🔴 শরীফুল ইসলাম
কিছু শহরকে শুধু মানচিত্রে খুঁজে পাওয়া যায় না। কিছু শহরকে খুঁজে পেতে হয় মানুষের স্মৃতিতে। চাঁদপুর তেমনই একটি শহর যার সঙ্গে নদীর গন্ধ মিশে আছে, মিশে আছে ইলিশের রুপালি ঝিলিক, পুরোনো ঘাটের কোলাহল, বুকস্টলের সামনে দাঁড়িয়ে পত্রিকা পড়ার দৃশ্য, বিকেলের মাঠ আর পরিচিত মানুষের অকৃত্রিম আড্ডা। আজকের চাঁদপুরকে দেখে হয়তো নতুন প্রজন্মের অনেকেই ভাববে এমনই তো ছিল শহরটি! কিন্তু যারা কয়েক দশক আগের চাঁদপুর দেখেছেন, তারা জানেন এই শহরেরও একটি অন্যরকম মুখ ছিল। সেই মুখটি এখন ধীরে ধীরে স্মৃতির কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে।
একসময় চাঁদপুর মাছঘাট মানেই ছিল এক অন্যরকম দৃশ্য। ভোর না হতেই ঘাটে শুরু হয়ে যেত মানুষের ছোটাছুটি। নদী থেকে একের পর এক নৌকা এসে ভিড়ত। নৌকা থেকে নামত ইলিশ। তারপর শুরু হতো আড়তে আড়তে হাঁকডাক।হাজার হাজার মণ ইলিশ সরবরাহ হতো চাঁদপুর মাছঘাটে। বড় বড় ইলিশের স্তুপ পড়ে থাকত আড়তের সামনে। বরফের ওপর রুপালি মাছের সারি দেখে চোখ জুড়িয়ে যেত। চারপাশে ক্রেতা-বিক্রেতার দরদাম, শ্রমিকদের ব্যস্ততা, নৌকার শব্দ আর মানুষের কোলাহল, সব মিলিয়ে মাছঘাট যেন নিজের একটি ভাষায় কথা বলত। সেই ঘাটের বাতাসেও যেন ইলিশের গন্ধ ছিল।
আজও মাছঘাট আছে। ইলিশও আছে। ব্যবসাও চলছে। কিন্তু আগের সেই দৃশ্য যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। আড়তের সামনে বড় ইলিশের স্তুপ, হাজার হাজার মণের সেই কর্মচাঞ্চল্য সবকিছু এখন অনেকটাই স্মৃতি। পুরোনো দিনের মানুষগুলো হয়তো এখনো ঘাটে দাঁড়িয়ে কখনো কখনো সেই দিনগুলো খুঁজে ফেরেন।
চাঁদপুর শহরের প্রাণকেন্দ্রের চত্বরও একসময় ছিল শহরের হৃদস্পন্দনের মতো। পরিচিত মুখের সঙ্গে দেখা হয়ে যেত, কোথাও দাঁড়িয়ে দু-একটি কথা, তারপর কখন যে আড্ডা জমে যেত তার হিসাব থাকত না। আজ সেই চত্বরের চেহারা বদলেছে। আধুনিকতার ছোঁয়া লেগেছে। নতুন নির্মাণ এসেছে, শহর পেয়েছে নতুন অবয়ব। কিন্তু বদলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে গেছে অনেক চেনা দৃশ্য, অনেক পরিচিত স্মৃতি। উন্নয়ন আমাদের প্রয়োজন। আধুনিক শহরও প্রয়োজন। কিন্তু কখনো কখনো মনে হয় নতুনের জায়গা করে দিতে গিয়ে আমরা পুরোনোটাকে একটু বেশিই তাড়াহুড়ো করে বিদায় জানিয়ে দিয়েছি।
চাঁদপুর শহরের চিত্রলেখা ও ছায়াবানী রোড আজও আছে। রাস্তার নাম আছে, ঠিকানাও আছে। শুধু নেই সেই সিনেমা হলগুলো। একসময় এই দুই সড়কের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল চাঁদপুরবাসীর বিনোদন আর আবেগের কত গল্প। নতুন সিনেমা মুক্তি পেলেই হলের সামনে জমত মানুষের ভিড়। পোস্টার, টিকিটের অপেক্ষা, পরিচিত মুখের সঙ্গে দেখা সব মিলিয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়াটাও ছিল একেকটি স্মৃতি। আজ সেই সিনেমা হলগুলো নেই। আছে ভবন, আছে রাস্তা, আছে পুরোনো ঠিকানা। কিন্তু নেই সেই পর্দা, নেই দর্শকের কোলাহল, নেই সিনেমা শুরুর আগের সেই অপেক্ষা।
তবু স্মৃতি তো আর ভবন ভাঙার সঙ্গে ভেঙে যায় না। চিত্রলেখা কিংবা ছায়াবানী রোড দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনেকেই হয়তো আজও একবার মাথা উঁচু করে তাকান। পুরোনো সেই সিনেমা হলের কোনো চিহ্ন কি দেখা যায়? পরিচিত সেই ভবনটি কি এখনো কোথাও দাঁড়িয়ে আছে? চোখ খোঁজে, কিন্তু সময়ের কাছে উত্তর মেলে না। কখনো কখনো মনে হয়, ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ আসলে ভবন খোঁজে না, খোঁজে নিজের ফেলে আসা সময়টাকে।
চাঁদপুরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও জড়িয়ে আছে এমন কত স্মৃতি। চাঁদপুর সরকারি কলেজ, পুরাণ বাজার ডিগ্রি কলেজ ও চাঁদপুর সরকারি মহিলা কলেজ। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রাঙ্গণে একসময় শুধু ক্লাস আর পরীক্ষার ব্যস্ততা ছিল না, ছিল তারুণ্যের গল্প, বন্ধুত্ব আর আড্ডা। ক্লাস শেষে শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে গাছের নিচে বসত। কারও হাতে বই, কারও হাতে খাতা কিন্তু গল্পের বিষয় বই-খাতায় সীমাবদ্ধ থাকত না। পড়াশোনার ফাঁকে চলত হাসি-ঠাট্টা, ভবিষ্যতের স্বপ্ন, বন্ধুর সঙ্গে খুনসুটি কিংবা নিছক সময় কাটানো। একটি গাছের ছায়া হয়ে উঠত একেকটি বন্ধুত্বের ঠিকানা। সময়ের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আধুনিক হয়েছে। নতুন ভবন হয়েছে, ক্যাম্পাস হয়েছে আরও নান্দনিক। অবকাঠামোর দিক থেকে নিঃসন্দেহে এসেছে পরিবর্তন। কিন্তু সেই গাছতলার আড্ডা যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। আজকের শিক্ষার্থীদের ব্যস্ততা ভিন্ন, সময়ের গতি ভিন্ন, যোগাযোগের মাধ্যমও ভিন্ন। হয়তো একই ক্যাম্পাসে বসে তারা কথা বলে, কিন্তু আগের সেই দলবেঁধে গাছের নিচে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আড্ডা দেওয়ার দৃশ্য খুব একটা দেখা যায় না। ভবন বেড়েছে, সৌন্দর্য বেড়েছে কিন্তু কোথাও যেন কমেছে সেই সহজ-সরল আড্ডার উষ্ণতা।
চাঁদপুরের মানুষের সবচেয়ে পরিচিত জায়গাগুলোর একটি বড়স্টেশন মোলহেড। অনেকের কাছে এটি শুধু একটি দর্শনীয় স্থান নয়; এটি চাঁদপুরের আবেগ। পদ্মা, মেঘনা ও ডাকাতিয়ার মিলনস্থল হিসেবে পরিচিত এই জায়গাটি মানুষের কাছে ‘তিন নদীর মোহনা’ নামেই বেশি পরিচিত। একসময় মোলহেড ছিল আরও বিস্তৃত। সেখানে ছিল মসজিদ, মাজারসহ বেশ কিছু স্থাপনা। মানুষের কোলাহল হয়তো আজকের মতো এত বেশি ছিল না, কিন্তু জায়গাটির ছিল অন্যরকম প্রশান্তি। বিস্তৃত জায়গা, নদীর বিশাল জলরাশি আর খোলা বাতাস, সব মিলিয়ে মোলহেডের সৌন্দর্য ছিল যেন অন্য রকম। বিকেলের দিকে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখা, দূরে নৌকার চলাচল আর নদীর ঢেউয়ের শব্দ এসবই ছিল মোলহেডের সৌন্দর্যের অংশ। তখন হয়তো সেখানে এত মানুষ আসত না, কিন্তু যারা আসতেন, তারা প্রকৃতির কাছে কিছুটা সময় কাটাতেন।
সময়ের সঙ্গে নদীভাঙন বদলে দিয়েছে মোলহেডের চেহারা। জায়গাটি হয়েছে ছোট। বিভিন্ন সময়ে উচ্ছেদ ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে এর অবয়বও বদলেছে। এখন মানুষের উপস্থিতি বেশি, কিন্তু আগের সেই বিস্তৃত পরিসর আর আগের মতো নেই। আধুনিকতা ও মানুষের ভিড় বেড়েছে, কিন্তু হারিয়েছে পুরোনো দিনের সেই নিরিবিলি সৌন্দর্যের অনেকটাই। তবু মোলহেডের প্রতি মানুষের টান কমেনি। এখনো বিকেল হলে মানুষ সেখানে ছুটে যায়। নদীর দিকে তাকিয়ে কেউ ছবি তোলে, কেউ গল্প করে, কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে। হয়তো তারা সবাই অজান্তেই বর্তমানের মোলহেডের ভেতর পুরোনো সেই মোলহেডটাকেই খুঁজে বেড়ায়।
চাঁদপুরের সাংবাদিকতার গল্পও সেই হারিয়ে যাওয়া সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একসময় সংবাদপত্র ছিল মানুষের প্রতিদিনের অপেক্ষার একটি অংশ। সকাল কিংবা বিকেলে পত্রিকা হাতে পাওয়ার আনন্দই ছিল আলাদা। চাঁদপুর শহরের রেলওয়ে কোর্টস্টেশনের দোয়াগঞ্জল বুক স্টল ছিল এমনই এক পরিচিত জায়গা। সেখানে শুধু পত্রিকা বিক্রি হতো না; জমত মানুষের আড্ডা। কার পত্রিকায় কী খবর এসেছে, কোন সংবাদটি গুরুত্বপূর্ণ, কার লেখা ভালো হয়েছে, এসব নিয়ে চলত আলোচনা। পরিচিতজনের সঙ্গে দেখা হয়ে গেলে দু-চার কথার পরই জমে উঠত খুনসুটি। কেউ পত্রিকা পড়ছেন, কেউ অপেক্ষা করছেন নতুন সংখ্যা আসার জন্য, কেউ আবার নিছক আড্ডার টানে এসে দাঁড়িয়েছেন। সেই বুক স্টলের সামনে দাঁড়ানো মানুষগুলো হয়তো জানতেন না, তারা আসলে একটি সময়ের ইতিহাস তৈরি করছেন।
আজ ডিজিটাল যুগ। খবরের জন্য আর বুক স্টলে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না। মুঠোফোনের পর্দায় মুহূর্তেই পৌঁছে যায় দেশ-বিদেশের সংবাদ। একটি খবর প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই হাজারো মানুষের হাতে পৌঁছে যায়। কিন্তু খবর পৌঁছানোর গতি বেড়েছে, কমে গেছে অপেক্ষার আনন্দ। কমে গেছে পত্রিকা হাতে নিয়ে পাশে দাঁড়ানো মানুষের সঙ্গে দু-চার কথা বলার সুযোগ। কমে গেছে বুকস্টল ঘিরে সেই অনানুষ্ঠানিক আড্ডা। ডিজিটাল পর্দা আমাদের দ্রুত করেছে, কিন্তু কোথাও যেন একটু নিঃসঙ্গও করেছে।
চাঁদপুর শহরের টাউন হলও ছিল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্র। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে সেখানে নাটক মঞ্চায়ন হতো। দর্শকে ভরে যেত হল, মঞ্চে উঠতেন স্থানীয় শিল্পী ও নাট্যকর্মীরা। অভিনয়, গান, আবৃত্তি আর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে জমে উঠত শহরের সন্ধ্যা। আজ টাউন হলের জায়গাটি আছে, কিন্তু নেই সেই পুরোনো মঞ্চ। সেখানে উঠেছে বহুতল ভবন। হয়তো আজকের প্রজন্মের অনেকেই জানে না—এই জায়গাটিতেই একসময় স্থানীয় সংস্কৃতির কত গল্প লেখা হয়েছিল।
শুধু নাটক নয়, শহরের বিভিন্ন স্থানে উৎসবে আয়োজনে হতো যাত্রাপালা। রাতভর চলত অভিনয়, গান আর গল্পের আসর। দূর-দূরান্ত থেকেও মানুষ আসতেন যাত্রা দেখতে। পহেলা বৈশাখ ঘিরে বসত বাঙালির প্রাণের উৎসব বৈশাখী মেলা। মাটির তৈরি খেলনা, হস্তশিল্প, খাবারের দোকান, নাগরদোলা আর মানুষের ভিড়ে উৎসবের রঙে রঙিন হয়ে উঠত শহর ও আশপাশের এলাকা। এখন উৎসব আছে, আয়োজনও আছে; কিন্তু সেই সহজ-সরল আনন্দের অনেকটাই যেন হারিয়ে গেছে সময়ের ভাঁজে।
চাঁদপুরের সাংস্কৃতিক জীবনও একসময় ছিল বেশ প্রাণবন্ত। শহরের হাসান আলী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ কিংবা আউটার স্টেডিয়ামে মাসব্যাপী বিজয় মেলা ছিল মানুষের কাছে এক বিশেষ আকর্ষণ। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও বিজয়ের চেতনাকে ধারণ করে আয়োজিত সেই মেলা ছিল চাঁদপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যেরই একটি অংশ। বিকেল হলেই মেলার মাঠে মানুষের ঢল নামত। শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে নানা বয়সী মানুষ ছুটে যেতেন মেলার আনন্দে। সময়ের প্রেক্ষাপটে আজ সেই বিজয় মেলা বন্ধ। কিন্তু যারা সেই মেলার দিনগুলো দেখেছেন, তাদের স্মৃতিতে এখনো বেঁচে আছে সেই আলো, কোলাহল আর উৎসবের আবহ।
হারিয়ে গেছে গ্রামীণ খেলাধুলার অনেক স্মৃতিও। একসময় মাঠে মাঠে ফুটবল, ক্রিকেটের পাশাপাশি গোল্লাছুট, দাড়িয়াবান্ধা, কানামাছি, হাডুডু কিংবা নানা দেশীয় খেলায় মেতে থাকত শিশু-কিশোরেরা। বিকেল হলেই মাঠে ছুটে যাওয়া ছিল তাদের নিত্যদিনের আনন্দ। এখন সেই মাঠের জায়গা অনেক ক্ষেত্রে দখল করেছে ভবন, আর মাঠ থাকলেও শিশুর হাতে জায়গা নিয়েছে মোবাইল ফোনের পর্দা।
চাঁদপুরের পুরোনো মাঠগুলোর কথাও মনে পড়ে। বিকেল হলেই কিশোর-তরুণদের ছোটাছুটি। কারও হাতে ফুটবল, কারও হাতে ক্রিকেট ব্যাট। খেলা শুরু হওয়ার আগেই মাঠের একপাশে দাঁড়িয়ে যেত দর্শক। খেলার চেয়ে কখনো কখনো আড্ডাটাই যেন বড় হয়ে উঠত। সেই মাঠগুলো ছিল শুধু খেলার জায়গা নয়; ছিল বন্ধুত্ব তৈরির জায়গা, কৈশোরের গল্প জমা রাখার জায়গা। কত মানুষের জীবনের প্রথম বন্ধুত্ব, প্রথম প্রতিযোগিতা, প্রথম জয়-পরাজয়, সেসবের সাক্ষী ছিল শহরের মাঠ। আজ অনেক মাঠের চেহারা বদলে গেছে। কোথাও স্থাপনা উঠেছে, কোথাও জায়গা সংকুচিত হয়েছে। নতুন প্রজন্মের হাতে এখন মোবাইল, অনলাইন গেম আর ভার্চুয়াল জগত। মাঠের সেই ডাক আগের মতো শোনা যায় না।
শুধু স্থাপনা কিংবা বিনোদনের মাধ্যম নয়, হারিয়ে যাচ্ছে কিছু পেশা, কিছু অভ্যাস, কিছু সম্পর্কও। নৌকার মাঝি, পুরোনো কারিগর, ঐতিহ্যবাহী ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী কিংবা ঘাটকেন্দ্রিক নানা পেশার মানুষের জীবনধারায় এসেছে পরিবর্তন। তাদের অনেকের গল্প হয়তো কখনো সংবাদপত্রের পাতায় উঠে আসেনি। অথচ তারাই ছিলেন চাঁদপুরের জীবন্ত ইতিহাসের অংশ। চাঁদপুরের প্রবীণদের সঙ্গে কথা বললে বোঝা যায়, একটি শহরের আসল ইতিহাস সরকারি নথিতে যতটা থাকে, মানুষের স্মৃতিতে তার চেয়েও বেশি থাকে। কেউ মনে করতে পারেন পুরোনো কোনো ঘাটের কথা। কেউ বলবেন বাজারের কোনো দোকানের কথা। কেউ মনে করবেন হারিয়ে যাওয়া কোনো মাঠের কথা। কেউ হয়তো এখনো চোখ বন্ধ করলে দেখতে পান সেই বুকস্টলের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন পরিচিত মুখ। কেউ হয়তো চিত্রলেখা কিংবা ছায়াবানী রোডের কোনো এক ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে খুঁজবেন পুরোনো সিনেমা হলের স্মৃতি। আবার কারও মনে পড়ে যাবে কলেজের গাছতলায় বসে কাটানো সেই বিকেল।
এই স্মৃতিগুলো লিখে রাখা জরুরি। কারণ মানুষ একদিন চলে যায়, শহর বদলে যায়, ভবন ভেঙে নতুন ভবন ওঠে, নদীর গতিপথ বদলায়, পেশা বদলায়, প্রযুক্তি বদলায়। কিন্তু মানুষের স্মৃতির ভেতর যে শহরটি বেঁচে থাকে, সেটি যদি লিখে না রাখা হয়, একদিন সেটিও হারিয়ে যাবে। চাঁদপুর বদলাবে, এটাই সময়ের নিয়ম। আমরা চাই শহর আরও সুন্দর হোক, আরও আধুনিক হোক। কিন্তু আধুনিকতার সঙ্গে যেন স্মৃতিরও একটু জায়গা থাকে। নতুন প্রজন্ম যেন কোনো একদিন জানতে পারে, এই শহরে একসময় হাজার হাজার মণ ইলিশ আসত। মাছঘাটের আড়তে আড়তে চলত হাঁকডাক। আড়তের সামনে পড়ে থাকত বড় বড় ইলিশের স্তুপ। তারা যেন জানতে পারে, একসময় রেলওয়ে কোর্টস্টেশনের দোয়াগঞ্জল বুক স্টলের সামনে পত্রিকা হাতে দাঁড়িয়ে মানুষের আড্ডা জমত। সংবাদ ছিল অজুহাত, দেখা হওয়াটাই ছিল কখনো কখনো আসল আনন্দ।
তারা যেন জানতে পারে, চাঁদপুরের কলেজগুলোর গাছতলায় বসে কত তরুণ-তরুণী তাদের জীবনের গল্প লিখেছে। সেই গাছগুলো হয়তো আজও আছে, কিন্তু বদলে গেছে আড্ডার ভাষা। তারা যেন জানতে পারে, বড়স্টেশন মোলহেড একসময় ছিল আরও বিস্তৃত, আরও নিরিবিলি; তিন নদীর মোহনার সেই বাতাসে দাঁড়িয়ে মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে কথা বলত।তারা যেন জানতে পারে, এই শহরেরও ছিল কিছু মাঠ, কিছু সিনেমা হল, কিছু ঘাট, কিছু চত্বর, কিছু বুকস্টল, কিছু গাছের ছায়া, কিছু মানুষ; যাদের অনেকেই আজ নেই, কিন্তু তাদের স্মৃতি এখনো চাঁদপুরের বাতাসে মিশে আছে। কারণ একটি শহর শুধু ইট-পাথরের নয়। একটি শহর তৈরি হয় মানুষের হাসি-কান্না, আড্ডা, ভালোবাসা, পেশা, নদী আর অসংখ্য ছোট ছোট স্মৃতি দিয়ে।
চাঁদপুরের সেই স্মৃতিগুলো হয়তো আজ আমাদের চোখে ধরা পড়ে না। কিন্তু একটু থামলে, একটু পেছনে তাকালে, হয়তো শোনা যাবে পুরোনো কোনো ঘাটের হাঁকডাক, ভেসে আসবে নৌকার বৈঠার শব্দ, চোখে পড়বে বরফের ওপর সাজানো রুপালি ইলিশ। হয়তো কোনো এক বিকেলে চিত্রলেখা রোড দিয়ে হাঁটতে গিয়ে মনে হবে এই তো, এখানেই তো ছিল সেই সিনেমা হল। কিংবা কোনো কলেজের গাছের নিচে দাঁড়িয়ে মনে হবে এখানেই তো একদিন বন্ধুরা বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করত।
আর মোলহেডে দাঁড়িয়ে নদীর দিকে তাকালে হয়তো মনে হবে, এই নদীই তো জানে আমাদের কত পুরোনো গল্প। চাঁদপুর বদলে গেছে। আমরাও বদলে গেছি। তবু স্মৃতির ভেতর যে চাঁদপুর বেঁচে আছে, সেই চাঁদপুর কখনো হারিয়ে যায় না। তাই ফিরে দেখা, সেই পুরোনো চাঁদপুরকে।
লেখক পরিচিতি : শরীফুল ইসলাম, জেলা প্রতিনিধি, (এনটিভি, জাগো নিউজ ও আগামীর সময়), যুগ্ম বার্তা সম্পাদক চাঁদপুর প্রবাহ, ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক আমাদের অঙ্গীকার।