২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা : ২৪জন প্রাণ হারালেও বেঁচে গেছে বাংলাদেশ


মোল্লা জালাল :
‘আগস্ট’ বাঙ্গালির আবেগাপ্লোত হওয়ার মাস। এ মাসে গোটা জাতি দুঃখ ভারাক্রান্ত মনে স্মরণ করে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালি, স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। মাত্র ৫৫-৫৬ বছর বয়সে যে মানুষটি এনে দিল স্বাধীনতা। বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠিত করলো বাঙ্গালির হাজার বছরের লড়াই-সংগ্রামের মর্যাদার জাতিস্বত্ত্বা। শুধুমাত্র প্রতিহিংসায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সেই মহামানবকে স্বপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে মানুষরূপী হায়েনার দল। নজিরবিহীন ওই বর্বরোচিত হত্যাকান্ডে গোটা বিশ্ব স্তম্ভিত হয়ে যায়। ২৯ বছর পর আবার সেই একই প্রতিহিংসায় ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তারা হামলা চালায় বঙ্গবন্ধু কন্যা আজকের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যা করার জন্য। গোটা বিশ্ব আবারো স্তম্ভিত হয়। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় ২৪জন মানুষ প্রাণ হারায়। আহত হয় ৩ শতাধিক লোক। দলীয় নেতা-কর্মীরা জীবন দিয়ে ঘিরে রেখেছিল বলে প্রানে রক্ষা পায় বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা। বেঁচে যায় বাংলাদেশ।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাষ্ট্রযন্ত্রের অংশ বিশেষকে ব্যবহার করে স্বপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যা করা হলেও ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রকেই ঘাতকের ভূমিকায় অবতীর্ন করানো হয়। সরকারের শীর্ষ মহল থেকে শুরু করে সকল পর্যায়ের বাছাই করা ঘাতকরা শেখ হাসিনাকে হত্যা করার উদ্যোগ নিয়ে মাঠে নামে। সকলেই জানে-, যে কোন হত্যান্ডের তিনটি ধাপ থাকে। প্রথম ধাপে হয় হত্যার পরিকল্পনা। কখন, কোথায়, কিভাবে হত্যাকান্ড সংগঠিত করা হবে। দ্বিতীয় ধাপে থাকে ঘাতক নির্বাচন। কারা হত্যান্ডে অংশ নেবে এবং কিভাবে হত্যাকান্ডটি সংগঠিত করবে। তৃতীয় ধাপে থাকে হত্যাকারি ও পরিকল্পনাকারিদের কি ভাবে রক্ষা করা হবে। কি প্রক্রিয়ায় খুনীদের আইনি ও সামাজিকভাবে দায়মুক্ত করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা হবে। ইতিহাসের নানা ঘটনা সাক্ষ্য দেয়, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা থেকেই পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠেী তাঁকে স্তব্ধ করে দেওয়ার জন্য নানা ধরণের পরিকল্পনা করতে শুরু করে। তখনকার দিনের বাস্তবতায় নিজেদের ‘গা’ বাঁচিয়ে বঙ্গবন্ধুকে শেষ করে দেওয়ার জন্য আইনি প্রক্রিয়ায় একের পর এক মামলা দিয়ে সারাজীবন কারাগারে রেখে মেরে ফেলার বহু ফন্দি-ফিকির করেও শেষ পর্যন্ত রক্ষা হয়নি। কারণ, বঙ্গবন্ধু সাথে ছিল সাড়ে ৭ কোটি বাঙ্গালি। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়ও বাঙ্গালি জাতিস্বত্ত্বার ঘাতক কুশীলবরা এদেশে বর্বরোচিত গণহত্যার নীলনকশা প্রনয়ন করে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করায়। কিন্তু তাতেও তারা সফল হয়নি। বঙ্গবন্ধুর ডাকে ৩০ লক্ষ বাঙ্গালি বুকের তাজা রক্ত দিয়ে ২ লক্ষ মা-বোন তাদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন করে। হত্যাকারি কুশীলবরা শেষ মুহুর্ত্বে নিশ্চিত পরাজয় জেনেও প্রতিহিংসায় বশীভূত হয়ে জাতিকে মেধা শূন্য করার জন্য বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে।

১৯৭২ সালের পর দেশে যা কিছু হওয়া যৌক্তিক ছিল তার কিছুই হয়নি। বঙ্গবন্ধু সবাইকে নিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটা গড়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। কিন্তু তলে তলে কুশীলবরা ঠিকই তাদের কাজ করতে থাকে। দিনের পর দিন শাঠ্য আর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থেকে পরিকল্পনা করতে থাকে কিভাবে প্রতিশোধ নেবে। ওই ষড়যন্ত্রে যুক্ত হয় দেশ-বিদেশের অনেকে। কুশীলবরা তিনটি ধাপে হত্যার পরিকল্পনা, হত্যাকারি নির্বাচন এবং খুনীদের রক্ষার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বর্বরোচিতভাবে স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে বাংলাদেশ সৃষ্টির প্রতিশোধ নেয়। তারা বাংলাদেশটাকে চিরতরে পঙ্গু করে দেওয়ার জন্য জাতীয় চার নেতাকেও হত্যা করে। অপরদিকে কুশীলবদের পরিকল্পনা মোতাবেক রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে জিয়াউর রহমান খুনীদের রক্ষায় নজিরবিহীন পদক্ষেপ নেয়। যা মানব সভ্যতার ইতিহাসে বিরল ঘটনা। খুনীদের বিচার চিরদিনের জন্য বন্ধ করার জন্য ‘ইনডেমনিটি’ আইন করা হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের ফলে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার কুশীলবরা তাদের পরিকল্পনুযায়ী তৎপর হয়ে উঠে। জিয়ার পুরো শাসনামলে যুদ্ধাপরাধিদের রাজনৈতিক পুর্নবাসনসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ন বিভিন্ন পদে তাদের বসিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসকে ভিন্ন ধারায় প্রবাহিত করার প্রয়াস চালায়। ৭১’র গণহত্যার দোসর থেকে শুরু করে রাজাকার-আলবদরদের সামাজিকভাবে পুর্নবাসনে সহায়তা করে। কিন্তু এতকিছু করেও তারা শেষ পর্যন্ত সন্তোষ্ট হতে পারেনি। ১৯৯৬ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতার ফিরে আসে। এতে শুরু হয় নতুন জাগরণ। তাতে কুশীলবদের কপালে ভাঁজ পড়ে। তারা আবার শুরু করে পরিকল্পনা। বঙ্গবন্ধু হত্যার টানা ২৯ বছর পর ২০০৪ সালের এই আগস্ট মাসে প্রকাশ্য দিবালোকে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিকাকে হত্যার জন্য গ্রেনেড হামলা চালায়। এই ঘটনায় পরে মামলা হয়। ধাপে ধাপে গ্যাপে গ্যাপে ১৪ বছর ধরে মামলার কার্যক্রম সম্পন্ন করে শুনানি শেষে ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর আদালত ১৯ জনের ফাঁসি এবং ১৯ জনের যাবজ্জীন কারাদন্ডের আদেশ দেয়। এর মধ্যে জজ মিঞা নাটকসহ কত ঘটনা-রটনা চালানো হয় তার শেষ নেই। মামলার রায়ের বিরুদ্ধে আসামীরা আপীল করে। সর্বশেষ গত ১৬ আগস্ট মামলার পেপারবুক হাইকোর্টে জমা হয়েছে। এখন শুরু হবে আপীল শুনানি। এ্যাটর্নি জেনারেল দাবি করেছেন, একটি বেঞ্চ গঠন করে যেন আপীল শুনানি দ্রুত নিষ্পত্তি করা হয়। শেষ পর্যন্ত কি হবে, আদালত সে সিদ্ধান্ত নেবে। আপীল শুনানি কতদিন ধরে চলবে কে জানে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতায় বলা যায়, সময় যতযায় ৭১,৭৫ ও ২০০৪ সালের কুশীলবরা তলে তলে সংগঠিত হয়। প্রতিশোধ স্পৃহায় তারা দেশে-বিদেশে দল পাকায়। প্রস্তুতি নেয় আরো বড় ধরণের কিছু একটা করার জন্য। রাষ্ট্রযন্ত্র, বিচার ব্যবস্থা, সচেতন নাগরিক সমাজ সকলকে এ বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে।

৭৫ সালে স্বপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যা এবং পরে জননেত্রী শেখ হাসিনার ওপর হামলার মূল টার্গেট বাংলাদেশ। এত দুর্যোগ-দুর্বিপাকেও দেশ আজ অপ্রতিরোধ্য গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। ২০৪১ সালে উন্নত দেশের কাতারে সামিল হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে হাঁটতে শুরু করেছে। এতে একদিকে যেমন বাংলাদেশে বন্ধুর সংখ্যা বেড়েছে তেমনি শত্রুও কমেনি। পাপে ভরা পাকিস্তানকে অনেক পিছনে ফেলে শেখ হাসিনার সুদক্ষ নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ বিশ্ব দরবারে বিশাল সম্ভাবনার এক জনপদ। এই বাংলাদেশটাই ওদের চোখের কাটাঁ। থাকে খায়-দায় ঘুমায় এদেশে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাকিস্তানকে স্মরণ করে। বাংলাদেশে কিছু লোক আছে যারা সারাক্ষন খাই খাই, নাই নাই, যাই যাই করে। যাদের লোভের জিব্বা মাটিতে গড়ায় তাদের সাথে হাত মিলিয়ে ওরা আওয়ামী লীগে মিশে যায়। পদ-পদবি,ব্যবসা-বানিজ্য, অর্থ-বিত্ত, যশ-খ্যাতি সব কিছু অর্জন করে বিষের ছোবল দিয়ে সময়মত কেটে পড়ে। আর বিষ ক্রিয়ায় আওয়ামী লীগ ছটফটায়। ৭৫’এ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হলেও সেই মহামানব আজ বিশ্বব্যাপী স্মরণীয়, বরণীয়। ২১ আগস্ট বাংলাদেশের মেরুদন্ড চিরতরে ভেঙ্গে দেওয়ার পরিকল্পনা ব্যর্থ হলেও তাদের আস্ফালন কমেনি। মানুষ শয়তানি করতে করতে এক সময় টায়ার্ড হয়ে যায়, কিন্তু শয়তান টায়ার্ড হয়না। এখানেই মানুষ আর শয়তানের পার্থক্য। তেমনি দেশপ্রেমিকরা একসময় অনেক কিছু ভূলে যায়। কিন্তু চক্রান্তকারিরা ভূলেনা। তারা তৎপর থাকে। তলে তলে দল পাকায়, সংগঠিত হয়। সেদিনের সেই ভয়াবহ ঘটনার কথা মনে রেখে লোভ-লালসার উর্ধ্বে সকলকে সতর্ক থাকতে হবে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় বেঁচে যাওয়া বাংলাদেশকে রক্ষার জন্য।

-লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন।

শেয়ার করুন

মন্তব্য করুন