুপুরী’ হিসেবেও আখ্যায়িত করেন জেলার সর্বোচ্চ পর্যায়ের এই সরকারি হাসপাতালকে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আনা হয় বিস্তর অভিযোগ। এছাড়া হাসপাতালের চিকিৎসাসেবায় অবহেলা নিয়েও অভিযোগ অনেকের। তবে তিন মাসের আইসোলেশন ওয়ার্ডের পরিসংখ্যান ও চিকিৎসক-কর্মকর্তারা বলছেন ভিন্ন কথা।

সদর হাসপাতাল সূত্রে জানানো হয়েছে, করোনায় আক্রান্ত/শনাক্ত হয়ে চিকিৎসা নেওয়া কোনো ব্যক্তি এখন পর্যন্ত এই হাসপাতালে মারা যাননি। গত তিন মাসে এই হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে মারা যাওয়া ২৫জনের মধ্যে ৯জন ছিলেন করোনায় আক্রান্ত। তাদের প্রায় সবাই মৃত্যুর কয়েক ঘন্টা আগে হাসপাতালে এসেছিলেন। কেউ কেউ ভর্তি হওয়ার কিছু সময়ের মধ্যে মারা যান। মৃত্যুর পর তাদের করোনা টেস্টের পজেটিভ রিপোর্ট আসে।

সূত্র জানায়, দেশে করোনা সংক্রমণের পর ২৭ মার্চ করোনায় আক্রান্ত/সন্দেহভাজন রোগীদের সেবা দেওয়ার জন্য চাঁদপুর সদর হাসপাতালে আইসোলেশন ওয়ার্ড স্থাপন করা হয়। প্রথমে হাসপাতাল সংলগ্ন একটি পৃথক ভবনে সীমিত পরিসরে আইসোলেশন ওয়ার্ডের কার্যক্রম চলে। পরবর্তীতে রোগী বৃদ্ধির কারণে হাসপাতালের মূল ভবনের দ্বিতীয়তলায় আইসোলেশন ওয়ার্ড স্থানান্তর করা হয়। সেখানে করোনায় আক্রান্ত ও সন্দেহভাজনদের জন্য পৃথক দু’টি ইউনিট রয়েছে।

সূত্র আরো জানায়, গত তিন মাসে (২৭ মার্চ-২৭ জুন) সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে করোনা সন্দেহে অসুস্থ অবস্থায় মোট ২৯৫জনকে ভর্তি করা হয়। নমুনা টেস্টের মাধ্যমে এদের মধ্যে ১১১জনের করোনা শনাক্ত হয়। আর ১৮৪জনের নমুনা টেস্টের রিপোর্ট করোনা নেগেটিভ আসে। করোনায় আক্রান্ত হয়ে ভর্তিকৃতদের মধ্যে কয়েকজন ঢাকা, নারায়ণগঞ্জে নমুনা পরীক্ষায় শনাক্তের পর এখানে এসে চিকিৎসা নিয়েছেন।

সদর হাসপাতালের আরএমও ও করোনা বিষয়ক ফোকালপার্সন ডা. সুজাউদ্দৌলা রুবেল চাঁদপুর প্রবাহকে জানান, গত তিন মাসে এই হাসপাতালে করোনায় আক্রান্ত ১১১জন রোগীর মধ্যে ৯জন মারা গেছেন। এদের সবাই প্রচন্ড শ্বাসকষ্ট নিয়ে মৃত্যুর কয়েক ঘন্টা আগে হাসপাতালে এসেছিলেন। ফলে কার্যত তাদের চিকিৎসার আওতায় সেভাবে আনা যায়নি। প্রাথমিক পর্যায়ে এসব লোক হাসপাতালে আসলে তাদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া যেত।

তাদের মৃত্যুর পর নমুনা টেস্টের রিপোর্ট আসে করোনা পজেটিভ। অর্থাৎ করোনা শনাক্ত রোগী হিসেবে সেবার আওতায় আসেননি তারা। আর করোনা শনাক্ত হয়ে যারা চিকিৎসা নিয়েছেন তাদের মধ্যে আল্লাহর রহমতে এখন (২৭ জুন সন্ধ্যা) পর্যন্ত কোনো মৃত্যুর ঘটনা নেই সদর হাসপাতালে।

তিনি বলেন, অক্সিজেন সংকটে প্রচন্ড শ্বাসকষ্টে ভোগা রোগীর জন্য হাই ফ্লো অক্সিজেন জরুরী। কিন্তু সদর হাসপাতালে এখনো এই ব্যবস্থা না থাকায় আমরা জরুরী রোগীদের সেই সেবা দিতে পারছি না। তবে সিলিন্ডার অক্সিজেনের মাধ্যমে আমরা তাদের সুস্থ করা চেষ্টা করি। যাদের অবস্থা বেশি খারাপ মনে করি তাদেরকে ঢাকা রেফার করি।

তিনি আরো বলেন, করোনায় আক্রান্ত নন (নন কোভিড) এমন আরো ১৮৪জন আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিয়েছেন গত তিন মাসে। করোনার সন্দেহভাজন রোগী হিসেবে তাদের আইসোলেশন ওয়ার্ডে প্রথমে ভর্তি করা হলেও পরে নমুনা টেস্টে গেছে তারা করোনায় আক্রান্ত নন। এমন রোগীর মধ্যে মারা গেছেন ১৬জন। তাদেরও অধিকাংশ’ই হাসপাতালে আনার কয়েক ঘন্টা পরে মারা গেছেন।

হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. এ.কে.এম. মাহাবুবুর রহমান জানান, গত তিন মাসে চাঁদপুর সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে মোট রোগী ভর্তি হয়েছেন ২৯৫জন। এর মধ্যে কোভিড রোগী ১১১জন ও নন কোটিভ ১৮৪জন। মৃত ২৫জনের মধ্যে কোভিড আক্রান্ত ৯জন ও নন কোভিডের ১৬জন। এর মধ্যে করোনা শনাক্তকৃতদের মধ্যে মৃত্যুর শতকরা হার ৮.১০ ভাগ আর অন্যান্য রোগে আক্রান্তদের মৃত্যুর শতকরা হার ৮.৬৯ ভাগ। অথচ কেউ কেউ না জেনেই হাসপাতালের মৃত্যুহার নিয়ে গুজব ছড়াচ্ছেন।

এর বাইরে শনিবার উল্লেখিত আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তিকৃত রোগীর সংখ্যা ছিল ২৫জন। এর মধ্যে করোনায় আক্রান্ত ১০জন ও অন্য রোগে আক্রান্তের সংখ্যা ১৫জন। এই হাসপাতালের আওতায় করোনায় আক্রান্ত আরো ৪৮জন হোম আইসোলেশনে আছেন। তাদের অনেকের দ্বিতীয় নমুনা রিপোর্ট অপেক্ষমান।

তিনি বলেন, আশার কথা গত ৭ দিনে আইসোলেশন ওয়ার্ডে উপসর্গেও কেউ মারা যায়নি। রোগীদের কাছে অনুরোধ জ্বর, গলা ব্যথা এবং শ্বাসকষ্ট হলে বাড়িতে বসে থাকবেন না। আমাদের সাথে যোগাযোগ করবেন। শেষ সময়ে হাসপাতালে না এসে প্রাথমিক পর্যায়ে আসুন। তাহলেই চিকিৎসার আওতায় আনা সম্ভব।

যদিও গত ক’দিনে জটিল পর্যায়ের কয়েকজন রোগীকে ঢাকায় রেফার করা হয়েছে চাঁদপুর সদর হাসপাতাল থেকে। এ নিয়েও কারো কারো অভিযোগ, প্রয়োজন নেই এমন রোগীকেও ঢাকা রেফার করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে সহকারী পরিচালক ডা. এ.কে.এম. মাহাবুবুর রহমান বলেন, আসলে অনেকে না জেনে, না বুঝে কিছু অভিযোগ করে থাকেন। আমি বলবো কেউ যদি সদর হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে আসেন এবং চিকিৎসা পদ্ধতি দেখেন তবে তাদের ভুল ভাঙবে। বিশেষ করে কর্তব্যরত ডাক্তার ও নার্সরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনায় আক্রান্ত রোগীদের সেবায় যেভাবে নিয়োজিত তার জন্য আমি তাদের স্যালুট জানাই।

তিনি জানান, আইসোলেশন ওয়ার্ডে সার্বক্ষণিক একজন করে ডিউটি ডাক্তার থাকেন। ৮ ঘন্টা পরপর নতুন ডাক্তার দায়িত্ব পালন করেন। আর ৪জন নার্স, ৩/৪জন করে আয়া ও মালি টানা ৫/৬ দিন আইসোলেশন ওয়ার্ডে থেকে সেবা দেন। সেখানে তারা থাকেন, খাওয়া-দাওয়া করেন। এরপর তাদের একটি হোটেলে নিয়ে নমুনা পরীক্ষা করা হয়। রিপোর্ট করোনা নেগেটিভ আসলে তবেই তারা বাড়ি/বাসায় যেতে পারেন। আক্রান্ত হলে তাদেরও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাদের স্থলে আসে আরেকটি নতুন ব্যাচ।

তিনি আরো জানান, আইসোলেশন ওয়ার্ডে চিকিৎসা সেবা দিতে যেয়ে এ পর্যন্ত কয়েকজন ডাক্তার ও নার্স করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। তারপরও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা করোনায় আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

তিনি বলেন, এসব স্বাস্থ্যকর্মীকে নিয়ে কোনো মিথ্যা অভিযোগ সীমাহীন কষ্টের বিষয়। হাই ফ্লো অক্সিজেন প্রয়োজন এমন রোগীদের রেফার করাই যুক্তিসঙ্গত বলে মন্তব্য করেন তিনি।

হাসপাতালের এই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা অব্শ্য স্বীকার করেন, নমুনা টেস্টের রিপোর্ট আসতে দেরী হওয়া এবং হাই ফ্লো সেন্ট্রাল অক্সিজেন ব্যবস্থা না থাকায় রোগীদের সঠিক সময়ে সঠিকভাবে চিকিৎসা সেবা দেওয়া সম্ভব হয় না। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তারপরও চিকিৎসক ও নার্সরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন রোগীদের সুস্থ করার জন্য।

তিনি আশা করেন, শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপির মাধ্যমে চাঁদপুরে সহসা করোনা টেস্ট ও হাই ফ্লো সেন্ট্রাল অক্সিজেন ব্যবস্থা চালু হলে রোগীদের আরো অনেক ভালো সেবা দেওয়া যাবে। তখন রোগী রেফারও অনেক কমে যাবে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন