চোরকে চিনে ফেলায় খুন হন নুরুল-কামরুন দম্পত্তি

তালহা জুবায়ের :
নুরুল আমিন (৬৫) ও তার স্ত্রী কামরুন নাহার (৬০) দুজনই ছিলেন সরকারী কর্মকর্তা। স্বামী-স্ত্রী দুজনই ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সমাজসেবা কর্মকর্তা। বিভিন্ন সময় প্রায়ই তারা ব্যাংকে যাতায়াত করতেন। তাদেরকে নিজের রিক্সা চড়িয়ে ব্যাংকসহ বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যেতেন তাদের দীর্ঘ দিনের পরিচিত প্রতিবেশী রিক্সাচালক মো. আব্দুল মালেক। ঘনঘন ব্যাংকে যাতায়াত করায় অনেক আগে থেকেই ছিচকে চুরির সাথে জড়িত মালেক ফন্দি আটে ওই দম্পত্তির ঘরে চুরি করার। পরবর্তীতে এই ছিচকে চোরের হাতেই নিজ বাড়িতে খুন হন ওই দম্পত্তি। তারা চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলার নাওড়া এলাকা নিজ বাড়িতে বসবাস করতেন। তাদের এক ছেলে ও ৩ মেয়ে রয়েছে।

চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে চাঞ্চল্যকর নুরুল আমিন দম্পতি হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন শেষে সাংবাদিকদেও সাথে প্রেসবিফিং কালে এসব তথ্য জানাচ্ছিলেন পিবিআই’র পুলিশ সুপার খন্দকার নূর রেজওয়ানা পারভীন। শনিবার সন্ধ্যায় শহরতলী বাবুরহাট এলাকায় অবস্থিত পিবিআই’র কার্যালয়ে এই প্রেস বিফিং করা হয়। ইতিমধ্যে এই হত্যাকান্ডে সরাসরি জড়িত এক আসামীসহ ৩জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। শনিবার দুপুরে তাদেরকে কোর্টের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ।

গ্রেফতারকৃত আসামীরা হলেন- খুনের সাথে জড়িত শাহরাস্তি উপজেলার ঘুঘুসাল এলাকার মো. আবদুল মালেক, চুরি যাওয়া মালামাল ক্রয়কারী আসামী ঝালকাঠি সদর উপজেলার গাবখান এলাকার মো. ইলিয়াস হোসেন ও বরিশাল জেলার কাউনিয়া উপজেলার চরবাড়ীয়া এলাকার মো. বশির। তারা উভয়েই চাঁদপুর শহরে বসবাত করতেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।

পুলিশ সুপার বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী গত ২৯ জুন সন্ধ্যায় বাড়ির মূল গেইট খোলা পেয়ে আ. মালেক ওই দম্পত্তির বাড়ির ছাদে কৌশলে অবস্থান নেয়। রাত ৯টার দিকে নুরুল আমিন ছাদে উঠলে পিছন থেকে আ. খালেক তার সাথে থাকা লোহার রড দিয়ে সজোরে তার মাথায় আঘাত করে। তার পরিচয় প্রকাশ হওয়ার ভয়ে ছাদে শুখাতে দেওয়া পায়ের মোজা দিয়ে শ্বাসরোধ করে সেখানেই হত্যা করে তাকে। পরবর্তীতে চুরি করতে বিল্ডিংয়ের একটি রুমে ভেতরে প্রবেশ করে একটি ফাইল কেবিনেটের ড্রয়ার টানাটানি করতে থাকে। এ সময় ড্রয়ার খোলার শব্দ শুনতে পেয়ে ঘরের লাইট জ্বালিয়ে আ. মালেক কে দেখে চিনে ফেলে কামরুন্নাহার। এটিই কাল হয়ে দাঁড়ায় তার জন্য। তখন আ. খালেক তার হাতে থাকা রড দিয়ে কামরুন্নাহারের মাথায় আঘাত করে। এতে করে তিনি ফ্লোরে পড়ে যায় এবং তার মাথা বেয়ে রক্ত পড়তে থাকে। পরবর্তীতে নুরুল আমিনের ব্যবহৃত একটি অপো এ-৮৩ মডেলের একটি মোবাইল ফোন নিয়ে ছাদ থেকে গাছ বেয়ে নিচে নেমে পালিয়ে যায়। পরবর্তীতে ১ জুলাই সংবাদ পেয়ে ঘরের তালা ভেঙে মৃত অবস্থায় নুরুল আলমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় অজ্ঞান অবস্থায় তার স্ত্রী কামরুন নাহারকে উদ্ধার করে ঢাকায় পাঠানো হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনিও মারা যান। এই ঘটনায় নিহতদের ছেলে মো. জাকারিয়া বাবু বাদী হয়ে শাহরাস্তি থানায় অজ্ঞাতদের আসামী করে একটি মামলা দায়ের করেন।

তিনি বলেন, মামলাটি প্রায় এক মাস শাহরাস্তি থানা পুলিশ তদন্ত করে। পরবর্ততে তদন্তাদীন অবস্থায় মামলার বাদীর আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত এই মামলার পরবর্তী তদন্ত পিবিআইকে করার নির্দেশ দেয়। পরবর্তীতে পিবিআই এর পুলিশ পরিদর্শক মো. কবির আহমেদ মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেন।

তিনি বলেন, পিবিআই এর ডিআইজ বনজ কুমার মজুমদার স্যারের তত্ত্বাবধানে আমরা শুরু থেকেই এই ঘটনায় নিবিড় ভাবে তদন্ত কাজ চালু রাখি। আমরা এই ঘটনার ক্লু উদঘাটনে ব্যাপকভাবে কাজ করেছি। শাহরাস্তির প্রতিটি অঞ্চলে সন্দেহভাজন মানুষদের এনে এই ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদ করি। বিশেষ করে এই ঘটনায় চুরি যাওয়া মোবাইল নিয়ে আগে থেকেই আমাদের নজরদারীতে চাঁদপুরের একজনকে রেখেছিলাম। পরবর্তীতে গোপন সোর্সের মাধ্যমে তাকে আমরা ফলো করতে থাকি। আমরা নিশ্চত হই সেই সন্দেহভাজন ঝালকাটিতে রয়েছে।

পরবর্তীতে চাঁদপুর থেকে পিবিআই এর একটি টিম পাঠিয়ে সেই সন্দেহভাজনকে ধরতে সমর্থ হই। তাকে গত ১৯ অক্টোবর ঝালকাটি জেলার গাবখান এলাকা থেকে মো. ইলিয়াস হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়। এসময় তার কাছ থেকে চুরি যাওয়া মোবাইল সেটটি উদ্ধার করা হয়। এসময় তিনি আমাদের বলেন, মোবাইলটি চট্টগ্রামের ফুটপাতের একজন হকারের কাছ থেকে ক্রয় করেছেন, তবে তিনি তার নাম বলতে পারেনি। পরে তাকে সঙ্গে নিয়ে আমরা ঘটনাস্থলে খোঁজ করে সেই হকার বশিরকে গ্রেফতার করি। এ সময় বশির বলেন, প্রায় দুই মাস আগে চাঁদপুরের শাহরাস্তি থেকে একজন এই ফোন সেটটি বিক্রি করতে এসেছিল। মোবাইলের দাম সাড়ে ৩হাজার টাকা দাবি করে আবদুল মালেক। কিন্তু বশিরের কাছে এতো টাকা না থাকায় তার মাধ্যমে ২৫টাকার বিনিময়ে মাবাইল সেটটি ক্রয় করেন ইলিয়াস হোসেন। এর জন্য বশিরকে ৫শ টাকা দেয় ইলিয়াস।

পুলিশ সুপার বলেন, এই ঘটনায় পরে ২১ অক্টোবর আবদুল মালেককে গ্রেফতর করতে শাহরাস্তি, চট্টগ্রামের রিয়াজ উদ্দিন কাচাবাজার আড়তে ও লাকসাম এলাকায় অভিযান চালাই। পরবর্তীতে বশিরের দেওয়া তথ্যে আমরা জানতে পারি আবদুল মালেক রিয়াজ উদ্দিন কাঁচা বাজারে মাল আনডোল-আপলোড করে। আবদুল মালেক অনেকটা সময় আত্মগোপনে থাকার চেষ্টা করে। পরবর্তীতে ২২ অক্টোবর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে লাকসাম রেলওয়ে সংযোগের পাশে একটি বডিং থেকে সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ছদ্দবেশে থাকা আমার অফিসাররা অনেক মানুষের উপস্থিতিতে আবদুল মালেককে গ্রেফতার করতে সমর্থ হয়। পরবর্তীতে তাকে চাঁদপুর পিবিআই কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয় এবং তাকে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। এ সময় তিনি আমাদের সাথে খুনের সকল কিছু বিস্তারিত ভাবে তুলে ধরেন। পরে তাকে নিয়ে শাহরাস্তি গিয়ে হত্যাকান্ডের আলামত উদ্ধার করা হয়। তিনি বলেন, আবদুল মালেক অনেক আগে থেকেই এলাকায় ছিচকে চুরির সাথে জড়িত ছিল। তার বিরুদ্ধে থানায় মামলাও রয়েছে বলে জানান তিনি।

এই ঘটনায় মামলার বাদী নিহত নুরুল আমিন দম্পত্তির ছেলে মো. জাকারিয়া বাবু বলেন, আমরা পিবিআই এর এই কার্যক্রমে অত্যন্ত খুশি। পুলিশ এভাবে মানুষের জন্য কাজ করতে তাদের প্রতি সাধারণের আস্থা ও ভালোবাসা আরো বৃদ্ধি পাবে। আমি প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। একই সাথে আমার বাবা-মায়ের হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানাই।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন